Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

স্বাস্থ্যসেবা বনাম ব্যবসা

Icon

করীম রেজা

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২২, ০৬:২৪ পিএম

স্বাস্থ্যসেবা বনাম ব্যবসা
Swapno

প্রাগৈতিহাসিক সমাজে মানুষের বেচেঁ থাকার জন্য সবকিছু প্রকৃতি থেকেই পাওয়া যেত। প্রকৃতিও উদারভাবে দিয়েছে। কালে কালে মানুষ প্রকৃতি-পরিবেশ বৈরি করে তুলেছে নিজের সীমাহীন লোভাচার দিয়ে।

 

বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক সকল উৎস বলতে গেলে নষ্ট করছে। তারপর থেকেই বোধ করি সেবাদানের সংস্কৃতির শুরু। এক সময় দেশ, সমাজ ও ব্যক্তি পর্যায়ে সেবা প্রদান, সেবার আওতা বৃদ্ধি ইত্যাদি রকমের কাজে এক ধরণের অলিখিত প্রতিযোগিতা ছিল। সেবাগ্রহীতারও সংকট দেখা যেত কখনও কখনও ।

 

তারপর সেবা একটি পণ্য উপাদানে রূপান্তরিত করল বর্তমান মানব জাতি। সেবা হয়ে গেলো ক্রয়যোগ্য পণ্য। দুয়েক শত বছর আগেও সমাজে অনেক সেবা বিনামূল্যে পাওয়া যেত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পানীয় সংকটের সেবায় বড় বড় দিঘী, পুকুর কাটা হত। পুকুরের পরে এলো নলকূপ। এখন বোতলে বাজারজাত হয় জীবনের অপর নাম পানি। স্বাস্থ্যসেবার জন্য ছিল গ্রামে-শহরে দাতব্য চিকিৎসালয়, স্থানীয় ডাক্তার কাকা ইত্যাদি।

 

জনস্বাস্থ্যের প্রয়োজন অনুযায়ী কবিরাজ, হেকিম এবং ডাক্তার সম্প্রদায় ব্যক্তিগতভাবেও সেবা দিতেন। কোনও বাড়ি থেকে ডাক পেলেই ডাক্তারী ব্যাগ হাতে ছুটে যেতেন রোগীর সেবায়। এখনও কেউ কেউ সেভাবে সেবা দিয়ে থাকেন। তবে তাদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম।

 

জনস্বাস্থ্য যখন থেকে পণ্য হলো,তখন থেকেই জনস্বাস্থ্যের দুর্দশারও শুরু । চিকিৎসা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। সেই চিকিৎসা ব্যবস্থা মানুষের দোরগোড়া থেকে সরে জায়গা নিয়েছে ব্যবসায়ীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কুঠরীতে। ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে, যেখানে গরীব সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার রহিত।

 

ক্লিনিক নিয়ে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ হঠাৎ করেই তুঘলকি কান্ডের মত শুরু করেছে। ফলাও করে আচমকা অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করার নামে অভিযান শুরু করেছে। এমন অভিযান ২০২০ সনেও একবার শুরু করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। বেশ কিছু ক্লিনিক বন্ধও করা হয়। কিন্তু ক্লিনিক ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে সেই অভিযান পরিত্যক্ত হয়।

 

বন্ধ ক্লিনিক খুলে দিতে হয়। তাছাড়া করোনা কালে নিবন্ধনহীন ক্লিনিকের সঙ্গে চুক্তি করে স্বাস্থ্য বিভাগ নিজেই বিতর্কিত হয়েছে। এবারে তিন দিনের মধ্যে অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ রাখার নির্দেশনা জারি করে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। স্বাস্থ্যবিভাগ নিজেই মাঠে নেমেছে বন্ধ করার ধনুর্ভাঙ্গা পণ নিয়ে।

 

দেখা গেল প্রতিদিনই সংবাদ ছাপা হচ্ছে, টিভিতে খবর প্রচার হচ্ছে। শত শত কিøনিক অবৈধ,নাই তাদের লাইসেন্স, নাই উপযুক্ত ডাক্তার নার্স, নাই চিকিৎসার প্রয়োজনীয় উপকরণ-সরঞ্জাম। আছে চোখ ধাঁধাঁনো বাহারি সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপন, কেতাদুরস্ত পোশাকে নার্স, আয়া, দারোয়ান, পরিচ্ছন্নতা কর্মী।

 

যেন তেন ভাবে একটি দালান ভাড়া নিয়ে, সাইনবোর্ড লাগিয়ে এই দেশে ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ব্যবসা শুরু করা যায়। করা যায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি। পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে প্রসূতি ও নবজাতক তালাবদ্ধ রেখে সবাই পালিয়ে যায় অভিযানের সংবাদ পেয়ে। জানা যায় সেখানে ডাক্তার নার্স ছাড়াই চিকৎসা চলে। 

 

দেশে যাতে অবৈধ, বেআইনি জনস্বার্থ বিরোধী কোনও কার্যক্রম চলতে না পারে তা দেখার জন্য সরকারী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। তারপরও অবৈধ প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের নাকের ডগায় সদর্পে ব্যবসার নামে লুটতরাজ করে। সদর রাস্তায় আছে তাদের বাহারি সাইনবোর্ড।

 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যেন কখনই ওই রাস্তা-গলি-সড়ক বা দালানের সামনের পথ মাড়ান না। মাড়ালেও সাইনবোর্ডগুলি দেখেন না। দেখলেও পড়েন না। পড়লেও বোঝেন না। বুঝলেও মনে রাখেন না। যেন এসব তাদের দায় নয়।

 

তারা চাকরি করেন ঘন্টার কাঁটা মিলিয়ে। মাস গেলেই বেতন, বোনাস। বছর ঘুরলেই ইনক্রিমেন্ট। এখন হঠাৎ করে অবৈধ ক্লিনিক খুঁজে বের করার উদ্যোগের ফলাফল দেখার অপেক্ষায় সাধারণ জনগণ।

 

পত্রিকার খবরে জানা যায়, খোদ নারায়ণগঞ্জ শহরেই প্রায় ৩০টির মত ক্লিনিক বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রায় ৪০০ ক্লিনিক ব্যবসা করছে। তার মধ্যে ৫০টির মতো অবৈধ রূপে চিহ্নিত হয়েছে। ক্লিনিক এবং ডায়াগনষ্টিক মিলিয়ে শ’দেড়েক বৈধ প্রতিষ্ঠান আছে। তাহলে বাকি প্রতিষ্ঠান কিভাবে টিকে আছে বা থাকল?

 

 

আরেকটি প্রশ্ন এখন কেন তাদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে? এতদিন এই প্রতিষ্ঠানগুলো যে লোক ঠকালো তার ক্ষতিপূরণ কে দিবে? তারা কোন সাহসে, কার ছত্রছায়ায় এতদিন যাবত এই অবৈধ বাণিজ্য এত নির্বিঘ্নে চালাতে পারলো? এ পর্যন্ত প্রায় ১৪০০ ক্লিনিক বন্ধ করা হয়েছে সারা দেশে।

 

তারপরও অনেক জায়গায় বাইরের দরজায় তালা দিয়ে ভেতরে চলছে চিকিৎসা। কোথাও মালিক কর্মচারী লাপাত্তা। কোথাও আবার এমবিবিএস ডাক্তার সাময়িক ভাবে ভাড়া করে ক্লিনিক চালু রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে এবারের অভিযান সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদি।

 

তিন ধাপে অভিযান পরিচালনা করা হবে। প্রথম ইনটেনসিভ ফেইস। এই পর্যায়ে দ্রুততম সময়ে নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে রেক্টিফিকেশন, ন্যূনতম চিকিৎসা মানসম্পন্নদের চিহ্নিত করা। পরের ধাপে চলবে শুদ্ধি অভিযান, নিবন্ধনের বাইরে কেউ থাকবে না। নির্ধারিত চিকিৎসা সেবা দেয়া সক্ষমদেরই কেবল কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেয়া হবে।

 

এক সময় বাড়ির পাশে, গলির ধারে বাজারে, রাস্তার মোড়ে কিছু ডিসপেন্সারী থাকত। সেখানে একজন অভিজ্ঞ কম্পাউন্ডার প্রাথমিক চিকিৎসা দিতেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ডাক্তার বলে পরিচিত হতেন। ওই সব ডিসপেন্সারিতে ঔষধ বিক্রির পাশাপাশি জরুরী চিকিৎসা সেবা পাওয়া যেত।

 

আবার সাপ্তাহিক ভিত্তিতে দু’একজন এমবিবিএস ডাক্তারও ঐসব ডিসপেন্সারিতে নিয়ম করে রোগী দেখতেন। তাদের ভিজিটও সাধারণ মানুষের সাধ্যের ভেতরেই ছিল। তাছাড়া পাড়ার ডাক্তারের ফি ছিল নাম মাত্র। কখনো তিনি ফি ছাড়াই ঔষধ লিখে দিতেন।

 

তাদের আয়ের একমাত্র উপায় ছিল ঔষধ বিক্রি করা। যেহেতু তিনি পাড়ার ডাক্তার, তাই হয়ে উঠতেন কারোও মামা, চাচা, ভাই, দাদা আর এই সর্ম্পকের সুবাদেই তিনি রোগী দেখতেন প্রায়ই বিনামূল্যে ।

 

বর্তমানে একই রকম ভাবে পাড়ায় মহল্লায় কিংবা শহরের এই গলিতে সেই গলিতে গড়ে উঠেছে ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। অনেকের মতে ব্যঙ্গের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে। পাড়া মহল্লার ঐ ডাক্তার কাকার জায়গাটি তারা দখল করে নিলেন চোখ ধাঁধানো উপায়ে।

 

গলাকাটা মূল্যে চিকিৎসা সেবার আড়ালে পণ্যরূপে সেবা বিক্রয় শুরু করলেন। অনেকটা বহুজাতিক কোম্পানির চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন ও পরামর্শের ন্যায় মানুষ বাধ্য হলো বহূমূল্যে নিম্নমানের চিকিৎসা নামের পণ্য সামগ্রী ক্রয়ে।

 

বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার চমকে মানুষ আজ জিম্মি। ক্লিনিক ব্যবস্থা কোনক্রমেই জনবান্ধব ব্যবস্থা নয়, মূলত ব্যবসাবান্ধব, বিমাবান্ধব। যে দেশে স্বাস্থ্য বিমা সহজলভ্য, বাধ্যতামূলক সেখানে ক্লিনিক ব্যবসা উপযুক্ত।

 

আমাদের দেশে তা একেবারেই অনুপুযুক্ত। বিষয়টি খতিয়ে দেখলে সাদা চোখেই দেখা যায়, কার স্বার্থে, কাদের প্রয়োজনে, কাদের দ্বারা এই অবৈধ ব্যবসার পোয়াবারো। লোক দেখানো কয়েক দিনের অভিযানে জনগণের ভোগান্তি দূর হবে না।

 

এই অভিযানে সংশ্লিষ্ট একটি বিশেষ মহলের পকেট ভারী হচ্ছে। পত্রিকার খবর থেকেই জানা যাচ্ছে, অবৈধ ক্লিনিকের মালিকেরা ম্যানেজ করে ব্যবসা চালাবার চেষ্টায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। অচিরেই দেখা যাবে হয়ত অভিযানের মন্থর গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্লিনিক ব্যবসার রমরমা জৌলুস ফিরে আসবে।

 

জনস্বাস্থ্যের ব্যয়ও পাল্লা দিয়ে কয়েক ধাপ বাড়বে। ম্যানেজ করার খরচের অর্থ তো জনগণকেই সুদে আসলে পরিশোধ করতে হবে। ক্ষেতে বেড়া দেয়া হয় নিরাপত্তার জন্য। ক্ষতিকর বেড়ার রোগ সারাবার ওষুধ বোধ করি এখনও অনাবিষ্কৃত। চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্ব সাধারণের একমাত্র চাওয়া প্রয়োগযোগ্য নিদানের ব্যবস্থা যেন দ্রুত হয় ।এসএম/জেসি


 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন