দৈনিক পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায়, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোর তরুণদের হানাহানি এখন নিত্যকার উদ্বেগের বিষয়। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ বাহিনীর সাম্প্রতিক তৎপরতাও সেই সাক্ষ্য দেয়। সামান্য বচসা, বাদানুবাদ হত্যা পর্যন্ত গড়াচ্ছে কিশোর সমাজে। পাড়া মহল্লাবাসী, সহপাঠি, প্রতিবেশি সবাই মুহুর্তের মধ্যে পাল্টে যায় শত্রুতে। নিষ্ঠুর ঘাতকরূপে নির্মম অত্যাচার করছে বন্ধু বন্ধুকে, মৃত্যু নিশ্চিত করে অথবা মৃত ভেবে ফেলে যায় যেখানে সেখানে।
এমনকি ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে কখনও নিজের বাড়ির সীমানায়ও। ফোন করে কিংবা সশরীরে এসে ডেকে নিয়ে গিয়ে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। বন্ধুরুপে ঘাতক এখন চারপাশে। কে বন্ধু কে শত্রু এখন চিনে নেয়া কঠিন।মানুষ আর এখন মানুষের ভরসাস্থল নয়। পরস্পর অবিশ্বাস অধুনা ভেঙ্গে ফেলছে আবহমান সমাজের ভীত । বন্ধু যখন শত্রু হয় , হত্যাকারী হয় ,তেমন সমাজে সুস্থভাবে বসবাস করা কঠিন ।
সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় সাড়ম্বরে পুলিশ বাহিনীর জনসচেতনা মূলক কার্যক্রম, এলাকায় এলাকায় ওপেন ডে কর্মসূচী আর পত্রিকার পাতায় হত্যার সংবাদে কিশোর গ্যাং নামক এক অভাবিত,অভূতপূর্ব বাহিনীর তৎপরতা ফলাও প্রচার পেয়েছে । বর্তমান মে মাসের বিগত দু আড়াই সপ্তাহের মধ্যে কমপক্ষে ৭ জন নিহত হয়েছে । জানা যাচ্ছে প্রত্যেকটি মৃত্যুর ঘটনায় কিশোর গ্যাং জড়িত । নিকট অতীতের সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে শুধু অবাক নয়,নির্বাকও হতে হয়।
এককালে নয়, এই সেদিনও পাড়া মহল্লার বয়োজ্যেষ্ঠরা সব সময় ছিল এলাকার কিশোর যুবকের অবশ্য মাননীয় অভিভাবক। কোনও পরিচয় সূত্র বা স্বজন-পরিজন হওয়ার দরকার ছিল না । যে কারো সন্তান বেলাইনে অর্থাৎ যে কোন ও রকম অসদাচরণে এলাকার মুরুব্বিরা পরিচয়-অপরিচয় নির্বিশেষে সবাইকে শাসনের অধিকার রাখতেন। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ন বিপরীত। চেনা পরিবারের সন্তানকেও পাড়ার মুরুব্বি বা বয়োজ্যেষ্ঠ প্রতিবেশি শাসন করতে সাহস করেন না।
সন্তানের বাবা-মায়েরাও এলাকার মুরুব্বির শাসন মেনে নিতে পারেন না। আবার নিজেরাও নিজের সন্তানকে সঠিক পথে চালাতে ব্যর্থ। এ তো গেল সমস্যার এক দিক । আরও বহুবিধ কারন রয়েছে এই কিশোর নামক দধিচির হাড়ের বেড়ে ওঠার পিছনে । প্রহলাদ তারা একদিনে হয়নি। দিনে দিনে তারা সমাজে হালাকু, চঙ্গিস হয়ে একদিন সামাজিক ন্যায় , শৃঙ্খলা তছনছ করে ফেলতে পারে। সমাজ চক্ষু যখন থেকে উদাসীন হয়েছে, দেখেও না দেখার ভান করেছে , অপশক্তির ভয়ে , ন্যায় ,নীতি ,সততা ,আত্মবিশ্বাস বির্সজন দিয়েছে; সেই সময় থেকেই কিশোর তরুণ-যুবকদের চারিত্রিক পতনের মহাকালের শুরু।
একটি বিশেষ শ্রেণি একসময় প্রভাব কিংবা ক্ষমতার দাপট দেখানোর জন্য কিশোর-যুবকদের দাবার ঘুটিরূপে ব্যবহার শুরু করে । কিশোর বয়স মানেই আবেগ ,উত্তেজনার মাত্রা ছাড়া উদ্দাম জীবন। সেই উত্তেজনার স্বাদ একবার পেলে বারবার পাওয়ার সীমাহীন লোভের কাছে পদানত হয় কিশোর বয়স । তাদের তখন সুতোর টানে খেলানো হয়ে উঠে বড় ভাই শ্রেনির প্রিয় শখ । শখের বলি হয় কিশোর তারুণ্য। তারা থাকে পর্দার আড়ালে ।
শুধু জনসচেতনতা বাড়িয়ে ,পিতা-মাতা বা অভিভাবকের অধিকতর মনোযোগ কিংবা শাস্তির ভয় কিশোর অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে, এমন আশা দুরাশা। সমাজবিজ্ঞানীদের এই সমস্যা সমাধানের উপায় বের করা আশু জরুরী ।
শিক্ষা ব্যবস্থায় দরকার পরিবর্তন, উন্নয়ন। শুধু কথায় কাজ হবে না। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরবিচ্ছিন্ন তদারকিও পরিস্থিতির উন্নয়নের সহায়ক হতে পারে। ফেরাতে পারে সর্বজনীন অভিভাবক দায়িত্ব, আস্থাবৃদ্ধি করতে পারে সামাজিক দায়িত্ব বোধের। সহসা পরিস্থিতির উন্নতি, বদল না হলে ভবিষ্যত উজ্জল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিশোরদের সুপথে চালিত করতে এই মুহূর্তে দরকার সমাজের সর্বস্তরের সমন্বিত প্রয়াস।এসএম/জেসি


