ঈদ এগিয়ে এলে রক্তের কণায় কণায় আনচান অনুভব করি। উৎসবের দিন গুলো অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত ‘কি নাই, কি নাই’ একটা ভাব সারাক্ষণ চারপাশে ছায়ার মত থাকে। মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছে করে আমাদের ছোটবেলায় উৎসব-পার্বণে যে ফূর্তি ছিল, এখনকার সেই বয়সের ছেলেমেয়েরা তেমন করেই ফুর্তি অনুভব করে? এ কথা জানতে চাইলে কী না কী ভাবে, তাই আর জিজ্ঞেস করা হয় না।
সময় বদলেছে, বদলে গেছি আমি এবং আমার ঈদ। ঈদের আগের রাতের আনন্দ ছিল আলাদা বিশেষ রকমের মজা। আগামীকাল ঈদ, আনন্দের আতিশয্য গভীর রাত পর্যন্ত মাতিয়ে রাখতো পাড়ার সমবয়সীদের। কাঁচা বাঁশের কঞ্চি অথবা গাছের ডালের মাথায় পুরনো ত্যানা ভিজিয়ে মশাল বানানোহত। তা নিয়ে দলবেঁধে গ্রামের ছেলেমেয়েরা রাস্তা, স্কুলের মাঠ কিংবা এই বাড়ি সেই বাড়ির উঠানে ঘুরতাম।
শীতের ঠান্ডা রাত। গায়ে চাদর । তারপরও ঘেমে উঠতাম। আমার ছেলেবেলার অধিকাংশ ঈদের স্মৃতির সময় শীত বা প্রায় শীতকালের। এই মশাল জ্বালানো কখনো কখনো খুব ভোরবেলা হত। ভোরের ফিকে অন্ধকারে এবাড়ি-ওবাড়ি চলত মশাল নিয়ে ছোটখাট মিছিল। মশালের আলোয় একসময় অন্ধকার দূর হত। সকালবেলা গ্রামের সবাই চলত বাজারে টাটকা দুধের জন্য।
সাথে কিছু টুকটাক সদাইপাতি। কিসমিস, পেস্তা সহযোগে টাটকা দুধের গরম পায়েস,সেমাই যার স্বাদদ ছিল আলাদা, মনে রাখার মত। সঙ্গে পছন্দমত মুড়ি অথবা তেলেভাজা পাতা পিঠা। হাতে বানানো নানান রকম সেমাই। যেমন লতা সেমাই, টিপা সেমাই, বাটা সেমাই। ঈদের সময় এগিয়ে এলে বাড়ি বাড়ি, সারা গ্রাম জুড়ে ঘরে ঘরে শুরু হতো ময়দা দিয়ে রকমারি সেমাই তৈরি।
মা চাচী অথবা ঘরের পাড়ার মেয়েরা বেশির ভাগ ব্যস্ত থাকতো সেমাই তৈরিতে। আমরা ছেলেরা চেষ্টা করতাম নানাভাবে সেমাই তৈরিতে অংশ নিতে। অবশ্য তাতে কাজের চেয়ে ক্ষতি হতো বেশ। কেননা চেষ্টা সর্বদাই ব্যর্থ বা অপচেষ্টা হত। হয়তো নির্দিষ্ট আকারের না হয়ে টিপা বা টেপা সেমাই আমার হাতে গোদা গোদা আকৃতির পেত। দেখা যেত ময়দার দলাই দিতাম নষ্ট করে।
বুড়ো ও তর্জনীর চাপে এক চিমটি ময়দা নিয়ে ডলা দিয়ে টেপা সেমাই তৈরি করা ছিল কৌশল। আকর্ষণীয় করার জন্য বিভিন্ন রং ব্যবহার করতে দেখেছি। লতা সেমাই তৈরি করত একটা পিড়িতে ময়দার দলো হাতের তালু দিয়ে ডলে ডলে চিকন সূতলির মত লম্বা করে। লতা খুবই দীর্ঘ এবং অবিচ্ছিন্ন ভাবে জল চৌকি বা ছোট টুলের নিচে রাখা একটি কুলা বা বাঁশের চালনিতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সাজিয়ে রাখত।
বাটা সেমাই লতার মতোই ছিল তবে তা কুলা বা চালনিতে না নিয়ে ছোট মাটির বাটাতে সাজানো হত। বাটা ছিল মাটির তৈরি এবং পানি রাখার মাটির কলসে ঢাকনির কাজে ব্যবহার করা হত। বাটায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লতা সেমাই একসময় ছোট্ট ফুলের আকৃতি পেত। সেই সব হাতে তৈরি সেমাই শুকিয়ে ঈদের আগেই কাচের বয়ামে যত্ন করে তুলে রাখত গ্রামের সব পরিবার,ধনী গরীব নির্বিশেষে।
ঈদের দিন সেমাই ছিল অবশ্য রান্না যোগ্য বিশেষ আইটেম। তার সঙ্গে বাজার থেকে আনা মেশিনে তৈরি বাদামী রঙের চিকন সেমাইও রান্না হত দুধ দিয়ে। রোলেক্স ব্রান্ডের একটা সেমাই তখন খুব চলত। সকালে বাবার সাথে বাজারে যাবার অন্যতম উদ্দেশ্য থাকত পটাশ বা বাজি কেনা। ঢিলা পটাশ, যা ঢিল ছোড়ার মত করে শক্ত কিছুর উপর ফেললেই জোরে শব্দ করে ফাটত।
বয়স অল্প বলে বাবা কিনে দিতেন না । পরিবর্তে আরেক ধরনের কাঠি বোম বা লাঠি বোম কিনে দিতেন। বাঁশের চিকন কাঠির মাথায় পাটের আঁশ, রঙিন কাগজ দিয়ে মুড়ে বোম আটকানো থাকতো।ভেতরে বারুদ ও ইটের ছোট কণা । হাত দেড়েক মাপের কাঠির গোড়া এক হাতে ধরে ইট বা কোনও শক্ত জায়গায় খুব জোরে বাড়ি মারলে তা উচ্চ শব্দ করে ফাটত।আহা সে কী আনন্দ।
মাঝে মাঝে কোন টি একদমই শব্দ করত না। তাতে খুব মন খারাপ করত। বাবার সাথে যেতাম পুকুর ঘাটে গোসল করতে। বছরের অন্যান্য সময় ব্যবহারের জন্য যে সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করতাম। তার পরিবর্তে ঈদের সময় থাকত ভিন্ন ব্রান্ডের সুগন্ধি সাবান। প্রায়ই তা হত খয়েরি বা চকলেট রঙের কসকো গ্লিসারিন সাবান। কার্বলিক সাবান নামেই তা ছিল বিশেষ পরিচিত।
আমাদের বাড়ির সামনের পুকুরপাড়ের রাস্তা দিয়ে তখন নতুন কাপড় পড়ে বাহারি পোশাকের ছেলেরা মেয়েরা মসজিদের দিকে যায়। মাথায় তাদের কাগজের তৈরি রঙিন নকশাদার টুপি। আমার কাছে খুব ভালো লাগতো। কিন্তু বাবা আমাদের কখনো কিনে দেয়নি। আমাদের ছিল ট্রাঙ্কে তোলা ভেলভেট মোড়া কিস্তি টুপি। গোসল সেরে নতুন জামা জুতো টুপি পড়ে মসজিদে যেতাম ঈদের নামাজ পড়তে।
তার আগে ছিল নাস্তা খাওয়া। আমাদের গ্রামের মসজিদে নামাজ শুরুর সময় আটটা সাড়ে আটটা নির্ধারিত থাকলেও তা কখনোই নির্দিষ্ট সময়ে হত না। কারণ মসজিদের ইমামের কোন মাসিক বেতন ছিল না।
ঈদের নামাজের আগেই উপস্থিত নামাজিদের কাছ থেকে বার্ষিক রূপে ঐদিন ইমাম সাহেবের বেতন আদায় করা হত। অনেকেই চাকরি বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে গ্রামের বাইরে থাকলেও এই ঈদের সময় তারা সবাই গ্রামে ফিরে এসে পরিবারের সবার সাথে ঈদ পালন করত। সবাইকে একসাথে পাওয়ার একমাত্র সুযোগ ঈদ । আমাদের জন্য নতুন কাপড় বানানোর আয়োজন, পরিকল্পনা নির্বাচন, সবই ছিল অভিনব।
আমাদের সবকিছু নির্ধারিত হত বাবা ও মায়ের যৌথ পছন্দের ভিত্তিতে। এখনকার মতো সেই সময়ে গ্রামের মেয়েরা শহরের দোকানে, পার্শ্ববর্তী গঞ্জে, বাজারের দোকানে যেত না। বাবা কী করতেন, প্রতিদিন বাসায় ফেরার আগে রিকাবী বাজার এর সবগুলো কাপড়ের দোকান ঘুরে ঘুরে দেখতেন। নতুন ডিজাইন রংয়ের কোন পছন্দসই কাপড়ের আমদানির খোঁজ নিতেন।
নিজের পছন্দের সাথে মিললে তিনি সেই কাপড়ের সামান্য অংশ কেটে আনতেন নমুনা হিসেবে। কাপড়ের দোকানদার পরিচিত ছিল অথবা এমন একটা ব্যবস্থা কমবেশি প্রচলিত থাকতে পারে সেই কালে। মনে পড়ে যে রাতের খাওয়া দাওয়ার পর পান তামাক সেবনের ফাঁকে চলত কাপড় নির্বাচনে বাবা-মা, দুজনের বিচার-বিবেচনা। বিবেচনায় অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতো যেমন,
পাকা রং, নতুন ডিজাইন, কাপড়ের মান, টেকসই হবে কিনা, আমাদের গায়ের রঙের সাথে মানানসই হবে কিনা ইত্যাদি। এমন চলত বেশ কয়েকদিন। কাপড় পছন্দের পর একদিন বাজারে গিয়ে খলিফা বা দর্জির দোকানে মাপ দিয়ে আসা।
নতুন জামা জুতো বাড়িতে আনার পর তা খুব যত্ন করে লোহার ট্রাংকে তুলে রাখতাম। দিনে রাতে কতবার যে তা বের করে দেখতাম তার হিসাব ছিল না । ঈদের কষ্ট ছিল একটিই।
নতুন জুতা পায়ে দিয়ে ফোসকা পড়লে খালি পায়ে অথবা পুরান জুতা সেন্ডেল পায়ে দিয়ে চলতে বাধ্য হতাম ঈদের দিনের বাকি সময়। আজকের ঈদ সংস্কৃতির সঙ্গে আগের অনেক কিছুই মিলে না। সামনে নিশ্চয় আরও বদলে যাবে। তবুও ছোটবেলার ঈদের আনন্দ অবিস্মরনীয়,,অতুলনীয়। করীম রেজা, সাবেক অধ্যক্ষ, শধৎরসৎবুধ৯@মসধরষ.পড়স


