Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

তিন গৃহবধূর মৃত্যু দায় কার

Icon

রাকিবুল ইসলাম

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২২, ০৬:৫২ পিএম

তিন গৃহবধূর মৃত্যু দায় কার
Swapno

দেওভোগের আখড়া এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে একই পরিবারের তিন গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। একে অপরকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ওই তিন নারী। তারা পরস্পর সম্পর্কে জা হন। একই পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে শুধু ওই পরিবারের সদস্যরাই নন, শোকের মাতম পুরো দেওভোগ এলাকায়।

 

 জ্যেষ্ঠ্যের তীব্র তাপদাহের পর বৃহস্পতিবার কয়েকঘন্টার স্বস্তির বৃষ্টিতে কেউ ক্ষুনাক্ষরে ভাবতেও পারেনি তাদের ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে দেওভোগ আখড়ার বৃন্দাবন ঘোষের বাড়িতে সবকিছুই যেন আচমকা ঘটে গেল। অপ্রত্যাশিত এই মৃত্য কেউই মেনে নিতে পারছেনা।

 

 তখনও বৃষ্টি পড়ছিল। বৃন্দাবন ঘোষের ছেলে রঞ্জিত ঘোষের স্ত্রী বিমলা রানী ঘোষ (৫২) বাসার কলাপসিবল গেটের সাথে বিদ্যুতায়িত হয়ে আটকে যান। গেটের সাথেই বিদ্যুতের তার এবং ডিসের তার জড়াজড়ি করে আটকে ছিল। তখন ঘরেই ছিলেন নিখিল ঘোষের স্ত্রী বাসন্তী রানী ঘোষ (৪২)। জা কে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকে ধরে নাড়া দিতে যান তিনি। 

 

সাথে সাথে বিদ্যুতায়িত হন তিনিও। বৃন্দাবনের ছোট ছেলে রূপক ঘোষের স্ত্রী মনি রানী ঘোষ (৩৮) পূজার ফুল নিয়ে ঘরে ঢুকছিলেন। দুই জা কে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনিও কিছু বুঝে উঠার আগে তাদের স্পর্শ করলে বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা যান তিনিও। অনাকাঙ্খিত এই মৃত্যুর জন্য কে দায়ী তা নিয়ে ক্ষোভ এলাকাবাসীর। এই মৃত্যুর জন্য কাকে দায়ী করবেন তারা, দুর্ভাগ্য নাকি অব্যবস্থাপনা সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।

 

এদিকে পায়ের কাছে মায়ের প্রাণহীন দেহ পড়ে আছে। আর শোকে বাকরুদ্ধ মেয়ে স্মৃতি রাণী ঘোষ তার মা বাসন্তি রাণী ঘোষকে হারিয়ে নির্বিকার হয়ে বসে আছেন। সব হারিয়ে এই পৃথিবীকে বলার কোনো ভাষা নেই এই স্মৃতির। মাকে হারিয়ে ভেঙ্গে পরেছে মেয়ে। এত অল্প সময়ে মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যাবেন তা চিন্তাও করতে পারেনি স্মৃতি রানী।

 

 আর মাত্র ১০ দিন পরে আগামী ১৯ তারিখ মর্গ্যান গার্লস স্কুল থেকে এবার এস এসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে স্মৃতি রাণী ঘোষের। তবে মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে ভেঙ্গে পরেছে এই শিক্ষার্থী। মায়ের লাশের সামনে অজস্র চোখের জলকে থামাতে পারছে না। মায়ের লাশের সামনে চোখের জল ঝরতে দেখা যায় তার। নগরীর দেওভোগ আখড়া এলাকায় এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখা গেছে। 

 

১৬ বছর বয়সী সন্তান স্মৃতি রানী ঘোষের মায়ের মরদেহ দাহ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন তারই পিতা নিখিল ঘোষ। তখন তিনি ক্লান্ত-শ্রান্ত অসহায় হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাকে যেন শেষ বার দেখে নিচ্ছে মেয়ে। এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। নিহতের পরিবারকে সহমর্মিতা ও সমবেদনা জানাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন তিনি।

 


মৃত বাসন্তী রানীর স্বামী নিখিল ঘোষ যুগের চিন্তার এই প্রতিবেদককে বলেন, আমার মেয়ে অল্প বয়সে তার মাকে হারালো। আমার স্ত্রীকে হারিয়ে আমি যেন সব হারিয়ে অসহায় হয়ে পরেছি। সৃষ্টিকর্তা আমার এ কি হাল করলো! আমার মেয়েটা আর কয়দিন পরে এসএসসি পরীক্ষা দিবে।

 

 তাকে সাহস দেয়ার ভাষাটাও আমি হারিয়ে ফেলছি। সকালে আমরা এক সাথে বসে নাস্তা করে আমি কাজে চলে যাই। বিকেলে যে তাকে সারা জীবনের জন্য হারাতে হবে আমি কল্পনাও করতে পারি নাই। আমার মেয়েটাকে আমি কি বুঝ দিবো।

 


এসময় তার পাশে মৃত বিমলা রানীর ভাগ্নে শিল্পী রানী বলেন, ‘বিদ্যুতের তার বাড়ির কলাপসিবল গেট দিয়ে টানা ছিল। কোনো কারণে ওই তার থেকে গেট বিদ্যুতায়িত হয়। বৃষ্টির মধ্যে ড্রেন পরিষ্কারের সময় গেটটি ধরে ফেলেন আমার মামি বিমলা রানী। এতে তিনি প্রথমে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। পরে তাকে বাঁচাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন বাসন্তি রানি ঘোষ।

 

 তারা গেটের সামনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে থাকেন। পরে বিকেলে পূজার জন্য ফুল নিয়ে ঘরে প্রবেশ করতে আসে মনি রানী ঘোষ। তিনি তাদের আটকে থাকতে দেখে ভেবেছিলেন তারা হয়ত ব্যাথা পেয়ে দাড়িয়ে আছে।তাদের সরাতে গিয়ে তিনি নিজেও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তারা একজন আরেকজনকে বাচাঁতে গিয়ে নিজেদের জীবন দিতে হলো। অথচ কেউ জানতো না তাদের যে এইভাবে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। 

 


এদিকে ঘটনা বুঝতে পেরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে নগরীর ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিলে সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক নাজমুল হোসেন তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

 


এলাকাবাসী জানান, নগরীর রাস্তাঘাটের বিদ্যুতের সংযোগের সাথে ডিস লাইনের তার সাথে থাকায় কোনটা বিদ্যুতের লাইন আর কোনটা ডিসের লাইন তা নিয়ে সন্দেহাতীত হয়ে পড়েন। তাছাড়া শহরের বিদ্যুৎলাইনের তারগুলো নিয়ে মানুষ আতঙ্কে থাকেন। তারই প্রতিফলন আজকের এক্সিডেন্ট। তাই আমরা মনে করি এই ঘটনার জন্য বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাদের গাফলতি আছে। 

 


এই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী নিহতের পরিবারের মাঝে সমবেদনা প্রকাশ করেন। সেই সাথে তাদের সকল ধরনের সহযোগিতার আশ^াস প্রদান করেন। যে কোন প্রয়োজনে তাদের পাশে থাকার আশ^াস দেন।

 


নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তিন গৃহবধূর মরদেহ তাদের স্বজনরা বাড়িতে নিয়ে গেছেন। ওই এলাকার বৈদ্যুতিক সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।

 


নারায়ণগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইদুজ্জামান বলেন, অভিযোগ না থাকায় মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।এসএম/জেসি 
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন