ফুটপাতে শেষ মুহুর্ত্বের কেনাকাটার ধুম
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০১ মে ২০২২, ০১:৪২ পিএম
# নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের সংখ্যাই বেশি
# সাধ্যের মধ্যে সবাইকে খুশি করতেই আপ্রাণ চেষ্টা
আজ আকাশে চাঁদ দেখা গেলে আগামী কাল সোমবার ঈদ-উল-ফিতর। অন্যথায় ঈদ হবে মঙ্গলবার। অর্থাৎ ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটার এখন চলছে একেবারে শেষ মুহুর্ত। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের কেনাকাটা অনেক আগেই শেষ। আর তাই শেষ মুহুর্তে এসে অনেক দরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের মানুষদেরও সচ্ছল মানুষদের মতো কেনাকাটার ব্যস্ততা বেড়েছে।
যারা চাকুরিজীবী, বিশেষ করে কারখানার সাধারণ শ্রমিক, নুন আনতেই পানতা ফুরোয়, তাদের ইচ্ছে থাকলেও আগে কেনাকাটা করার সুযোগ নেই। কারণ বেশিরভাগ কারখানায়ই বোনাস ও বেতন দিচ্ছে এপ্রিলের শেষ মুহুর্তে। যদিও মাস পুরোপুরি শেষ হয়ে ঈদের ছুটি পড়ছে, তারপরও বেশিরভাগ কারখানায়ই পুরো বেতন দিচ্ছে না, দেওয়া হচ্ছে হাফ বেতন।
তা-ও ভাল, অন্তত বেতনতো পাচ্ছে। কিন্তু কিছু কিছু কারখানাতো আবার বেতন না দিয়েই বন্ধ করে দিয়েছে। সেসব কারখানার শ্রমিকরা পড়েছে বেকায়দায়। তবে বেতন হউক বা না হউক, ছেলে-মেয়েদের তো নতুন জামা কাপড় চাই-ই-চাই। আর তাইতো কেউ শেষ মুহুর্তে এসে বেতন বোনাস পেয়ে,
কেউ আবার মাসিক খরচায় একটু হেরফের করে, আবার কেউ হয়তো কারও সাহায্য সহযোগিতা কিংবা ধার-দেনা করে হলেও তাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য কেনাকাটা করছে। আর যেহেতু সময় খুব কম তাই সবাই তাদের সাধ্য ও সামর্থ্য মত চেষ্টা করছে কেনাকাটা সেরে ফেলতে। কম বাজেটের ক্রেতারা তাদের পছন্দের পোশাক, জুতা,
স্যান্ডেল, প্রসাধনী ও গয়নাসহ অন্যান্য পছন্দের জিনিসগুলো কম দামে কেনার জন্য ফুটপাতসহ ভাসমান দোকানগুলোতে ভিড় করছেন। শেষ মুহুর্তের কেনাকাটায় শহরের শপিং মল থেকে শুরু করে ব্যস্ততায় সময় কাটছে ফুটপাত ও অলিগলির ছোটখাট ভাসমান দোকান মালিকদের।
তবে শেষ মুহুর্তের এই কেনাকাটায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় শপিং মলের তুলনায় ভাসমান দোকানগুলোতে ভিড় বেশি। এখানে দাম তুলনামূলক একটু কম হওয়ায় ক্রেতারাও তাদের চাহিদানুযায়ী কেনাকাটা সারতে পারছেন।
গতকাল বিকেলে শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে, আমলাপাড়ার হকার্স মার্কেটে, পুরানো কোর্ট এলাকার শায়েস্তা খান সড়ক এবং সিরাজদৌল্যা সড়কের নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল ও নারায়ণগঞ্জ কলেজের সামনের ভাসমান দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড়।
এসব এলাকায় সাধারণত নিম্ন-বিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের মানুষও কেনাকাট করছেন। তাই কেনাকাটার এই শেষ মুহুর্তে শপিং মলের তুলনায় ভাসমান দোকান পাটে কেনাকাটর ধুম পড়েছে অনেক বেশি। এখানে তুলনা মূলকভাবে কমদামে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পেরে খুশি ক্রেতারা, তেমনি শেষ মুহুর্তে হলেও ক্রেতাদের চাপ বাড়ায় খুশি দোকানদাররা।
মাকসুদা খাতুন কাজ করেন পঞ্চবটি বিসিকের একটি তৈরি পোশাক কারখানায়। থাকেন ইসদাইর গাবতলী এলাকায়। ৪ বছরের মেয়ে সানজিদা ও ৬ বছরের ছেলে রাশিদুলকে নিয়ে এসেছেন ঈদের কেনাকাটা করতে। স্বামী মাদকাসক্ত থাকায় ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তিনি প্রায় দুই বছর যাবত এখানে বাস করছেন। বেতনের টাকায় টেনেটুনে সংসার চলায় বাড়তি টাকা ছিল না হাতে।
তাই বোনাস ও বেতনের অর্ধেক টাকা পাওয়ায় সেখান থেকেই তাদের জন্য কিছু কেনাকাটার জন্য এসেছেন। তিনি জানালেন বড় দোকানে দাম বলতে পারবো না, তাই এখান থেকেই কিছু কিনলাম। মেয়ের জন্য পুরানো কোর্ট এলাকা থেকে ৪০০ টাকা দিয়ে এবং ছেলের জন্য সাড়ে ৫ শত টাকা দিয়ে শার্ট-প্যান্ট কিনেছেন। এখন মেয়ের জন্য শুধু জুতা কিনবেন তিনি।
হাজীগঞ্জ থেকে এসেছেন গৃহবধু তাসফিয়া আক্তার, তিনি জানান, গত তিন-চারদিন আগে তিনি তার মেয়ের জন্য সাড়ে চারশত টাকা দিয়ে জামা কিনেছেন। এখন তার বোনের মেয়ের জন্য সেই একই জামা কিনতে এসেছেন। তিনি জানান, মার্কেটে অবস্থিত দোকানের তুলনায় এখানে কিছুটা সস্তায় পাওয়া যায়। তাই তিনি প্রায়ই এখান থেকে কেনার চেষ্টা করেন।
মেয়েদের তৈরি পোশাক বিক্রেতা সিদ্দিকুর রহমান জানান, রোজার মাঝামাঝিতেও ক্রেতাদের তেমন কোন ভিড় না থাকায় মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। বিশ রোজার পর থেকে লোকজন আসা শুরু করলেও তেমন চাপ ছিল না। তবে এই সপ্তাহ জুড়ে মোটামুটি ভাল বেচাকেনা হয়েছে। তিনি জানান, গত দুই বছর করোনার কারণে বেচাকেনা করতে না পেরে খুবই অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। এবারও ধারদেনা করে মালামাল ক্রয় করেছি। তাই প্রথম দিকে যখন ক্রেতা পাচ্ছিলাম না, তখন খুবই চিন্তায় ছিলাম। হয়তো এবার দেনা শোধ করারও সুযোগ পাব না। কিন্তু এখন সেই ভয়টা আর নেই।
চরসৈয়দপুরে থাকেন তৌহিদুল ইসলাম, পেশায় রিকশাচালক, দেশের বাড়ি ময়মনসিংহ। শহরের পুরাতন কোর্ট এলাকায় এসেছেন রাস্তার পাশের দোকান থেকে তার দুই জামাকাপড় কিনতে। তিনি জানান, আমার ছেলেরা বায়না ধরেছে ঈদের জন্য নতুন পোশাক লাগবে, আগামী কাল দেশের বাড়ি যাব। তাই এখান থেকে তাদের জন্য দুই সেট পোশাক কিনলাম। বড় বড় দোকানে যাওয়ার মতো সামর্থ্যতো আর আমাদের নেই। তাই এখান থেকেই কাজ সেরে নিলাম।
জুতা বিক্রেতা হালিম মিয়া জানান, আমরা যথা সম্ভব কমদাম রাখার চেষ্টা করি। আমাদের চাহিদা বেশি না, সংসার চালানোর মত উপার্জন করতে পারলেই আমরা পণ্য ছেড়ে দেই। তাছাড়া সবাই বড় দোকানে যাওয়ার সাহস পায়না। আমাদের সাথে যেভাবে দামাদামি করতে পারে, সেখানে সেভাবে দামাদামি করতে সাহস পাবে না। গত দুই বছর কোন ব্যবসা ছিল না। এবার ব্যবসা মোটামুটি ভালই হয়েছে।


