# ৩৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ব্যয় এখন সোয়া ৬শত কোটি টাকা
# যে পরিমাণ ব্যয় বাড়ানো হয় তা অস্বাভাবিক : শরীফ উদ্দিন সবুজ
# উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই বাড়তি ব্যয়টা একটি বোঝা : আমির হুসাইন স্মিথ
প্রায় এক যুগ আগে (২০১০ সালে) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এর সভায় অনুমোদন পায় পদ্মা সেতু ও তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্প। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে খরস্রোতা পদ্মার ওপর ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের (মূল সেতু সোয়া ৬ কিলোমিটার) সেতুর নির্মাণকাজ শেষ। উদ্বোধন হচ্ছে চলতি মাসের ২৫ তারিখ। অথচ নদীর পরিস্থিতি অনুকূল থাকার পরও মাত্র ১ দশমিক ২ কিলোমিটার (মূল সেতু ৪০০ মিটার) দৈর্ঘ্যের তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর কাজ এখনো শেষ হয়নি।
অন্যদিকে ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বর একনেক সভায় প্রকল্পটি যখন অনুমোদন হয় তখন এর ব্যয় ধরা হয় ৩৭৭ কোটি ৬২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জটিলতার কারণে সময় ক্ষেপণ হওয়ায় একদিকে ভূমি অধিগ্রহণের খরচ বৃদ্ধি পায়, আবার ভ্যাট ও আইটি খাতের যে ব্যয় তা সমন্বয় করতে গিয়ে ২০১৫ সালের ২৯ মে মাসে বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ৫৩৯ কোটি ৬৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। যা ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন করে হয় ৫৯৯ কোটি ২৭ লাখ ৫১ হাজার টাকা। কিন্তু প্রকল্পের সর্বশেষ ব্যায় ৬২০ কোটি টাকারও উপরে।
সৌদি কোম্পানীর সাথে লেনদেনে যে সময় ক্ষেপণ হয় তার পরও এই প্রকল্পের দিকে একটু সজাগ দৃষ্টি দিলে সেতুটি করোনা মহামারীর আগেই শেষ হয়ে যেত বলে সচেতন মহলের ধারণা। এরই মধ্যে মূল সেতুর কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণসহ টোল প্লাজার কাজ শেষ করতেও ব্যায় হচ্ছে দীর্ঘ সময়। তাছাড়া সেতুটি উদ্বোধনের পর দুই পাশের রাস্তাকে যানবাহন চলাচল করার জন্য উপযোগী করার প্রক্রিয়ায় কোন উদ্যোগও এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। তবে সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুটি উদ্বোধন হতে পারে।
এরই মধ্যে এক প্রজ্ঞাপণের মাধ্যমে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর টোলের হার নির্ধারণ করেছেন। সেতু ব্যবহারকারী যানবাহন থেকে টোল আদায়ে ‘টোল নীতিমালা ২০১৪’ অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহন চলাচলের জন্য টোলের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের নির্ধারিত টোল হার অনুযায়ী ট্রেলারে ৬২৫ টাকা, হেভি ট্রাকে ৫০০ টাকা, মাঝারি ট্রাকে ২৫০ টাকা, বড় বাস ২২৫ টাকা, মিনি ট্রাক ১৯০ টাকা, কৃষিকাজে ব্যবহৃত গাড়ি ১৫০ টাকা, মিনিবাসে ১২৫ টাকা, মাইক্রোবাসে ১০০ টাকা, ফোর হুইল চালিত যানবাহনে ১০০ টাকা, ৩/৪ চাকার মোটরাইজড যানবাহন ২৫ টাকা, মোটরসাইকেলকে ১৫ টাকা, টোল দিতে হবে। এছাড়াও ভ্যান/রিক্সা/সাইকেল/ ঠেলাগাড়িতে পাঁচ টাকা টোল দিতে হবে। সেতুতে স্থানীয় ধীরগতির যানবাহন চলাচলের জন্যও আলাদা লেন রাখা হয়েছে।
এমনিতে মাওয়ার পদ্মা সেতু থেকে যাত্রাবাড়ি হয়ে মদনপুরের দূরত্ব ৫২ কিলোমিটার। কিন্তু পদ্মা সেতু থেকে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু হয়ে মদনপুরের দূরত্ব ৪৩ কিলোমিটার। এর ফলে পদ্মা সেতু থেকে মদনপুরের দুরত্ব কমে যাবে ৯ কিলোমিটার। তাছাড়া সেতুটি চালু হলে কাঁচপুর, সাইনবোর্ডসহ নারায়ণগঞ্জ শহর ও রাজধানী ঢাকার যানজট অনেকটাই কমে যাবে। এর ফলে বরিশাল ও খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের সাথে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও সিলেট বিভাগের বাণিজ্যিক যোগাযোগের বাধা অনেকটাই কমে যাবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও আমুল পরিবর্তন ঘটবে। অন্যদিকে বাইপাস সড়কের সুযোগে রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগসহ উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও ব্যাপক উন্নতি হবে।
এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আমির হুসাইন স্মিথ বলেন, সেতুটির উদ্বোধনের প্রক্রিয়া চলছে। এরই মধ্যে টোলের হার ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা সংবাদ কর্মী হিসেবে যতটুকু জেনেছি এই প্রকল্পের সাথে সম্পর্কিত সৌদি ফান্ডের সাথে লেনদেনের নিয়মতান্ত্রিক কিছু জটিলতাসহ করোনা মহামারীর ছোঁবলের কারণে এতটা সময় লেগেছে। করোনার সময় চীনের প্রকৌশলীরা দেশে চলে যাওয়ার পর সময় মতো আসতে পারেনি বলে সময় ক্ষেপণ হয়েছে। তাছাড়া আমলাতান্ত্রিক বিভিন্ন জটিলতার কারণে এই সেতুটি নির্মাণে এতটা সময় লেগেছে।
দেরিতে হওয়া এবং ব্যয় বাড়া সত্ত্বেও শীতলক্ষার উপর এমন একটি সেতু নির্মাণের জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। একই সাথে এ রকম একটি ছোট সেতু নির্মাণে যেন দীর্ঘ সময় বা কাল ক্ষেপণ না হয়, সরকারকে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার আহবান জানাই। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের নির্মাণ সময় বাড়লে ব্যয় বেড়ে যায়। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই ব্যয়টা (বাড়তি ব্যয়) একটি বোঝা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে এবং নির্মাণ সময় কমানোসহ দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা জন্য সরকারকে সজাগ দৃষ্টি রাখার আহবান জানাই। বিদেশী অর্থায়নে কিংবা আমাদের দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায়ই হোক না কেন এটা আমাদের জন্য বোঝা। তাই কালক্ষেপণের বিষয়ের উপর সরকারকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সবুজ বলেন, ব্যয় কিছুটা বাড়ার কারণ হলো মালামালের মূল্যও শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এটাকে অজুহাত করে যে পরিমাণ ব্যয় বাড়ানো হয়েছে তা অস্বাভাবিক। তাছাড়া আমাদের দেশে যেসব নির্মাণ কাজ হয়, বিশেষ করে রাস্তাঘাটসহ সেতু নির্মাণ কাজ, এসব জায়গায় ব্যাপক দূর্নীতি হয়। এগুলো দেখার জন্য আমাদের দেশে কোন লোকও নেই আবার বাধাগ্রস্ত হয়।
কারণ প্রভাবশালীরাও এসবের সাথে জড়িত থাকে। তাই এই বিষয়গুলো তেমনভাবে উদঘাটিত হয় না। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয় বহুল রাস্তা আমাদের দেশে তৈরি হয়েছে। অথচ এমন ব্যয় হওয়ার কোন কারণ নাই। ইউরোপের চেয়ে আমাদের দেশে শ্রমিকের মজুরি বেশি না। তৃতীয় সেতুর নির্মাণের এত সময় লাগার বিষয়ে তিনি বলেন, এর একটি কারণ হলো অবহেলা। নারায়ণগঞ্জ সবসময় সবদিক দিয়েই অবহেলার শিকার এবং নারায়ণগঞ্জের নেতা এমপিরা আছেন অন্যের ত্রুটি বের করার জন্য দৌড়ঝাপ করে। কিন্তু জনগণের কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের দৌড়ঝাপ নাই। এসব কারণেই এত সময় ক্ষেপণ হয়েছে।এমই/জেসি


