# কিছু জায়গায় পানির পাইপ ফুটো হওয়ায় ময়লা প্রবেশ করছে : বনাক
# এক বেডে দুইজনকে চিকিৎসা দিচ্ছি : আরএমও বন্দর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
# ল্যাব টেস্টের জন্য পানি সংগ্রহ করে ঢাকা পাঠানো হয়েছে : ইউএনও বন্দর
# উৎস বন্ধ করতে না পারলে ৫০০ শয্যা করলেও লাভ হবে না : আরএমও ভিক্টোরিয়া
# সচেতনতার বিকল্প নেই : জেলা সিভিল সার্জন
ডায়েরিয়ার প্রকোপে দিশেহারা নারায়ণগঞ্জবাসী। বিশেষ করে সদর ও বন্দর উপজেলায় এই প্রকোপ অনেক বেশি। এবারের ডায়েরিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পানীয় জলকে দায়ী করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে সুয়ারেজের ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাছাকাছি প্যারালালে থাকা পানি সরবরাহের লাইন থাকায় কোন কারণে লিকেজ থাকলেই সেখান দিয়ে পানি সরবরাহ লাইনে ময়লা ঢুকে যাচ্ছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তারা।
আইসিডিডিআরবি’র একটি দল সদর ও বন্দরের ওয়াসার লাইনের পানি সংগ্রহ করে ল্যাব টেস্টের জন্য নিয়ে গেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা সিভিল সার্জন ও বন্দর ইউএনও। ল্যাব টেস্টের পর পানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন তারা। তবে এই মুহুর্তে সচেতনতার বিকল্প কিছু নেই।
ফুটানো পানির ব্যবহারসহ নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ হতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে জানিয়েছেন তারা। এরই মধ্যে গত রোববার বন্দরের নাসিক ২৪নং ওয়ার্ডে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন নাসিমা (২৭) নামের এক তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক।
অন্যদিকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২দিন হাসপাতালে থেকে রোববার সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আসেন নাসিক ২৫ নং ওয়ার্ডের রওশন আরা (৬০) নামক এক নারী। একই দিন রাতে তার অবস্থা পুনরায় অবনতি ঘটলে রাত সাড়ে ১১টায় তাকে আবারও এ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
বন্দর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে যতগুলো শয্যা আছে তাতে কুলিয়ে উঠতে না পারায় একই বেডে দুইজনসহ মেঝেতেও রোগীদের চিকিৎসা প্রদানে বাধ্য হচ্ছে স্বাস্থ্যবিভাগ। রোববার রাত ১২টার পর থেকে দুপুর তিনটা পর্যন্ত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা লোকের সংখ্যা ২৫২জন। গত কয়েক সপ্তাহ যাবত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩শত ২০/৩০জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন।
ডায়রিয়া একটি পানিবাহিত রোগ। সাধারণত চৈত্র-বৈশাখের সময় প্রচণ্ড গরমের কারণে আমাদের দেশে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে। এ সময় প্রচণ্ড গরমের কারণে পথে-ঘাটে অনিরাপদ পানির তৈরি শরবতের চাহিদাও বাড়ে। এসব পানীয় উম্মুক্ত জায়গায় থাকায় এবং বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার না করায় ডায়রিয়া ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।
