করোনার পরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দ্বিগুণ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২২, ০৪:০০ পিএম
#সড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ চালকদের প্রতিযোগিতা
সারা বিশ্বের সাথে বাংলাদেশে করোনার কারণে সরকারি অফিস আদালতসহ সকল ব্যাংক থেকে শুরু করে গণপরিবহন বন্ধ ছিল। করোনার থাবায় মানুষ পর্যন্ত ঘরে বন্ধি ছিল। এমনকি সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত ২ বছরের কয়েক দফায় গণ পরিবহন বন্ধ থাকার পরে আবার চলাচলে সচল হয়েছে।
গত বছর শেষের দিকে এসে বন্ধ থাকা আগস্ট থেকে লকডাউন শিথিল করে সরকারি-বেসরকারি সব অফিস, ব্যাংক থেকে শুরু করে গণপরিবহন, শপিংমল, দোকানপাট খুলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তখন গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সড়ক দুর্ঘটনাও তেমন একটা হয় নাই। কিন্তু যখন সকল পরিবহন পূর্বের রূপে ফিরে যায় তার পর থেকে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়তে থাকে।
জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে ১৭ মাসে ২৪০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১৬২ জন। বিগত বছরের তুলনায় এ বছর সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি। অধিকাংশ দুর্ঘটনার কারণ হলো সড়ক আইন না মানা, চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতি এবং চালকের লাইসেন্স পাওয়ার দুর্বল পদ্ধতি। এছাড়া সড়কে একে অপরে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। দূর্ঘটনা রোধে গাড়ি চালকদের সচেতন করা হলেও তারা তাতে কোন কর্ণপাত করছেন না। তাদেরে বেপোরায়া গতি রয়েই গেছে।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানা পুলিশ জানায়, গত ২৪ মে পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ অংশের ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও এশিয়ান হাইওয়েতে ১০৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩৫ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ৩৭টি মামলা হয়েছে। ২০২১ সালে ১৩১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১২৭ নিহত ও ৬৫ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ৮১টি মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলায় গ্রেফতারের সংখ্যা হাতেগোনা।
হাইওয়ে থানা পুলিশের তথ্যমতে, বিগত বছরের তুলনায় এ বছর দ্বিগুণের বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে মৃত্যুর হার বিগত বছরের তুলনায় কমেছে, আহতের সংখ্যা বেশি। ৫ মে বিকালে ঢাকা-আড়াইহাজার সড়কের ব্রাহ্মন্দি ইউনিয়ন এলাকায় প্রাইভেটকারের ধাক্কায় লাদেন (২০) ও হৃদয় (২১) নামে দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। বেপরোয়া গতির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে, ১৭ ফেব্রুয়ারি সোনারগাঁয়ের এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের পাকুন্ডা এলাকায় ট্রাকচাপায় আফাজউদ্দিন নামে এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। নিহত পুলিশ সদস্য তালতলা তদন্ত কেন্দ্রের কনস্টেবল ছিলেন। পুলিশ জানায়, পুলিশ সদস্যকে চাপা দিয়ে দ্রুতগতিতে ট্রাক নিয়ে পালিয়ে যান চালক।
সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ার কারণ হিসেবে কাঁচপুর হাইওয়ে থানা পুলিশের পরিদর্শক মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘গাড়িচালকরা ট্রাফিক আইন-কানুন সম্পর্কে তেমন অবগত নন। মহাসড়ক ফাঁকা পেলেই চালকরা দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান। একটি গাড়ির পেছনে চলা আরেকটি গাড়ির দূরত্ব কতটুকু থাকা উচিত, তা অনেক চালক জানেন না। দু-একজন জানলেও মানছেন না। ফলে হঠাৎ ব্রেক করলে দুর্ঘটনা ঘটে।
এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে আমরা প্রতি মাসে গাড়িচালক ও চালকের সহকারীদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করে থাকি। নিরাপদে গাড়ি চালানোর ব্যাপারে তাদের সচেতন করা হয়।
সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ার কারণ উল্লেখ করে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নারায়ণগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল, ‘গাড়িচালকরা সড়ক আইন যথাযথভাবে মানেন না। ধীরগতির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, থ্রি–হুইলার ও ইজিবাইক অবাধে মহাসড়কে চলাচল করছে।
স্বাভাবিকভাবে একই সড়কে দ্রুতগতির যান চলাচল করে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। অনেক সময় চালকরা সড়কে অপরাধ করেও টাকার বিনিময়ে ছাড়া পেয়ে যান। এভাবে চালকরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। হাইওয়ে পুলিশের সদিচ্ছা ছাড়া এসব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, ‘অসচেতন জনগণকে শৃঙ্খলায় আনা ও সড়কের আইন মানতে বাধ্য করাও পুলিশের দায়িত্ব। পুলিশ প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে আইন লঙ্ঘন তো দূরের কথা যতযত্র দিয়ে গাড়ি চালাতেন না চালকরা। এতে দুর্ঘটনা কমতো। অদক্ষ চালক ও চালকের সহযোগী দিয়ে গাড়ি চালানোর ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এজন্য পুলিশ প্রশাসনও দায়ী। কারণ, তারা যথাযথভাবে সড়ক আইনের প্রয়োগ করছে না।
ওমর ফারুক বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইন চালুর পর থেকে জরিমানা অধিক হওয়ায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে কম নামছে। এরপরও যেগুলো আমরা পাচ্ছি সেগুলোকে জরিমানা করছি। তিনি বলেন, ‘যেসব নেতা কিংবা সংগঠন পরিবহন শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করেন তারাই মূলত প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার-বিশ্লেষণ না করে তারা শ্রমিকদের পক্ষে অবস্থান নেন।
এতে চালক ও সহযোগীরা অপরাধ করতে দ্বিধা করেন না। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো, অপরাধে জড়ানো ও অনেক দুর্ঘটনার জন্য শ্রমিক নেতারা এবং সংগঠনগুলো দায়ী।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি ডা. আল ওয়াজেদুর রহমান বলেন, ‘সড়কের বিভিন্ন আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন হয় না। অনেক সময় অপরাধ করেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে গাড়িচালকরা পার পেয়ে যান। ফলে যথাযথভাবে আইন মানতে চান না। এতে অনেক ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ সম্ভব হয় না। অদক্ষ ও মাদকসেবী চালকদের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। মানুষের সচেতনতার অভাব রয়েছে। সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এটি দুর্ঘটনা বাড়ার আরেকটি কারণ। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি। সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।
নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মো. জাহেদ পারভেজ চৌধুরী বলেন, ‘বিগত বছরে করোনার প্রভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কম ছিল। মূলত দুটি কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। একটি হলো অদক্ষ চালক, অপরটি পথচারীদের ট্রাফিক আইন ও নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। তিনি বলেন, ‘দক্ষ চালক গড়ে তোলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনেক প্রকল্প চালু হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ট্রাফিক আইন সচেতনতার জন্য ক্লাস নেওয়া হয়। এছাড়া গাড়িচালকদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।এমই/জেসি


