বাজারে আলাদা কদর থাকলেও বিলুপ্তির পথে হাতে ভাজা মুুড়ি
আশরাফুল আলম
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২২, ০৬:১৫ পিএম
রমজানে ইফতারিতে যে কোন মানুষের কাছে খাবারের তালিকায় মুড়ি একটি সুপরিচিত নাম। বাঙালী ঐতিহ্যে সব শ্রেণীর মানুষের ইফতারিতে মুড়ি ছাড়া চলেই না। সুস্বাদু ও স্বাস্থ্য সম্মত হওয়ায় মানুষের কাছে হাতের ভাজা মুড়ির এখনও রয়েছে আলাদা কদর। বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও গরীব পরিবারের অন্যতম ইফতার আয়োজনে মুড়ির প্রাধান্যই বেশি।
৮০ দশকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার শম্ভুপুরা ও পিরোজপুর দুটি ইউনিয়নের ১০টি গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে রমজান উপলক্ষে হাতের ভাজা মুড়ির বেশ ধুম ছিল। সে সময় মুড়ি ভাজা কাজের সঙ্গে জড়িতরা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন এখন প্রবাসী আয়ে অর্থনৈতিক ভাবে অনেকটা সাবলম্বী হওয়ায় অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।
তৎকালীন সময়ে সারা বছর গ্রামগুলোতে কম বেশি মুড়ি ভাজা হলেও রমজান মাসে ছিল হাতে ভাজা মুড়ির বিশেষ চাহিদা। একারনে মুড়ি শিল্পে জড়িত নারী-পুরুষরা তখন ব্যস্ত সময় কাটিয়ে ছিলেন। দিনরাত অভিরাম চলত মুড়ি ভাজার কাজ। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরে আসায় এবং কারখানায় মুড়ি উৎপাদিত হওয়ায় বিলুপ্ত প্রায় হাতে ভাজা মুড়ির কাজ।
কারখানায় তৈরীর চিকন মুড়ির চেয়ে হাতের ভাজা মুড়ির দাম একটু বেশি। এতে কোন ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হয় না। রমজান উপলক্ষে পারিবারিক চাহিদা ও গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষায় সোনারগাঁয়ের শম্ভুপুরা ইউনিয়নের দূর্গাপ্রসাদ এলাকায় সীমিত পরিসরে এখনো কয়েকটি পরিবারে চলছে মুড়ি ভাজার কাজ।
তবে ৯০ এর দশকে সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ও শম্ভুপুরা দুটি ইউনিয়ণের তাতুয়াকান্দি, চৌধুরীগাঁও, কাজিরগাঁও, দূর্গাপ্রসাদ, মঙ্গলেরগাঁও, দুধঘাটা, কোরবানপুর, চরগোয়ালদী ও পাঁচানীসহ গ্রাম গুলোর মূল নাম হারিয়ে মুড়ি পল্লিতে পরিনত হয়েছিল। সে সময় প্রায় ৫০০ শতাধিক পরিবারের নারী-পুরুষ মুড়ি ভাজার কাজে যুক্ত হয়ে সংসারের স্বচ্ছলতা এনেছিলেন।
তৎকালীন সময়ে সোনারগাঁয়ে যে মুড়ি ভাজা হয়ে ছিল তার বেশির ভাগই মালা, লোতা, বহুরী, ইরি, বি-২৯, বি-২৮, রত্না ও বোরো ধানের মোটা চাউল দিয়ে। মুড়ি ব্যবসায়ীরা বরিশাল ও সিলেটের স্থানীয় ধানের বাজার থেকে মুড়ির ধান সংগ্রহ করতেন। স্থানীয়রা দুই ধরনের পদ্ধতিতে মুড়ি ভেজে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন।
স্বচ্ছলরা নিজেরাই বাজার থেকে ধান কিনে চাল তৈরিসহ মুড়ি ভেজে বাজারজাত করতেন। এতে তারা বেশি লাভবান হয়েছিলেন। প্রতি মণ মুড়িতে প্রায় ৪০০/ ৫০০ টাকা আয় হত। অন্যদিকে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন আড়ৎদারের কাছ থেকে চাল নিয়ে মুড়ি তৈরি করে তারা মজুরি পেতেন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মত। সে সময় মুড়ি তৈরিতে জ্বালানী কাঠ আনুসঙ্গিক কিছু খরচ বাদে তাদের আয় হত অনেক বেশি।
সাধারণত ২ জন পূর্ণ বয়স্ক মহিলা প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই মন চাউলের মুড়ি ভাজতে পারে। তবে এ কাজে নারীরাই বেশি সময় দেন এবং আর্থিক স্বচ্ছলতা পাওয়ায় তারাই বেশ সুখী। উপজেলার দূর্গাপ্রসাদ এলাকার আব্দুল মালেক বেপারী নামে একজন মুড়ি ব্যবসায়ী বলেন এখানে মুড়ি ভাজা একটি শিল্পে পরিনত হয়েছিল। মুড়ি ভাজা কাজের সঙ্গে জড়িত অনেক পরিবার অর্থনৈতিক ভাবে সাবলম্বী হওয়ায় তাদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। যার ফলে এখানে গরীব মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম। তবে বাজারে এখনও হাতে ভাজা মুড়ির ব্যাপক চাহিদা।


