ইসদাইরে সমবায় কাশেমের পকেট কমিটি নিয়ে তুমুল উত্তেজনা
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২২, ০৪:৪৪ পিএম
# বের হয়ে আসছে তার ১৬ টি অডিটে কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য
# সাধারণ সম্পাদক টিটু বলছে কিভাবে কমিটি হয়েছে সে কিছুই জানে না
কথায় বলে কুকুরের লেজ বজ্রপাতেও সোজা হয় না। সেই ২০১৯ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে ফতুল্লার মধ্য ইসদাইর শাহী জামে মসজিদে। সেই সময় এলাকার সাধারণ মানুষ ও মসজিদে নিয়মিত চাঁদা প্রদানকারীদের অবজ্ঞা করার কারণে সংসদ সদস্য শামীম ওসমান্রে হস্তক্ষেপে শিল্প সংস্থা ওরফে সমবায় কাশেমের মসজিদ পকেট কমিটি স্থগিত করে দেয়া হয়েছিল।
মসজিদে জীবদ্দশায় ২০ বছর ধরে চাঁদা দেয়নি বা এমনকি চাঁদা দেয়ার খাতায় যুগের পর যুগ বকেয়া থাকা অযোগ্য লোকদের নিয়ে কমিটি ঘোষনা করা হয়েছিল। সেটি ছিলো ২০১৯ সালের রমজান মাসে। সেই কাশেম পকেট কমিটি আবার সক্রিয় হয়ে পুনরায় গত শুক্রবার ১৩ মে এলাকাবাসীর সাথে কোন রকম আলোচনা না করেই একই কেলেংকারী পুনরাবৃত্তি করছে।
সমবায় কাশেম ওরফে শিল্প সংস্থা কাশেম নিজেকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক টিটুকে সাধারন সম্পাদক করে ৩০ সদস্যদের একটি কমিটি গত শুক্রবার জুম্মা নামাজে ঘোষণা করেন।
কমিটি ঘোষনার সময় মসজিদে থাকা প্রবীন সাবেক ইউপি সদস্য ও মসজিদ কমিটির পুরনো সহ-সভাপতি আলী আকবরসহ মসজিদে চাঁদা প্রদানকারী ১২০ সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সেই ২০১৯ সালের মতো ফের এলাকায় দফায় দফায় সাধারণ ভদ্র মুসল্লীদের সাথে পকেট কমিটি সদস্যদের বিতর্ক শুরু হয়েছে। এ নিয়ে যে যার মতো দল ভারী করে মাঠে নামতে শুরু করেছে।
এদিকে এ ঘটনার প্রেক্ষিতে কমিটি শীর্ষ দুই কর্মকর্তা মধ্যে দুজনের একজনের ১৬ টি অডিট দূর্নীতির তথ্য প্রমানসহ গণমাধ্যম কর্মীদের হাতে পৌছেছে। যা তদন্ত শেষে অচিরেই প্রকাশ হবে।
স্থানীয় মুসল্লীরা জানায়, গত শুক্রবার যে কমিটি ঘোষনা করা হয়েছে সেই কমিটি আদলে মসজিদ মোতওয়ালী রজমান প্রধানের বরাত দিয়ে ৩০ সদস্যের যে কমিটি গঠন ক্রা হয়েছে তা পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে কমিটি ৩০ জনের মধ্যে কমিটিতে স্থান পাওয়া উপদেষ্টা, সহ-সভাপতি জয়েন সেক্রেটারীসহ প্রায় ১৫ জনের সাথে স্বঘোষিত কমিটি কোন আলোচনা করেনি।
এছাড়া কমিটিতে এ জীবনে চাঁদা দেয়নি আনোয়ার প্রধান। মসজিদে মুখ মোবারক বছরের বছরের পর দেখা যায়নি এমনকি যুগের পর যুগ ধরে চাঁদা দেয়নি তাদেরকে স্থান দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে স্বঘোষিত সভাপতি কাশেম থাকেন ঢাকাতে। অথচ মসজিদের প্রাণ যারা নিয়মিত মাসিক চাঁদা বছরের পর বছর দিয়ে খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জিন বা খাদেমের বেতন পরিশোধে অবদান রেখেছে তাদের চরমভাবে অবজ্ঞা করা হয়েছে
বিশেষ করে বিগত দুই যুগ ধরে মসজিদের দায়িত্ব পালন করে আসা সাবেক ইউপি সদস্য ও মসজিদ কমিটির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আলী আকবরকে জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করা হয়নি। অথচ এলাকার অধিকাংশ মুসুল্লি তাকেই সভাপতি পদে দেখতে চাইছেন।
এদিকে এ নিয়ে এরই মধ্যে ঘোষিত সভাপতি কাশেম ও টিটু গোত্র একে অপরকে দোষারপ করে যাচ্ছে। খোদ স্বঘোষিত কমিটির সদস্যরাই বলছে , কমিটি বিষয়ে তারা কিছুই জানত না। মূলত কমিটিতে টিকে থাকতে স্বঘোষিত সভাপাতি কাশেম ও টিটু নিজেদের পদ রক্ষায় পকেটে কমিটি গঠন করার পায়তারা করছে।
অভিযোগ রয়েছে পুরো ঘটনার ইন্ধন দিচ্ছে আবুল কাশেম ওরফে সমবায় কাশেম। আবার কেউ কেউ বলছে টিটু হলো নাটের গুরু। মূলত যে কাশেম এর আগে সিদ্ধিরগঞ্জ গোদনাইল শিল্প সংস্থা পিস্তল উচিয়ে সাংবাদিকদের মারধরের নেতৃত্ব দিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা হাজতে ছিলো। তার বিরুদ্ধে সমবায়ে ১৬ টি অডিটে কোটি টাকার দূর্নীতির তদন্ত চলছে।
১৩ মে শুক্রবার মধ্য ইসদাইর শাহী জামে মসজিদের যে স্বঘোষিত কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়েছে সেটা নিন্মরুপ। মসজিদের মোতোয়ালি হাজী মোঃ রমজান আলী প্রধান (২০১৯ সালে থেকে মে ২২ পর্যন্ত বকেয়া বেতন) স্বঘোঘিত সভাপতি-আলহাজ্ব মোঃ আবুল কাশেম, সিনিয়র সহ-সভাপতি আলী আকবর (কমিটি গঠন বাদ তাকে পদ দেয়া হচ্ছে এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না), সহ-সভাপতি-হাজী মোঃ রুহুল আমিন প্রধান (মাসিক পুষ্পা রাজ ৫০ টাকা চাঁদা প্রদানকারী)।,
হাজী মোঃ আনিসুজ্জামান বকুল (কমিটি গঠন বা তাকে পদ দেয়া হচ্ছে এ বিষয়ে নিয়ে জানতেন না), শাকিলুর রহমান বাবলু, মোঃ মজিবুর রহমান, মাান্নান ডাক্তারের ছেলে মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন সোহেল (১৮ বছর যাবত বকেয়া বেতন), হাজী মোঃ সফিকুল ইসলাম, মোঃ রেজাউল হায়দার কানন, নোমান চৌধুরী সুমন (কমিটি নিয়ে বা তাকে পদ দেয়া হচ্ছে এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না),
সাধারণ সম্পাদক-আলহাজ্ব জিয়াউল হক টিটু (নাটের গুরু বলা হচ্ছে তাকে), সাংগঠনিক সম্পাদক-আনোয়ার হোসেন প্রধান (বেতনের চাঁদা খাতায় তার নামটি নেই), যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক-হাজী মোঃ সাইদুর রহমান (কমিটি গঠন বা পদ নিয়ে কিছুই জানেন না), কোষাধ্যক্ষ-মোঃ শাহাদাৎ হোসেন প্রধান (২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বেতন দেননি, আবার মধ্যে দিয়ে দুই বছর বেতন দিয়েছেন আবার ২০২০ থেকে আবার ২০২২ পর্যন্ত অনিয়মিত),
সহ-কোষাধ্যক্ষ-হাজী মোঃ মোস্তফা চৌধুরী (কমিটি গঠন বা তার নাম দেয়া হচ্ছে জানতেন না), প্রচার সম্পাদক-মোঃ আমির হোসেন প্রধান (২০১৩ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত বকেয়া বেতন), দপ্তর সম্পাদক-রেজাউল হাসান ছোটন (কমিটি নিয়ে জানতেন না), ধর্মবিষয়ক সম্পাদক-মাহাবুবুল আলম মন্টু প্রধান, সহ- ধর্মবিষয়ক সম্পাদক-মোঃ মামুন শিকদার হোসাইন (কমিটি গঠন বা তার নাম দেয়া হচ্ছে জানতেন না)।
উপদেষ্টামন্ডলীতে- স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল আউয়াল মেম্বার (কমিটি গঠন নিয়ে বা তার নাম দেয়া হচ্ছে জানতেন না), সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম জীবন (কমিটিতে নাম দেয়া হচ্ছে বা কমিটি গঠন হচ্ছে জানতেন না), বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী আলী আহম্মদ (কমিটি গঠন বা তার নাম দেয়া হচ্ছে জানতেন না), হাজী মোতাহার হোসেন (কমিটি গঠন বা তার নাম দেয়া হচ্ছে জানতেন না),
হাজী মাইনউদ্দিন (কমিটি গঠন বা তার নাম দেয়া হচ্ছে জানতেন না), মোঃ সোবহান বেপারী, হাজী আসলাম বাবুল (কমিটি গঠন বা তার নাম দেয়া হচ্ছে জানতেন না). হাজী আমির হোসেন সরকার (২০১৩ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১০০ টাকা করে মাসিক চাঁদা বকেয়া রয়েছে এবং আব্দুল আজিজ (তার বেতন বাবদ চাঁদা খাতায় কোন নাম নেই)
এদিকে স্থানীয় মুসল্লীরা অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আমরা তিলে তিলে টাকা দিয়ে এই মসজিদ গড়েছি। এখন নতুন স্বঘোষিত কমিটি মসজিদ দখলের চেষ্টা করেছে। এছাড়া আপনারই দেখুন কাদের নিয়ে কমিটি গঠন করেছে। এদের মধ্যে এক যুগেরও বেশী সময় বকেয়া বেতনদারী কমিটিতে জায়াগা পেয়েছে। আর ১২০ জন চাদা প্রদানকারীদে মধ্যে যারা হাজার টাকার ওপরে চাঁদা দিয়ে মসজিদ বাঁচিয়ে রেখছে তাদের কমিটিতে অবজ্ঞাসহ অনেককে পদ রঞ্চিত করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে মাসিক স্বঘোষিত কমিটি মাসিক বকেয়ার ৭-৮ বছর যাবত বকেয়া চাঁদা ও সেই তালিকার ছবি স্থানীয় প্রকৌশলী রফিক মিয়া তার ফেসবুক পোস্ট করে আভিনব প্রতিবাদ জানিয়ে ইংরেজীতে লিখেছেন যার অর্থ- “দেখুন এই মানুষগুলোকে। কি তাদের অবদান এই মসজিদে। দীর্ঘদিন ধরে তারা ব্যর্থ পর্যবসিত”।
ইতিমধ্যে সেই তালিকা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ ঘটনার নাটের গুরু আবুল কাশেম। তিনি এর আগে মসজিদে ২০০৩ সালে সাইদুল ইসলাম নামে এক মুসল্লীকে মসজিদ কমিটি নিয়ে মারধর করিয়ে ছিলেন। এ নিয়ে তখন প্রতিবাদি সাইদুল কাশেমকে দৌড়ানি দিলে কাশেম বাসা থেকে পিস্তল নিয়ে বের হয়ে আসে।
এ বিষয়ে মসজিদ কমিটির সহ- সভাপতি স্থানীয় সাবেক ইউপি মেম্মার আলী আকবর জানান, কাদের নিয়ে কমিটি করলো লজ্জায় আছি। বিশেষ করে যারা মাসিক বেতন নিয়মিত দিচ্ছে তাদের অবজ্ঞা করা হয়েছে। এমনকি কমিটি ঘোষিত হবে এ নিয়ে কোন আলোচনা অনেকেক জানানো হয়নি। সবাই জানতে চায় কিভাবে হলো এমন একটি কমিটি? আমি কোনো জবাব দিতে পারি না।
এদিকে খবর নিয়ে জানা যায়, পুরো ঘটনার নাটের গুরু সমবায় সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাশেম। এই সেই কাশেম যে পিস্তল উঁচিয়ে সাংবাদিকদের হুমকি ও পেটানোর অভিযোগে আটক হয়েছিল। ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারী সাংবাদিকদের পেটানো ও অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ বহুল আলোচিত বিতর্কিত দূর্নীতিবাজ কাশেম ওরফে সমবায় কাশেমকে আটক করে।
পরে সেই সময় কাশেমের স্ত্রী মাসুদা বেগম ও দুই মেয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে গিয়ে সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করায় তাকে শেষ পর্যন্ত মাফ করে দেওয়া হয়। ক্ষমার সমঝোতার পর রাতে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আবদুল মতিন ওই সময় জানিয়েছিলেন ঘটনার দিন সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল এলাকায় বাংলাদেশ সমবায় শিল্প সংস্থার আওতাধীন
একটি পাটের গুদামে অগ্নিকান্ডের ছবি ধারণ ও সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে কাশেম পিস্তল উচিয়ে সাংবাদিকদের হুমকি দেয় এবং ওই সংস্থার পক্ষের লোকজন হামলা চালিয়ে পাঁচ সাংবাদিককে মারধর করেন। এ ঘটনায় সাংবাদিকরা লিখিত অভিযোগ দিলে কাশেমকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়। পরে রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিষয়টি আপোস-মীমাংসার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে এই কাশেম সকালে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগের নির্বাচন করলেও বিকালে চলে যায় নরসিংদীতে বিএনপির নির্বাচন করতে। কাশেম এক সময় বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিনের আস্থাভাজন ছিলেন। পরে তিনি সরকার দলীয় এমপি সারাহ বেগম কবরীর গ্রুপে চলে যান।


