শ্রমিক অসন্তোষে লাঠিপেটা নয় দরকার ন্যায্য পাওনা পরিশোধ
নীরব প্রকাশ
প্রকাশ: ০১ মে ২০২২, ০৮:২৭ পিএম
আমাদের দেশে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা না দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর ঈদকে সামনে রেখে যেন এই ঘটনা আরও বৃদ্ধি পায়। ঈদ আসলেই পত্রপত্রিকায় দেখা যায় শ্রমিকদের পাওনা টাকা পরিশোধের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম। সেই আন্দোলন সংগ্রাম প্রতিহত করতে হয়তো লাঠিপেটা কিংবা পুলিশের হস্তক্ষেপ করতে হয়।
কিন্তু মালিক পক্ষের সাথে শ্রমিকদের একটি ভাল বোঝাপড়া থাকলে নিয়মিত তাদের পাওনা পরিশোধ করা হলে এ ধরণের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়। তাইতো ইসলাম ধর্মেও শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে বলা হয়েছে ‘শ্রমিকদের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তাদের ন্যায্য পাওনা বুজিয়ে দাও।’ সম্প্রতি বাণিজ্য, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বরাবর ঢাকা মহানগরী,
সাভার-আশুলিয়া, টঙ্গী-গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের ১২৫টি পোশাক তৈরি কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। সেই সূত্র অনুযায়ী এসব কারখানায় চলতি বছরের মার্চের বেতন-ভাতা ঈদের আগে পরিশোধের সম্ভাবনা নেই উল্লেখ করে এসব কারখানার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আগেই প্রশাসন,
মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা উল্লেখ করা হয়, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় অবদান রাখা এই তৈরি পোশাক শিল্পের কিছু মালিক নানা অজুহাতে প্রতি মাসে সময়মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেন না। অনেক ক্ষেত্রে পূর্ব নোটিশ ছাড়াই কারখানা বন্ধ করে দেয় মালিকপক্ষ।
সম্প্রতি এই বিষয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের এক প্রতিবেদন পুলিশ সদর দফতর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে চিঠি পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এদিকে, পোশাক কারখানার কর্মীসহ সব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ২০ রোজার মধ্যে বোনাস এবং ঈদের ছুটির আগে এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনের বেতনের বিষয়ে গার্মেন্টস মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় পর্ষদ সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এদিকে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাসসহ সব বকেয়া আগামী ২০ রমজানের মধ্যে পরিশোধ করার দাবি জানিয়েছে জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন এবং গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটি।
প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ বরাবরই শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ। বৃটিশ আমলের সেই পাটের স্বর্ণযুগে এই নারায়ণগঞ্জ ছিল পাট বানিজ্যের সুতিকাগার। পাট বণিজ্যের অবসান হলে সেই স্থান দখল করে তৈরী পোশাক শিল্প। দেশের মোট রপ্তানী আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে তৈরী পোশাক শিল্প থেকে।
এখানকার তৈরি পোশাক কারখানায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যনে জানা যায়। অথচ প্রতি বছর রমজানের সময় এই তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মধ্যেই দেখা দেয় অসন্তোষ। এবারের রমজানও তার ব্যতিক্রম নয়। গতকালও বুধবার ৩ মাসের বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন আদমজী ইপিজেড’র বেকা গার্মেন্টস এন্ড টেক্সটাইল লিমিটেড এর শ্রমিকরা।
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধু সড়কের একপাশ অবরোধ করে তারা এ কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে শ্রমিকরা তাদের বকেয়া বেতন যথাসময়ে বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮ থেকে ৯শত শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমিকরা জানান, রমজান মাস, সামনে ঈদ, অন্যদিকে বাড়ি ভাড়া বাকি পড়ে আছে।
তারপরও মালিক পক্ষ বেতন দিচ্ছেন না বলে বাধ্য হয়ে অবরোধ করে আন্দোলন করতে হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেলে সিদ্ধিরগঞ্জের এ্যাপলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেড এর শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে শিমরাইল-ডেমরা সড়কে আগুন জালিয়ে অবরোধ করে। এসময় শ্রমিকরা প্রায় আধাঘন্টা রাস্তা অবরোধ করে অগ্নিসংযোগ করেন। পরে শিল্প পুলিশ ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ আগামী বৃহস্পতিবার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও বোনাস দেওয়া আশ্বাস দিলে শ্রমিকরা রাস্তা থেকে অবরোধ তুলে নেয়। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ শিল্প পুলিশের (অঞ্চল-৪) পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, বোনাসের দাবিতে এ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেডের শ্রমিকরা বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে।
এতে যানজটের সৃষ্টি হলে বুঝিয়ে আমরা শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেই। অন্যদিকে বেকা গার্মেন্ট অ্যান্ড টেক্সটাইলের শ্রমিকদের বিষয়ে তিনি মিডিয়াকে জানান, এই বিষয়ে এর আগে মালিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানিয়েছিলেন শ্রমিকদের বকেয়া বেতন বুঝিয়ে দেবে। কিন্তুগত কয়েকদিন ধরে মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে। তাই তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।


