সীতাকুন্ডে অভিনব রাসায়নিক কন্টেইনার দূর্ঘটনার অগ্নিকান্ডে এ পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত কয়েক শত। আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা হাসপাতালে আছে ১৭ জন। নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশি যৌথ মালিকানার বি এম কন্টেইনার নামের একটি বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোতে আকস্মিক বিস্ফোরনে এই অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত।
হাইড্রোজেন পার অক্সাইড নামের একটি রাসায়নিকের কন্টেইনার থেকে এই আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে। আরও বিস্ফোরনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না বলে অনেকেই অনুমান করছে। কেননা রাসায়নিক উপাদান ভর্তি আরও কন্টেইনার ডিপোতে থাকার খবর নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
অবশ্য সেনাবাহিনীর একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনার দুইদিন পর অকুস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছে বিস্ফোরনের সম্ভাবনা নেই। অগ্নি নির্বাপন কর্মকর্তারা আগুন নেভানোর কথাও জানান। নিহত ও নিখোঁজ মিলিয়ে ১৫ জন দমকল কর্মি আগুন নিভাতে গিয়ে দূর্ঘটনায় কবলিত। বিস্ফোরনের পরপরই দায়িত্বশীল মহলের কেউ কেউ নাশকতার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ডিপোর মালিক বা ব্যবস্থাপক কেউই সঠিকভাবে কোনও তথ্য প্রকাশ করছে না। এছাড়া সংবাদ মাধ্যমে কন্টেইনার মালিকের সঙ্গে ক্ষমতাসীন মহলের সুসম্পর্কের বরাতও দেয়া হচ্ছে। ইয়ার্ডে মোট কয়টি কন্টেইনার, কোন কন্টেইনারে কি আছে তার কোনও হদিস পাওয়া যায়নি প্রাথমিক অবস্থায় ।
এখন জানা যাচ্ছে শতাধিক কন্টেইনার আগুনে ভস্মীভূত, হাজারের উপরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোন কন্টেইনারে কি আছে এই তথ্যই কর্তৃপক্ষ জানাতে পারছে না। একটি টেলিভিশন টক শোতে স্মার্ট গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার জানিয়েছেন, যাদের কাছে এই সব তথ্য আছে তারা কেউ আহত, কেউ নিহত হয়েছে বিস্ফোরনে।
ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসার, কম্পিউটার নির্ভর ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি ব্যানিজ্যের বর্তমান প্রযুক্তির পরিবেশে ডিপোতে রক্ষিত কন্টেইনারের কোনও তালিকা দরকারের সময় পাওয়া যাবে না,এমন বক্তব্য ধোপে টেকে না। রপ্তানী বানিজ্যের অংশ হিসেবে বিল অব ল্যাডিং এবং প্যাকিং লিস্টের অনেকগুলো কপি কাস্টম কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট অনেক দপ্তরে পাঠাতে হয় ।
কন্টেইনার প্রাঙ্গনের সাইট অফিসে যেমন সমস্ত তথ্য জমা থাকবে,তেমন অনুলিপি কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে রক্ষিত খাকবে। অভাবনীয় দূর্ঘটনার পর পরই সেই তালিকা চাহিবামাত্র সরবরাহ করার কথা।এ সবই হল স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার কথা । কিন্তু দমকল বাহিনীকে তাৎক্ষণিকভাবে মজুদ কন্টেইনারের কোনও তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।
কর্মচারি কখনই মালিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া মিথ্যা তথ্য দেয় না বা তথ্য গোপনও করে না। সঠিক তথ্য না পাওয়ার কারণেই দমকল বাহিনীর লোকজন নিহত হয়। যেহেতু কর্তৃপক্ষ ঢাক ঢাক গুড় গুড় করে খোঁড়া অজুহাতে আত্মপক্ষ রক্ষার চেষ্টা করছে,তা থেকে সংবাদ মাধ্যমে আলোচিত সন্দেহই সত্য বলে ধরে নিতে হয় ।
অর্থাৎ রাসায়নিক ভর্তি কন্টেইনার ডিপোতে রাখার আইনগত অনুমতি ছিল না । থাকলেও যথাযথ নিয়ম মেনে তা নিরাপদ ভাবে রাখার অবকাঠামো সেখানে নাই। বেআইনীভাবে কন্টেইনার রাখার অপরাধ গোপন রাখার অভিপ্রায়েই অবাস্তব সব যুক্তির অবতারনা করা হচ্ছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে।
যদিও এতগুলো তাজা প্রানের অকাল মৃত্যু কোনও ভাবে মেনে নেয়া যায় না । কোনও কিছুর বিনিময়েই ভুক্তভোগী পরিবারের এই ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয়। আহতদের দূর্বিসহ জীবন কাটাতে হবে আমৃত্যু। তবে অবশ্যই এই দূর্ঘটনা, এতো মুত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল। যদি সঠিক বিধি-বিধান মেনে ব্যবস্থাপনার দ্বারা কন্টেইনার ডিপো পরিচালিত হত।
দেশের ব্যবসায়ীদের রয়েছে সীমাহীন লোভ। তাদের ঝোক সর্বদাই আইন-কানুন না মেনে ব্যবসা করা। এই ঝোকের সহায়তাকারী বিশেষ প্রাপ্তির জোরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আমলা কর্মচারি । তারা অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার সব রকম অন্ধি-সন্ধি ব্যবসায়ীদের বাৎলে দেয়। বিধি-বিধান মানা হয় কি না তা দেখার দায় গ্রহন করে না । দেখলেও না দেখার মতো থাকে। আর এ সমস্ত বিবেকহীন মানুষের দায়িত্বহীনতার কারনেই দেশের নিরপরাধ মানুষের প্রানহানি ঘটে।
দেশের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মাননীয় মন্ত্রি বলেছেন, রাসায়নিক কন্টেইনার দূর্ঘটনা মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন। এসব থেকে আমরা শিক্ষা নিচ্ছি। ৫০ বছর পার হলেও আমাদের নবিশকাল অতিক্রান্ত হয়নি। শিক্ষা সম্পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণেও আকসার যাওয়া হয়। তারপরও শিক্ষণ সময় শেষ হলো না।
আমাদের লোকজন খিচুরি রান্না শেখার জন্য বিদেশে যেতে পারেন। যেতে পারেন জলাভূমি উন্নয়ন কৌশল শিখতে জলাভূমিহীন দেশে। দেশে চলার অনুপযোগী ডেমু ট্রেন দেখতে যান, আমদানিও করে ফেলেন। কিন্তু কন্টেইনার ডিপো ব্যবস্থাপনার জন্য কেউ বা কোনও দল বিদেশ ভ্রমণে গিয়েছেন, কিছু শিখে এসেছেন তেমন জানা যায় না।
অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরেও আমাদের শিক্ষা অসম্পূর্ণই থাকছে। রানা প্লাজা দূর্ঘটনায় মারা গেছে ১১৩৬ জন। ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলির অগ্নিকান্ডে মারা যায় ১২৪ জন রাসায়নিক গুদামের বিস্ফোরনের অগ্নিকান্ডে। রাসায়নিক গুদামের অপর আগুনের ঘটনা ঘটে চকবাজারের চুড়িহাট্টায়, মারা যায় ৭৮ জন। তারপরও আমাদের শেখা হয়নি।
তাজরিন অগ্নিকান্ডে ২০১২ সালে মারা যায় ১১১ জন। রূপগঞ্জের আগুনের ঘটনায় মারা গেছে ৫২ জন। বনানী এফ আর টায়ারে আগুনের ঘটনা এখন কোনও আলোচনা আসে না। আমাদের শিক্ষার আরও বাকি ছিল। ঢাকা বরিশাল রুটের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চে অগ্নিকান্ডের অভাবনীয় ঘটনা ঘটে, মৃত্যু হয় ৪০ জন মানুষের।
তিতাস গ্যাসের ত্রুটিপূর্ণ সঞ্চালন লাইন বিস্ফোরনে নারায়ণগঞ্জের তল্লায় মসজিদে বিস্ফোরনের আগুনে মারা যায় ৩৪ জন। সড়কপথে দূর্ঘটনায় মৃত্যুর পরিসংখ্যান আরো ভয়াবহ। আহতের নিহতের খবর ছাপা হচ্ছে পত্রিকায় প্রতিদিন। এতসব ঘটনা দূর্ঘটনা, কারো দায় নেই,জবাবদিহিতা নেই। উধো-বুধো নিয়ে ময়দান গরম করার কিন্তু কমতি নেই। তারপরও আমাদের শেখার শেষ নাই।
মানুষ মরবে, আমরা শিখতে থাকব। আবারও মানুষই মরবে আমাদের শেখার সুযোগ করে দিতে। এই শেখার শেষ হোক, বেঘোরে মানুষের মৃত্যু তথা হত্যার মিছিল থামুক। লেখক : কবি, সাবেক অধ্যক্ষ শধৎরসৎবুধ৯@মসধরষ.পড়স |এসএম/জেসি


