Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

গিয়াসউদ্দিন যে কারণে গলার কাঁটা

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ১২ মে ২০২২, ০৭:২২ পিএম

গিয়াসউদ্দিন যে কারণে গলার কাঁটা
Swapno

# শিক্ষকতা থেকে প্রভাবশালী রাজনীতিক
# দল-মত নির্বিশেষে সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি

 

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতাঙ্গনে একজন বর্ণাঢ্য রাজনতীবীদ হিসেবেই সমাদৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। ৭১ তিনি ছিলেন রণাঙ্গণের একজন মুক্তিযোদ্ধা। দলমত নির্বিশেষে অনেকের কাছেই তিনি একজন শিক্ষানুরাগী। ভালোবেসে মানুষ ডাকেন, ‘শিক্ষা বন্ধু’। একাধিক স্কুল, কলেজ, মসজিদ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।

 

শিক্ষার বিস্তারে নিজেরে জীবনের আয় করা অর্থের প্রায় সবই বিলিয়ে দিয়েছেন। দুই হাতে দান করে দিচ্ছেন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমি থেকে শুরু করে নিজের উপার্জিত অর্থে কেনা জমি। তার সন্তানদের দ্বিমত না থাকাতে শিক্ষা বিস্তারে অর্থ সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটি তার জন্য সহজ হয়েছে। তার সন্তানরাও চান, তাদের বাবা ও দাদার অর্থ সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যয় হোক।

 

স্থানীয় সূত্র বলছে, গিয়াসউদ্দিন ও তার পরিবার চাইলে শুধু সিদ্ধিরগঞ্জই নয়, জেলার অন্য যে কোনো পরিবারের থেকেও আলিসান, বিলাসী জীবন যাপন করতে পারতেন। হতে পারতেন কোনো গ্রুপ অব কোম্পানির মালিক। কিন্তু গিয়াসউদ্দিন সে পথে হাঁটেননি। তিনি নেশার মতই শিক্ষা বিস্তারকে বেছে নিয়েছেন। যার কারণে সেই ছাত্রাবস্থায় থাকাকালিন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রেবতী মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে।

 

আজ সেই রেবতী মোহন এই জেলায় অধিক পরিচিতি পাওয়া একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ছাত্রাবস্থাতেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন গিয়াসউদ্দিন। পড়েছেন ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। হয়েছে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ। মিষ্টভাষী, সদালাপী হিসেবেও তার খ্যাতি রয়েছে। মানুষের কাছে তিনি নম্র ও ভদ্র গোছের একজন ব্যক্তি। অনেকের কাছে তিনি অনুকরণীয়ও।

 

তার সেই পথ ধরেই হাঁটছেন তার সন্তানেরা। তার চার ছেলের মধ্যে গোলাম মুহাম্মদ সাদরিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পাঁচ নং ওয়ার্ডের দুবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর। স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র স্বভাবের একজন মানুষ সাদরিল। ছোট বড় সকলের কাছেই তিনি ভালোবাসার মানুষ। বাবার পথ ধরে তিনিও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত।

 

গিয়াসউদ্দিনের অপর ছেলে গোলাম মুহাম্মদ কাউছার রিফাতও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তিনিও অত্যন্ত নম্র, ভদ্র স্বভাবের মানুষ। তিনি কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সদস্য হলেও নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তার পথচলা এখনও শুরু হয়নি। তবে তিনি বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে অবদান রাখতে আগ্রহী।

 

গিয়াসউদ্দিন রেবতী মোহন উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়াও প্রতিষ্ঠা করেছেন গিয়াসউদ্দিন ইসলামিক মডেল কলেজ, গিয়াসউদ্দিন মডেল স্কুল, বীর মুক্তিযোদ্ধা গিয়াসউদ্দিন সিটি স্কুল, বীর মুক্তিযোদ্ধা গিয়াসউদ্দিন গার্লস স্কুল, দেলপাড়া গিয়াসউদ্দিন মডেল স্কুল। এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি মাদরাসা ও মসজিদও তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

 

এসব প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজের উপার্জিত অর্থ ও পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিতে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও জেলাব্যাপী ব্যাপক অবদান রেখে চলেছেন। প্রতিবছরই গিয়াসউদ্দিন ইসলামিক মডেল কলেজের শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হচ্ছেন। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। শুরুতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

 

সেসময় জাতির জনকের ডাকে দেশ মাতৃকার টানে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। নয় মাস রণাঙ্গনে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হলে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জনতার পক্ষে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

পরবর্তীতে তিনি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবেও  নির্বাচিত হোন। এরমধ্যে তিনি কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি নির্বাচিত হোন। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতেও তিনি ব্যাপক অবদান রাখতে শুরু করেন। সাহসী এবং দক্ষ একজন সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সর্বস্তরেই তিনি সমাদৃত হতে থাকেন। সেই সূত্র ধরে ১৯৯৬ সালে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নও পেয়েছিলেন।

 

কিন্তু তার প্রতিপক্ষ শামীম ওসমান নানা কৌশলে সেই মনোনয়ন ছিনিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর থেকেই নিজ দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী দ্বারাই নিগৃহিতের শিকার হতে থাকেন গিয়াসউদ্দিন ও তার পরিবার। সূত্র বলছে, ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত শামীম ওসমান এমপি থাকাকালিন সময়ে সব থেকে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন গিয়াসউদ্দিন।

 

সেসময় নুরুল আমিন মাকসুদ ওরফে বরিশাইল্লা মাকসুদ, এস এম সায়েম মিঠু ওরফে অগা মিঠু এবং নূর হোসেন দ্বারা গিয়াসউদ্দিন নানাভাবে নাজেহাল হতে থাকেন। তার পরিবারও এদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়নি। গিয়াসউদ্দিনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জমি দখলে নিতে শুরু করেন তারা। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে যোগ দেন বিএনপিতে।

 

জানা গেছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মতিন চৌধুরী গিয়াসউদ্দিনকে বিএনপিতে যোগদান করান। সেসময় গিয়াসউদ্দিনের জনপ্রিয়তা বিবেচনায় দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তাকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেন। সে নির্বাচনে প্রভাবশালী শামীম ওসমানকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন গিয়াসউদ্দিন। নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পরপরই নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছিলেন শামীম ওসমান।

 

এদিকে ওই নির্বাচনের পরপরই মানুষের মাঝে ভুল তথ্য ছড়াতে থাকেন কিং মেকার হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আলী। তিনি বিভিন্ন স্থানে ছড়াতে থাকেন, গিয়াসউদ্দিনকে তিনিই বিএনপিতে এনেছিলেন।

 

তিনিই তাকে দলীয় নমিনেশন পাইয়ে দিয়েছিলেন! তবে, এই তথ্যটি আদতে সত্য নয় বলে বিএনপির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানিয়েছে, মোহাম্মদ আলী সফর আলী ভূঁইয়াকে নমিনেশন এনে দিয়েছিলেন। গিয়াসউদ্দিন বিএনপিতে যোগদান করায় সফর আলীর কপাল পুড়েছিল।

 

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে আসা গিয়াসউদ্দিন এমপি নির্বাচিত হলেও পদে পদে থাকে প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে। মূলত সেসময় মোহাম্মদ আলী চেয়েছিলেন, গিয়াসউদ্দিনকে পুতুল এমপি বানাতে।

 

কিন্তু সেদিকে পা বাড়াননি রাজনীতিতে অভিজ্ঞ গিয়াস। তিনি দলের প্রতি আনুগত্য আর ভোটারদের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে নিজের স্বাতন্ত্রতা বজায় রেখেছিলেন। এ নিয়ে মোহাম্মদ আলীর সাথে সৃষ্টি হয় তার দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের জেরে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন বঞ্চিত হয় ফতুল্লা। তারপরও নিজের সক্ষমতার বলে যেখানে যতটুকু সম্ভব হয়েছিল উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন গিয়াসউদ্দিন।

 

এদিকে এক এগারতে সেনা শাসিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর জিয়া পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে বেশ কয়েকটি মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন গিয়াসউদ্দিন। দীর্ঘদিন তাকে কারাভোগ করতে হয়েছিল। সেসময় তাকে দিয়ে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা, সাক্ষী দেওয়ানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল। তবে কিছুতেই টলানো সম্ভব হয়নি বীর এই মুক্তিযোদ্ধাকে। তিনি জিয়া পরিবারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে ছিলেন কৃতজ্ঞ।

 

পরবর্তীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে গিয়াসউদ্দিন জেলখানায় বন্দি থাকার সুযোগে বিএনপির মনোনয়ন পান শাহ্ আলম। যদিও সে নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সারাহ বেগম কবরীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে এই শাহ্ আলমই গিয়াসউদ্দিনকে নিজের প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করেন।

 

পরবর্তী নির্বাচন থেকে গিয়াসউদ্দিনকে দূরের রাখার লক্ষ্যে এবং  দল থেকে মাইনাস করার চেষ্টা করতে থাকেন। গিয়াসউদ্দিনকেও ঘরে ও বাইরের প্রতিপক্ষ সামলিয়ে চলতে হয়। দীর্ঘ এই তের বছরে গিয়াসউদ্দিন অন্তত ৫৫টি মামলার আসামি হয়েছেন। যার প্রতিটিই রাজনৈতিক মামলা। তার পাশাপাশি তার সন্তানেরাও একাধিক মামলার আসামি হয়েছেন। তাদের একমাত্র অপরাধ তারা গিয়াসউদ্দিনের সন্তান।

 

সূত্র বলছে, সামনে নির্বাচন আসছে। গিয়াসউদ্দিনের প্রতিপক্ষরাও নির্বাচনকে সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। যে করেই হোক নির্বাচন থেকে তাকে দূরে সরাতে নানা কুটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে তারা। তাদের অনেকের কাছেই গিয়াসউদ্দিন ভয়ের কারণ।

 

কেননা, গিয়াসউদ্দিনের জনপ্রিয়তায় এখনও এতটুকু ভাটা পড়েনি। বরং যে কোনো সময়ের থেকে তিনি রাজনীতিতে আরো বেশি পরিপক্ব হয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীরাও তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল হয়ে উঠছেন। আর এতেই যেন গিয়াসউদ্দিন ও তার পরিবারের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

গিয়াসাউদ্দিনের প্রতিপক্ষের লোকজন যে শুধু ভিন্ন দলের তা নয়। তার প্রতিপক্ষ নিজ দলেও রয়েছেন। তারা সকলেই গিয়াসউদ্দিন ঠেকাও লক্ষ্যে একাট্টা হয়ে নানা রঙের খেলায় মেতে উঠেছেন। এরা গিয়াসউদ্দিনকে কাবু করতে না পেরে বেছে নিয়েছেন তার পরিবারকে। তাদের টার্গেটে এবার পড়েছেন গিয়াসউদ্দিনের ছোট চেলে মুহাম্মদ কাউছার রিফাত।

 

মামুন মাহমুদকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় রিফাতকে ফাঁসানোর জন্য নিজ দল বিএনপি ও প্রতিপক্ষ শিবির আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ একযোগে কাজ করে চলেছে।

 

তবে, গিয়াসউদ্দিন অনুসারিরা বলছেন, গিয়াসউদ্দিন লড়াই করে টিকে থাকা মানুষ। তাকে কাবু করা সম্ভব নয়। তিনি দলের প্রতি আনুগত্য। জিয়া পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞ তিনি। সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে যত যা হোক তিনি শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবেন।

 

এতদিন তাকে দমাতে কম ষড়যন্ত্র হয়নি। এখনও হচ্ছে। সব ষড়যন্ত্র নসাৎ করে তিনি আবারও স্বগৌরবে ফিরবেন। তিনি একজন রণাঙ্গণের যোদ্ধা। যোদ্ধারা কখনও পিছু হটেন না। তিনিও হটবেন না।


 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন