Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বেকায়দায় নিম্নবিত্ত

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২২, ০৮:১৩ পিএম

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বেকায়দায় নিম্নবিত্ত
Swapno

# ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য ও মেধায় প্রভাব পড়বে
# উপার্জনকারীর সাথে পরিবারের সদস্যদের দুরত্ব বাড়ছে
# দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির হলে বেশি সমস্যায় পড়ে মধ্যবিত্ত মানুষ : এড. মাসুম
# বেশি ভর্তুকি দিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে খাদ্যদ্রব্য পৌছাতে হবে : খন্দকার শাহআলম

 

করোনা হানা দেওয়ার পর থেকেই ধনী জেলার খেতাব পাওয়া নারায়ণগঞ্জের বেশিরভাগ মানুষেরই কমেছে উপার্জন। শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম এই জেলার মানুষের আয়ের পরিমান কমে যাওয়ার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। চাল-ডাল, তেল, চিনি, হলুদ, মরিচ, আটা, ময়দা, সুজি, মাছ, মাংস, ডিম প্রতিটি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশ চুম্বী।

 

একই সাথে শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানসহ জীবনযাত্রার অন্যান্য সেবার ব্যয়ও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। এ অবস্থায় সংসারের চাকা চালাতে হিমিশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করাও অনেক পরিবারের পক্ষেই দুরূহ হয়ে উঠেছে। মাছ মাংসের কেনার কথাই যেন ভাবতেই পারছে না এসব পরিবারের কর্তাব্যক্তিরা।  এই সময় পেয়াজের দাম বৃদ্ধি পেলেও সম্প্রতি কিছুটা স্বস্তি এই এসেছে পেয়াজে। তবে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে সবজির বাজারে (কাচাঁবাজারে)।

 

স্থানীয় বিভিন্ন পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, শুধুমাত্র চাল-ডাল, তেল, চিনি, হলুদ, মরিচ, আটা, ময়দা, সুজি, মাছ, মাংস, ডিম ও মুরগীসহ মানুষের জীবনযাপনের জন্য যেসব উপাদান আছে তার সিংহভাগ খাতেই ব্যয় বেড়েছে। সেক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের মানুষসহ সাধারণ পেশার চাকরিজীবীদের আয় বাড়েনি, কোন কোন ক্ষেত্রে কমেছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক করোনার ছোবলের কারণে চাকুরী হারা হয়েছেন অনেকে।

 

আয় কমার তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের মধ্যে দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক ও রিকশাচালকদের সংখ্যাই বেশি। একদিকে আয় কমে যাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব দরিদ্র ও অতিদরিদ্র পরিবারগুলোকে অর্ধাহারে ও অনাহারে জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

 

এতে করে সংসারের উপার্জনকারীর সাথে প্রতিনিয়ত স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের দুরত্ব বাড়ছে। অনেক পরিবার খাবারের নিত্য তালিকায় অনেক কাটছাট এনেও সংসারের খরচ বহন করতে গিয়ে ভূগছেন। অনেকে ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট শিক্ষক বাদ দিচ্ছেন, ব্যয় বহন সম্ভব না হওয়ায় ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে

 

তাদের ছেলে মেয়েদের ফিরিয়ে এনে কম খরচের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে একদিকে যেমন অপুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সমাজে মেদাশক্তি হ্রাসের মতো একটি প্রজন্ম তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথাও ভাবনার বাইরে রাখা যাচ্ছে না।

 

কাপড় ব্যবসায়ী হৃদয় খান জানান, তার একটি থান কাপড়ের দোকান আছে। করোনার আগে সেখানে ৪ জন সেলসম্যান ছিল। করোনার সময় বাধ্য হয়েই তাদেরকে না করে দিয়েছেন। গত একবছর যাবত সেখানে একজন সেলসম্যান নিয়ে তিনি নিজে খাটার পরও ব্যবসা বিক্রি মন্দার কারণে আগের অর্ধেক টাকাও উপার্জন করতে পারছেন না।

 

তিনি আরও জানান, তার মেয়েকে ঢাকার একটি প্রাইভেট কলেজে লেখাপড়া করার জন্য ভর্তি করালেও বর্তমানে বাসা ভাড়া দেওয়ার পর মেয়ের যাতায়াত ও কলেজের ব্যয় বহনে সমস্যা হওয়ায় তাকে সেখান থেকে নিয়ে এসে নারায়ণগঞ্জ সরকারী তোলারাম কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। তিনি জানান, আগে যেখানে চিকন চাল ছাড়া ভাত খেতে পেতাম না এখন সেখানে মোটা চাল কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

 

শুধু চাল না, ডাল, তেল, চিনি, আটা, ময়দা, আদা রসুন থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় সকল পণ্যেরই দাম বেশি। এতদিন কাঁচাবাজারের দাম বেশি থাকলেও এখন কিছুটা কমে পাওয়া যাচ্ছে, তাই মানুষ সবজির উপর অনেকটাই নির্ভর হয়ে পড়ছে।

 

গার্মেন্টস কর্মী হালিমা আক্তার জানান, তিনি বিসিকের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন করোনার সময় লোক ছাঁটাই করার সময় তার চাকরি চলে যায়, স্বামী ইজিবাইক চালায়। মাস তিনেক হলো তিনি আর একটি গার্মেন্টস-এ আগের চেয়ে অনেক কম বেতনে জয়েন্ট করেন। তার স্বামী আগে যেখানে দৈনিক ৭০০-৮০০টাকা উপার্জন করতে পারতেন, সেখানে এখন ৪০০ থেকে ৫০০টাকা উপার্জন করাই মুশকিল হয়ে গেছে।

 

চাল-ডাল, তেল চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় শ্বশুর শাশুড়ি ও দুই মেয়েসহ তাদের পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন আমাদের যেখানে ডাল-ভাত খাইতেই হিমশিম হচ্ছে সেখানে মাছের বাজারে কিংবা গোস্তের দোকানে যাওয়ার মতো সাহসও দেখাতে পারি না।

 

ভ্যান-গাড়িতে করে যারা মাছ তরিতরকারি বিক্রি করে তাদের কাছ থেকে চেষ্টা করি কম দামে সদাই কিনতে। কয়েক মাস যাবত খালি শাক, আলুভর্তা আর ডাল দিয়া ভাত খাই। কোন কোন সময় ডিম ভেজে তিন-চারটি ভাগ করে খাই। কোন কারণে স্বামী গাড়ি নিয়ে বের হতে না পারলে কোন বেলা না খেয়েও থাকতে হয়। সরকার আমাদের দিকে চাইয়া যদি এসব দ্রব্যের দাম কমানোর ব্যবস্থা করতে পারেন তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ অনেক উপকৃত হবে।

 

এই বিষয়ে কথা বললে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির হলে প্রথমেই নিম্ন আয়ের মানুষের উপর এর প্রভাব পড়ে। এর চেয়েও বেশি সমস্যায় পড়ে মধ্যবিত্ত মানুষ। তারা কাউকে মুখ ফোটে বলতেও পারে না আবার সমস্যা সমাধানেও হিমশিম খেতে হয়। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এতবড় একটা তেল কেলেঙ্কারী হলো অথচ সরকার একটি মিল মালিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারল না।

 

এ ধরণের ব্যর্থতার কারণেই আমাদের ভোগান্তি। এতে তারা যে সাহসটা পেল তারপর তাদের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয় না। এই ভোগান্তি থেকে বাঁচতে চাইলে এ ধরণের ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন।

 

শিক্ষা ব্যবস্থার উপর যদি এর চাপ পড়ে তাহলে ভবিষ্যতে মেধাহীনতার একটি ভয় থাকবেই। সরকারের নীতিমালা যদি শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থে হয় সরকার যদি গরীব বান্ধব না হয় তাহলে দেশ চলতে পারে না। তিনি আরও বলেন, দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় আমাদের কোন রাজনীনৈতিক নেতা বা সমাজের বিত্তবানরা মানুষের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে না। তাদের দেখা যাচ্ছে না।

 

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি খন্দকার শাহআলম বলেন, দ্রব্যের মূল্যের আন্তার্জাতিক বাজারেই এখন উর্দ্বগতি আছে। তবে সরকারের উচিৎ সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখে বেশি বেশি ভর্তুকির মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তিনি আরও বলেন, দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই তুলনায় মানুষের আয় খুবই কম।

 

কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আছে যারা বাজারে প্রচুর মাল থাকা অবস্থায়ও যোগসাজশ করে বাজারে ছাড়ছে না। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মূল্য বৃদ্ধি করার জন্য। এই সিন্ডিকেট ভাঙ্গার জন্য সরকারের পক্ষ হতে খুব জরুরী ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন