# আমার ছেলের পরীক্ষা দেয়া হলো না : নিহত ধ্রুব’র মা
# দশজনকে আসামি করে ধ্রব’র বাবার মামলা দায়ের
যতই দিন যাচ্ছে ততোই দিন কিশোর অপরাধ বেড়েই চলছে। ছোট খাটো ঘটনা কেন্দ্র করে হত্যার ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে। কিশোর অপরাধে প্রশাসন অভিভাবকদের সচেতন থাকার আহান জানালেও কোনভাবেই কিশোর অপরাধ দমানো যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় তুচ্ছ ঘটনায় বীভৎস কায়দায় খুন করা হচ্ছে। লাশ গুম করতে খণ্ডবিখণ্ড করা হচ্ছে।
এর থেকে পরিত্রাণের জন্য মানুষ দাবী জানলেও পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না। গত মঙ্গলবার (১৭ মে) রাতে ফতুল্লার ইসদাইরে রাবেয়া হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ধ্রুব (১৫) নামে এক ছাত্রকে কিশোরগ্যাং গ্রুপ ছুরি দিয়ে এলোপাথারিভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়া দিন রয়েছে।
নিহত ধ্রুব’র মা সুব্রা রানী দাস কান্নারত অবস্থায় বলেন, আমার ছেলেটা বলত সে বিদেশ যাইবো। বিদেশে গিয়ে ৫ বছর ঘুরে টাকা কামাইবো। আমি তাকে বলতাম বিদেশ গিয়ে বাবা কি করবা। এই পশুর দল আমার ছেলেটাকে এই ভাবে মেরে ফেলবো আমি জানতাম না। এসময় তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পরেন। চোখের পানি ঝরা অবস্থায় আরও বলেন, হায়েনাদের কারনে আমার অসহায় ছেলেটার এসএসসি পরীক্ষাটাও দিতে পারলো না।
লেখা পড়ায় কোন দিনও ফেল করে নাই। পরীক্ষার আগেই ছেলেটাকে মেরে ফেললো। আমি এই হত্যাকারীদের ফাসি চাই। তাদের মত যারা হত্যা করে বেরায় তারা যেন আইনের মাধ্যমে ফাসি হয়। হত্যা কারী ফামি হলে আমি মনে করবো আইনি ভাবে বিচার পাইছি।
এদিকে স্থানীয়রা জানান, ইঠতি বয়সের ছেলে মেয়ারা এখন কিশোরগ্যাং হিসেবে আতঙ্ক হয়ে উঠছে। তারা এলাকার মুরুব্বিদের কোন ভাবে মানে না। গত মঙ্গলবারে ধ্র্ ুহত্যরা ঘটনায় এক মেয়েকে দুজন পছন্দ করত বলে গুঞ্জন উঠে।
প্রেমিকা নিয়ে তাদের মাঝে ঝগরা হয় বলে লোকজন বলাবলি করছে। তবে স্থানীয়দের দাবী আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সঠিত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
হত্যার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মিঠু চন্দ্র দাস বলেন, রিপন এবং রুদ্র এসে ধ্রুবকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে ইসদাইর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে নেয়া হলে সুইচ গিয়ার ছুড়ি দিয়ে ধ্রুবকে ইয়াছিন আঘাত করে। এই হত্যার শেল্টার দাতা জয়ের দোকান থেকে রাসেল ছুড়ি আনে। পিয়াস পাইপ দিয়ে ধ্রুবকে আঘাত করে। এছাড়া ফয়সাল, হিমেলসহ আরও কয়েকজন তাকে এরোপাথাড়িভাবে আঘাত করে। তার পাশে একাধিক ব্যক্তি জানান, ধ্রুব হত্যকারীদের ফাঁসির দাবি জানান। এই সকল অপরাধীরা যেন কোনভাবেই পার পেয়ে না যান। তাদের যেন কঠিন শাস্তি দেয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ধ্রুবসহ কয়েকজন একই স্কুলে একই শ্রেণিতে পড়ার সুবাদে তারা একসঙ্গেই চলাফেরা করত। সেইসঙ্গে তারা স্কুলের সামনে চায়ের দোকানে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিত। মনে হয় মেয়ে ঘটিত কোনো কারণে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। আর সেই দ্বন্দ্বের সূত্র ধরেই এই খুনের ঘটনা ঘটে।
ইসমাঈল নামে একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘ভুক্তভোগী ও আটক ব্যক্তি একসঙ্গেই চলাফেরা করত। স্কুল শেষে তারা মেয়েদের পিছু নিত এবং মেয়েদের উত্ত্যক্ত করত। এসব নিয়ে নিজেরা বিরোধে জড়িয়ে মারামারি করেছে। তারা স্থানীয়ভাবে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলেই চিনত সবাই।’
ইয়াসিন নামে ধ্রুব একজন সহপাঠী বলছে, রাতে তাদের বন্ধু পিয়াস তাকেসহ কয়েকজন বন্ধুকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে ধ্রুবকে ডেকে নিয়ে স্কুলের কাছে অন্ধকারে নিয়ে যায়। সেখানেই পিয়াস ধ্রুবকে ছুরিকাঘাত এবং অন্যরা মারধর করে।’
ফতুল্লার ইসদাইরে ছুরিকাঘাতে নিহত ধ্রুব চন্দ্র দাস (১৬) হত্যার ঘটনায় নিহতের বাবা মাধব চন্দ্র দাস বাদী হয়ে দশ জনের নাম উল্লেখ্য করে মামলা দায়ের করেছে। মামলায় আসামী করা হয়েছে, ফতুল্লা থানার ইসদাইর বাজার এলাকার মোঃ মিঠুর প্ত্রু ইয়াসিন(১৬),ইসদাইর উকিলের বাড়ীর লিটন দাসের পুত্র পিয়াশ দাস(১৬),শ্রী বলয় চন্দ্র রায়ের পুত্র শ্রী রিপন(১৭),উজ্জল চন্দ্র দাসের পুত্র রুদ্র চন্দ্র দাস(১৬),বিমল চন্দ্র শালের পুত্র অন্তু চন্দ্র শীল (১৬),শ্যামল চন্দ্র দাসের পুত্র জয় চন্দ্র দাস(১৭),প্রান্তোষের পুত্র প্রভাত(১৬), একই এলাকার তুহিন (২১),ফয়সাল (২১)ও হিমেল (১৯)। মামলায় উল্লেখ্য করা হয় বাদীর একমাত্র ছেলে ধ্রুব চন্দ্র দাস (১৬) ফতুল্লা থানার ইসদাইরস্থ রাবেয়া স্কুলে ১০ম শ্রেণীর ছাত্র। সোমবার(১৭ মে) সন্ধ্যার সময় বাদীর ছেলে নিজ বাসায় বসিয়া লেখাপাড়া করিতেছিল। রাত ৮ টার দিকে ছেলের সহাপাঠি শ্রী রিপন ও রুদ্র চন্দ্র দাস বাসায় আসিয়া তাদের অপর এক সহপাঠির জন্মদিনের গিফট কেনার কথা বলে বাসা থেকে ডেকে বের করে। রাত সাড়ে আটটার দিকে রাবেয়া স্কুলের সামনে রাস্তায় পৌছাইলে নিহতের সহাপাঠি শ্রী রিপন ও রুদ্র চন্দ্র দাস সহ অভিযুক্ত আসামী সহ অজ্ঞাতনামা ২/৩ জন হাতে ছোরা, চাকু, সুইচ গিয়ার চাকু, লোহার পাইপ ইত্যাদি দেশীয় অম্ল-সঙ্গে সজ্জিত হইয়া পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে নিহত ধ্রুব কে এলোপাথারী মারপিট করিতে থাকে। এক পর্যায়ে হাতে থাকা লোহার পাইপ দিয়ে ধ্রুবকে এলোপাথারী পেটাতে থাকে। এমন সময় অভিযুক্ত ইয়াসীন তার হাতে থাকা ছুরি দিয়ে ধ্রুব কে ছুরিকাঘাত করে। ফলে রাস্তায় পরে যায় ধ্রুব।সংবাদ পেয়ে বাদীর ছোট ভাই মিঠুন চন্দ্র দাস ও তুষার তাকে রক্তাক্তবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল (ভিক্টোরিয়া), নারায়ণগঞ্জ নিয়া গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ধ্রুব কে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। অবস্থা আশংকা জনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে। বাদী সহ স্বজনেরা ধ্রুব কে এ্যাম্বুলেন্স যোগে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়া গেলে রাত সোয়া দশটার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক আমার ছেলেকে মৃত ঘোষনা করে।
অন্যদিকে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে চার জনকে গ্রেপ্তার করেছে ফতুল্লা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- ফতুল্লা থানার অন্তন চন্দ্র শীল (১৭), শ্রী পচন (১৬), জয় চন্দ্র দাস (১৭) ও মোঃ ইয়াসিন (১৫), পিয়াসম রাসেল।
নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি শেখ রিজাউল হক দিপু বলেন, এই ঘটনায় ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহতের লাশ পোষ্ট মোর্ডেম শেষে তার পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেই সাথে এই ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে।
উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় সহপাঠীর ছুরিকাঘাতে ধ্রুব নামে এক স্কুলছাত্র ফতুল্লার পূর্ব ইসদাইর এলাকার মাধব চন্দ্রের ছেলে তারই সহপাঠি কিশোরগ্যাং গ্রুপের হাতে ইসদাইর রাবেয়া হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে মঙ্গলবার ছুরিকাঘাতে নিহত হন।


