বিদ্যুতের দাম বাড়াতে গত বুধবার ১৮ মে তারিখে বিইআরসি একটি কমিটি প্রস্তাব করেছে। পিডিবির এর আগের ৬৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ দেয়া প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয়। এবারের ৫৮ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব গণশুনানীতে প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে। এফবিসিসি আই,এমসিসিআই,ডিসিসিআই,বিজিএমইএ এবং ভোক্তা অধিকার কমিটি ক্যাব এই প্রস্তাবের সমালোচনা করে।
তাছাড়া ক্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এম শামসুল আলম বলেন, “ভূত রকি প্রদান না করে এবং খরচ কমানোর যথাযথ পদক্ষেপ না নিয়ে অন্যায়, অযৌক্তিক ও লুন্ঠনমূলক ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে ” (প্রআ)। গত ১২ বছরে দফায় দফায় নানা অজুহাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।পাইকারি পর্যায়ে ১১৮ শতাংশ এবং গ্রাহক ভোক্তা পর্যায়ে পিডিবি ৯০ শতাংশ দাম বাড়িয়ে নিয়েছে বিইআরসির সুপারিশ ও অনুমোদনের মাধ্যমে
শেষ পর্যন্ত বাড়তি দামের বোঝা চেপেছে প্রান্তিক পর্যায়ে সাধারন মানুষের ঘাড়ে। বিইআরসির মত অনেক প্রতিষ্ঠান আছে সরকারি কাজকর্ম চালিয়ে নিতে। সরকার দেশের জনগনের সুখ সুবিধা দেখভাল করেন এই সব প্রতিষ্ঠানের দ্বারা। সাধারন মানুষের জীবন মান উন্নয়ন কিংবা দরকারী সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি বা নিশ্চিত করতেই এই সকল প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি। আজ পর্যন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই বিইআরসি জ্বালানী খাতে সাধারন ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনা করেছে ।
যখনই বিদ্যুৎ, তিতাস গ্যাস দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে, প্রতিবারই বিইআরসি তা বাড়িয়ে দিয়েছে। দাম বাড়ানো নিয়ে এক ধরনের লোক দেখানো প্রহসন ও অভিনয় হতেও দেখা যায়। যেমন প্রস্তাব করা হয় অধিক হারে উচ্চমূল্য। কর্তৃপক্ষ তথাকথিত গণশুনানীর আয়োজন করে দাম বাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষনা করে প্রস্তাবিত দামের চেয়ে কিছু কমিয়ে।
ভাবখানা এই যে, যা দাবী করা হয়েছে তার চেয়ে তো কম করা হলো। সেই কমও যে ভোক্তার জন্য শাকের আটি বোঝার উপর তা এই কমিটির হর্তা-কর্তা বিধাতাগণ বোঝেন না, মানেন না ,জানেন না।
তখন তাদেরকে অন্য গ্রহের বাসিন্দা মনে না করে উপায় থাকে না। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি তাদের যেন অজানা। যুক্তি দেয়া হয় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির। তাই এইটুকু মূল্যের উর্ধ্বগতি তারা সয়ে নিতে পারবেন। ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে বলে তা দাম বাড়িয়ে সংকুচিত করার মানসিকতা নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া আর কী ! তস্য তস্য বক্তারা একবারও ভাবে না যে , বিদ্যুৎ বা গ্যাসের দাম বাড়া মানেই জীবনের দৈনন্দিন সব উপকরনের দাম বাড়া। এই বিষয়ে কয়েকদিন সংবাদ মাধ্যম এ নিয়ে বেশ সোচ্চার থাকে।
এক সময় অন্য খবরের আড়ালে ঢাকা পড়ে। সাধারন মানুষের কষ্টের জোয়াল আরও ভারী হয়ে কাঁধে চেপে বসে। দেশে এখন বিদ্যুতের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি। তারপরও লোড শেডিং হয়। উচ্চমূল্যের কুইক রেন্টাল এখন আর দরকারী নয়। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারনে তাদের উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে। অধিক মূল্য দিয়ে তাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনছে সরকার।
দাম বাড়ার এটি অন্যতম প্রধান কারন। প্রতিবেশি দেশ থেকে আবার বিদ্যুৎ আমদানীও করা হচ্ছে । দেশে উৎপাদিত মূল্যের চেয়ে আমদানীকৃত বিদ্যুৎতের দামও কম। তার উপরে আছে সিস্টেম লস নামের অদৃশ্য ভুত ,যে কেবল বিদ্যুতের উৎপাদনে ভাগ বসায় ,তাতে দাম আরও বাড়ে। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কি কাজে লাগছে অথবা সাধারন মানুষের কি উপকারে আসছে ,জানার উপায় নাই।
অবস্থাদৃষ্টে পিডিবি,তিতাস বা বিইআরসি দিনে দিনে সরকারকে সেবাদানকারী থেকে বনিক প্রতিষ্ঠানে পরিনত করছে। তাই অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, অচিরেই বিদ্যুতের দাম বাড়তে যাচ্ছে। গণশুনানীর তীব্র বিরোধিতা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ঠেকাতে পারবেনা। ধরে নেয়া যায় তা ৫৮ শতাংশের নীচেই থাকবে ,কিন্তু বাড়বেই। দ্রব্যমূল্য নিয়ে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন চেয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
বাজার মনিটরিং এর জন্যও নিশ্চয় একটি প্রতিষ্ঠান আছে। নিয়মিত বাজার মনিটর করাও তাদের দায়িত্ব। তারপরও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদেরকে সক্রিয় উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দিতে হয়। সাধারন মানুষের প্রত্যাশা প্রকৃত অবস্থা যেন প্রতিবেদনে উঠে আসে। তা না হয়ে যদি আমলাদের দক্ষ লেখনিতে ,ভাষার কুটকচালে বাস্তব অবস্থা আড়ালে থাকে ,তাহলে হয়ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্টদের কর্মক্ষেত্রে ধাপে ধাপে উন্নতি ত্বরান্বিত হবে।
কিন্তু অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিজের নিয়মে চলতে থাকবে। তেল, চাল, ডাল, গম সব কিছুর দাম বাড়ে। কিন্তু কৃষকের উৎপাদিত ফসলের দাম কমে। বছরের পর বছর এই ব্যবস্থা চলছে ,নিয়মে পরিনত হয়েছে । তারপরও নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত, কৃষক, শ্রমিক আশায় আশায় থাকে সুদিনের প্রত্যাশায় । সেই সুদিন আবার আসবে কি ? কবে ?


