আজ পয়লা মে। মহান মে দিবস।মে দিবস শ্রমিক শ্রেণীর প্রেরণা ও বিজয়ের দিনরূপেও বরণীয়। শ্রমিক শ্রেণীর এই বিজয়রথ গন্তব্যে পেীঁছেছিল দীর্ঘ সংগ্রামের রক্তঝরা পথ অতিক্রম করে।
আন্দোলনে ওই সময় মারা যায়Ñ আলবার্ট পারসন, জর্জ এঞ্জেল, স্পাইজ, এডলফ ফিশার ও আরো অনেক শ্রমিক।১৮৮৬ সালের এই ঐতিহাসিক দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো নগরীর হে মার্কেটের শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে সর্বাত্মক ধর্মঘটে যোগ দিয়েছিল।
সূচিত হয়েছিল মানব সভ্যতায়শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাস। শুধু অধিকার আদায়ের ইতিহাসই নয়, নিজেদের নিপুণ কারুকার্যে শ্রমিক শ্রেণী গড়ে তুলেছে এক অবিস্মরণীয় বিশ্ব সভ্যতা। তাই যুগে যুগে শ্রমিক শ্রেণীর লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস, সভ্যতা বদলের ইতিহাস। আমেরিকার মতো সভ্য দেশেও শ্রমের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না।
সেখানেও সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শ্রমিকদের কাজ করতে হতো। কোথাও কোথাও আবার পনেরো, ষোলো এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আঠারো ঘণ্টা পর্যন্ত। ১৮২০ থেকে ১৮৪০ পর্যন্ত আমেরিকার বিভিন্ন শিল্প এলাকায় কাজের সময় কমানোর জন্য ধর্মঘট-আন্দোলন হয়। ১৮৬৬ সালে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন’।
এই ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে ১৮৬৬ সালের ২০ আগস্ট আয়োজিত সম্মেলনে কাজের সময় কমিয়ে তা নির্দিষ্ট করার উদ্দেশ্যে একটি প্রস্তাব পাস হয়। তাতে বলা হয়, ‘এই দেশের শ্রমিক শ্রেণীকে পুঁজিবাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য এই মুহূর্তের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো এমন একটি আইন পাস করাÑ যার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব রাজ্যেই সাধারণ কাজের দিন হবে আট ঘণ্টা, এই মহান লক্ষ্য পূর্ণ করার পথে সমগ্র শক্তির নিয়োগ করার সংকল্প আমরা গ্রহণ করছি।’
সদ্য সমাপ্ত আমেরিকান গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্তিতে শ্রমিকদের এই আন্দোলন বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এ বিষয়ে কার্ল মার্কস ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত তার ‘পুঁজি’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বলেন, ‘ক্রীতদাস প্রথার দরুণ মার্কিন প্রজাতন্ত্রের একটি অংশ বিকলাঙ্গ হয়ে থাকায় এতদিন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বতন্ত্র শ্রমিক আন্দোলন একেবারে পঙ্গু হয়ে ছিল।
কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক যেখানে ক্রীতদাস, শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক সেখানে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। ক্রীতদাসত্বের সমাধির ওপরই নবজীবনের অভ্যুদয় ঘটে। গৃহযুদ্ধের প্রথম অবদান হলো দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের আন্দোলন। অবাধ গতিতে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত, নিউ ইংল্যান্ড থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত।’
১৮৮০ -এর দশকে আমেরিকায় ‘আট ঘণ্টা শ্রম সমিতি’ থেকে নিয়ে আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণীর প্রথম সংগঠিত দল সোশ্যালিস্ট লেবার পার্টি আট ঘণ্টা শ্রম সময়ের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করে। বামপন্থী শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘সেন্ট্রাল লেবার ইউনিয়ন’ এই দাবিতে ১৮৮৬ সালের ১ মে’র ঠিক আগের রোববার একটি সমাবেশ করে, যাতে উপস্থিত থাকে পঁচিশ হাজার শ্রমিক।
এরপর শ্রমিকদের আরো বড় এক সমাবেশ শিকাগোতেই হয় ১ মে তারিখে। আট ঘণ্টা শ্রম সময়ের এই দাবিতে আহূত সমাবেশে যোগ দেয়ার জন্য শ্রমিকরা ধর্মঘট করে কারখানা থেকে বের হয়ে আসেন। ১ মে’র সমাবেশে আট ঘণ্টা শ্রম সময়ের দাবি গৃহীত হওয়ার পর ৩ ও ৪ মে সেখানে হে মার্কেট স্কোয়ারে যে সভা হয় তার ওপর পরপর দু’দিন পুলিশ গুলি চালায়।
এতে ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, আহত হন আরো অনেকে। এ থেকেই স্পষ্ট হয়, শ্রমিকরা নিজেদের মজুরি বৃদ্ধি এবং শ্রম সময় কমানোর দাবিতে সংগঠিত হতে থাকলে এর সঙ্গে যুক্ত মালিকশ্রেণী ও তাদের সরকার এই আন্দোলন মোকাবিলা করতে বদ্ধপরিকর হয়।
১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফরাসি বিপ্লবের শুরুতে বাস্তিল দুর্গের পতনের শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে নানা দেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতারা প্যারিসে সমবেত হন। এ সম্মেলনে শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কর্মদিবস প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং সিদ্ধান্ত হয়, প্রতি বছর ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে উদযাপনের।
এই দিবস উদযাপনের তাৎপর্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৮৯০ সালের ১ মে কমিউনিস্ট ইশতেহারের চতুর্থ জার্মান সংস্করণের ভূমিকায় ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস বলেন, ‘এই লাইনগুলো আমি যখন লিখছি, ঠিক তখনই ইউরোপ ও আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণী তাদের সামর্থ্যরে হিসাব-নিকাশ করছেন। ইতিহাসে এই প্রথম শ্রমিক শ্রেণী একটি সৈন্যবাহিনী হিসেবে,
একই পতাকাতলে একটিমাত্র লক্ষ্য পূরণের জন্য সংগ্রাম করছেন; সেই লক্ষ্য হলো, আট ঘণ্টা কাজের দিনকে আইনের স্বীকৃতির ওপরে প্রতিষ্ঠিত করা। আজ আমরা যে চিত্র প্রত্যক্ষ করছি তা থেকে সমস্ত দেশের পুঁজিবাদী আর জমিদাররা বুঝতে পারবে, সমস্ত দেশের শ্রমিকরা আজ সত্যি সত্যিই ঐক্যবদ্ধ।’
আমেরিকার শিকাগো শহরের শহীদ শ্রমিকদের অনুপ্রেরণায় উদ্বীপ্ত হয়ে দাবি আদায়ে সংগ্রামী এ অঞ্চলের শ্রমিকরা। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে রেল, চা বাগান ও স্টিমার শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও সংহতি বৃটিশদের কাঁপিয়ে তোলে। পরবর্তীকালে সুতাকলসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক দাবি আদায়ের জন্য সংগঠিত হয়। এ সময় গড়ে ওঠে ট্রেড ইউনিয়নসমূহ। ইউনিয়নের সদস্যরা মে দিবস পালনের চেষ্টা চালায়। কিন্তু অধিকাংশ স্থানে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় গোপনে গোপনে মে দিবস পালিত হয়।
১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে মে দিবস পালিত হয় নারায়ণগঞ্জে। মে দিবসে ছুটি চেয়ে দাবি ওঠে সব জায়গায়। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয় মে দিবস। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে মে দিবস পালিত হয় ব্যাপকভাবে। ১৯৭২ এর মে দিবসেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম মে দিবসের দিন ১ মে কে ছুটির দিন ঘোষণা করেন।
এতো সংগ্রাম এতো ত্যাগ তার সার্থকতা আজো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আসেনি। আজো এদেশে সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত একটানা চলে চলে শ্রমের বাজার। অতিরিক্ত কাজ করিয়েও কোথাও কোথাও আট ঘণ্টার টাকা দেয়া হয়। অনেক শ্রমজীবী নারী জানে না মে দিবস কী? আজকের শ্রমজীবী মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাকÑ এটা প্রত্যাশা করি। লেখক: কলামিস্ট।