ডায়রিয়া থেকে রক্ষা পেতে শৌচাগার ব্যবহারের পরসহ খাবারের পূর্বে হাত ধোয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাতে লেগে থাকা জীবাণু ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ। তবে বর্তমানের ডায়রিয়ার যে প্রকোপ তার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় পানীয় জলকে। বন্দর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় এখানে বেড প্রতি দুইজন রোগীকে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ফতুল্লা পঞ্চবটির শাসনেরগাও এলাকার ১ বছরের শিশু সাব্বির হোসেন ৪দিন যাবত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। এখনও না কমায় তার বাবা-মা তাকে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসেন। তাকে স্যালাইন পুশ করা হয়েছে।
পঞ্চবটির এতিমখানা এলাকার দেড় বছরের শিশু আমির হামজা। ৪/৫দিন যাবত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে না কমায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন পরিবার। তাকে স্যালাইন পুশ করা হয়েছে। এরকম অনেক শিশু, কিশোর ও বৃদ্ধসহ নারী পুরুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এখানে ভর্তি হয়েছেন চিকিৎসার জন্য।
এ বিষয়ে বন্দর নাগরিক কমিটির (বনাক) সাধারণ সম্পাদক এরশাদুল কবির সোহেল জানান, বন্দরের ২৪ ও ২৫নং ওয়ার্ডের সরবরাহকৃত পানিতে সমস্যা থাকার কারণে এই দুই এলাকায় ডায়রিয়ার আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। তিনি জানান, এখানকার কোথাও ড্রেনের কাছাকাছি দিয়ে আবার কোথাও ড্রেনের ভিতর দিয়ে পানির সরবরাহের পাইপ যাওয়াতে কিছু কিছু জায়গায় পানির পাইপ ফুটো হয়ে যাওয়ায় সেসব জায়গা দিয়ে ময়লা প্রবেশ করছে।
যখন পানির পাম্প চালু থাকে তখন সেখান দিয়ে ময়লা প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু যখন পাম্প বন্ধ থাকে তখন সেখান দিয়ে ময়লা প্রবেশ করে এবং পাম্প চালু করার সাথে সাথে সেই ময়লা যুক্ত পানি কল দিয়ে বের হয়ে আসে এবং আমরা সেই পানি ব্যবহার করি। এতে আমাদের এলাকায় প্রতিবছরই ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের সংক্রমণ ঘটছে।
বন্দর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. এমএম ফারুক হোসেন জানান, আমাদের এখানে মোট শয্যা সংখ্যা ৫০। এর প্রত্যেকটি শয্যায় বর্তমানে ডায়রিয়া রোগীদের দখলে। শুধু তা-ই নয়, শয্যা সংখ্যায় সংকুলান না হওয়ায় একই বেডে দুইজন করেও রোগি রাখতে বাধ্য হচ্ছি।
তিনি আরও জানান, গত মার্চ মাস জুড়ে আমাদের এখানে ডায়রিয়া রোগির ভর্তির সংখ্যা ছিল ১৩৫ জন। অথচ বর্তমানের গত সাত দিনে আমাদের এখানে ভর্তির সংখ্যা ২৭৩ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘন্টায় এই সংখ্যা ৫০। তিনি জানান, এখানে আসা রোগীদের মধ্যে বেশির ভাগ আসে সিটি কর্পোরেশন এলাকা থেকে। তবে গত ২৪ ঘন্টার হিসাব করলে বন্দর ইউনিয়ন ও মুসাপুর ইউনিয়নের রোগীর সংখ্যাও অনেক।
এ বিষয়ে বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিএম কুদরত ই খুদা জানান, ডায়রিয়া পানিবাহিত রোগ। আইসিডিডিআরবি’র একটি দল আমাদের এখানকার কয়েকটি জায়গা থেকে পানির নমুনা পরীক্ষার জন্য নিয়ে গেছে। তার রেজাল্ট আসলে আমরা পানির বিষয়টা নিয়ে বলতে পারব। তিনি আরও জানান, আমরা জেলা সিভিল সার্জনের সাথে আলোচনা করেছি।
সেখান থেকে ডায়রিয়ার সচেতনার বিষয়ে কিছু নিদের্শনা দিয়ে লিফলেট প্রকাশ করবে। আমরা সেগুলো মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচার করার চেষ্টা করব। এছাড়াও যেসব এলাকায় আক্রান্তের হার বেশি সেসব এলাকার মসজিদের মাইকের মাধ্যমেও মাইকিং করানো হবে।
তিনি জানান, আমাদের প্রাপ্ত তথ্য মতে ১৯ ও ২৪ ২৫ নং ওয়ার্ডে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। তিনি বলেন, ডায়রিয়া রোধে সরকারের পক্ষ হতে গণটিকার ব্যবস্থা করার একটি প্ল্যান আছে, তবে সেটা সময় সাপেক্ষ। আপাতত সবাইকে সচেতন হওয়া ছাড়া বিকল্প কোন কিছু নেই।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল (ভিক্টোরিয়া) এর আবাসিক মেডিকেল অফিসার শেখ ফরহাদ জানান, আমাদের এখানে ডায়রিয়ার চিকিৎসার জন্য ১০টি শয্যার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বর্তমানে আমরা তা উন্নীত করে ২০টি শয্যা করেছি। আগে যেখানে প্রতিদিন গদে ৫০ থেকে ৬০জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী আসত।
এখন সেখানে দৈনিক (২৪ ঘন্টায়) প্রায় ৩শত ৩০ জন করে রোগী আসছে। এখন পর্যন্ত খাবার স্যালাইনসহ চিকিৎসা সামগ্রী থাকলেও ভবিষ্যতে এভাবে চলতে থাকলে এগুলোরওতো নির্দিষ্ট একটি পরিমান আছে। তাই এখন থেকেই সবাইকে সচেতন হতে হবে। তিনি জানান, ডায়রিয়াটা বেড়েছে পানির সমস্যার কারণে।
পানির সমস্যাটা ঠিক হয়ে গেলে ডায়রিয়ার আক্রান্তের হার কমে যাবে। তিনি জানান, নাসিকের ১১নং ওয়ার্ড থেকে ২৭নং ওয়ার্ড অর্থাৎ যেসব ওয়ার্ডগুলোতে ওয়াসার পানি সাপ্লাই আছে সেসব ওয়ার্ডে ডায়রিয়া আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। আমাদের এখানে একটি টিম বিভিন্ন জায়গা থেকে পানি নিয়ে ঢাকায় পাঠাচ্ছে পরীক্ষার জন্য।
এখন যেটা বেশি প্রয়োজন সেটা হলো প্রতিটি ওয়ার্ড কাউন্সিলররা মাইকিংয়ের মাধ্যমে সবাইকে সচেতন হওয়ার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ডায়রিয়ার উৎসটাকে বন্ধ করার। তা নাহলে আমরা যদি শয্যা সংখ্যা ৫শততেও উন্নীত করি তাহলেও কোন লাভ হবে না। তবে এখন পর্যন্ত আমরা চিকিৎসা দিতে পারতেছি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন এএফএম মুশিউর রহমান বলেন, আমরা ধারণা করতেছি কিছু জায়গায় লিকেজ হয়েছে। তাই সদর ও বন্দর থেকে কিছু পানি পরীক্ষা করার জন্য ঢাকা পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, ডায়রিয়া আক্রান্ত থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন নিরাপদ পানি পান করা, বাইরের খাবারের কাছ থেকে দুরে থাকা,
ঠিক মতো হাত ধোয়া, পর্যাপ্ত পরিমান পানি পান করা এবং খোলা ও বাসি পঁচা খাবার না খাওয়া। আমি আজকে আমাদের কয়েকজন ডাক্তারকে বিভিন্ন স্কুলে পাঠিয়েছি শিক্ষার্থীদের সচেতন করার জন্য। আমরা লিফলেটের ব্যবস্থা করতেছি, বিভিন্ন জায়গায় মাইকিং করার জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছি। তারপরও যদি আল্লাহর রহমতে বৃষ্টি হয়,
তাপদাহটা যদি একটু কমে তাহলে আশাকরি ডায়রিয়ায় আক্রান্তের বিষয়টা কিছুটা হলেও লাগব হবে। তিনি আরও বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকায় রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে এখন মানুষজন রাস্তায় বের হচ্ছে, বাইরের খাবার খাওয়ার পরিমান বেড়ে গেছে, বাইরের খাবার ডায়রিয়ার একটি অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, পানির লাইনগুলো চেক দেওয়ার জন্য নাসিকের মেয়র মহোদয়কে অবহিত করেছি। তাদেরও প্রয়োজনের তুলনায় লোকজন কম। তাছাড়া এখানকার ভাসমান লোকজনের বেশিরভাগই সিটিতে বসবাস করে। তবুও সিটি কর্পোরেশন চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান


