# কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও নৌ পুলিশের খেয়ালিপনায় এগুলো হচ্ছে : খন্দকার শাহ আলম
# এদের কারণে নিস্পাপ মানুষগুলো দূর্ঘটনার মারা যাচ্ছে : হাজী নুরুদ্দিন
# জাহাজগুলোর জন্য পোতাশ্রয়ের ব্যবস্থা করা গেলে সমাধান করা যেত : নৌ ওসি
# কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা করা না গেলে কোন সমাধান হবে না : বাবুলাল বৈদ্য
পরপর বেশ কয়েকটি দূর্ঘটনা ঘটে গেল শীতলক্ষ্যা নদীতে। এরপর থেকেই দূর্ঘটনার কারণগুলো নিয়ে শুরু হয় চুল-চেরা বিশ্লেষণ। যেখানে শীর্ষ কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয় নদী দখল। আর এই নদী দখল নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মিডিয়ায় ফলাও করে সংবাদ প্রচার করা হয়। সেখানে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে যে শীতলক্ষ্যার দক্ষিণাংশ অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ এর মূল শহর সংলগ্ন নদীর এলাকা খুবই ব্যস্ততম এবং একই সাথে এই অংশটুকু তুলনামূলকভাবে খুবই সরু।
তাই এই এলাকাটি দখল মুক্ত রাখা খুবই জরুরী বলে জানিয়ে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন বলেও জানান প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তর। কিন্তু দখলদারীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কোন অবস্থায়ই কমানো যাচ্ছে না। বরং বলা যায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তারা। তাই সচেতন মহলের প্রশ্ন, আসলে শীলক্ষ্যার শাসক কে? অর্থাৎ শীতলক্ষ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করছে কে?
গতকাল শীতলক্ষ্যার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর পশ্চিম পাশের নাসিক (নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন) ১০নং ওয়ার্ডের আজিম মার্কেট এবং পূর্ব পাশের নাসিক ২৪ ওয়ার্ডের এসিআই ফ্লাওয়ার মিল এলাকা থেকে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর দক্ষিণাংশ জুড়ে নদীর বিভিন্ন অংশ দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন মিল কারখানার জাহাজ। এর বেশির ভাগই সিমেন্ট কারখানার। এই দৃশ্য আরও প্রকট আকারে দেখা যায় হাজীগঞ্জ-নবীগঞ্জ ফেরীঘাট এলাকার দুই পাশে। এর দক্ষিণ পাশে আকিজের জাহাজগুলো নদীর বিশাল এলাকা জুড়ে নদীর সিংহভাগই দখল করে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, কিছু দিন আগে ব্যাপক লেখালেখির পর থেকে এই দৃশ্য দাম্ভিকভাবে আরও বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ঘটনার জন্য সচেতন মহল অভিযোগ করছেন নদী কর্তৃপক্ষসহ নৌ পুলিশের বিরুদ্ধে।
এই বিষয়ে কথা বললে ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’র সভাপতি হাজী নুরুউদ্দিন জানান, এখানে আকিজসহ বিভিন্ন সিমেন্ট কারখানাগুলোর জাহাজগুলো নৌযান চলাচলের পথে নোঙর করে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। এর ফলে নদী পথে বিভিন্ন সময় দূর্ঘটনাও ঘটতেছে। নদী পথে দূর্ঘটনার আরেকটি কারণ তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর নকশায় ত্রুটি। কিন্তু সেটাতো ইচ্ছা করলেই এখন সমাধান করা সম্ভব না। একদিকে সেতুর শুধু মাঝখান দিয়ে নৌ যান চলের উপযোগী হওয়ায় এবং জাহাজগুলো এভাবে পার্কিং করার কারণে নৌ-যান চলাচলের জায়গা ছোট (সরু) হয়ে আসছে, ফলে সবাই আগে যাওয়ার জন্য মাঝখানে আগে পৌছাতে চায়। ফলে দূর্ঘটনাগুলো ঘটে। যার ফলে দূর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জানান, এই বিষয় দেখার জন্য নৌ পুলিশ আছে নৌ ট্রাফিক আছে। বিআইডব্লিওটিসি, বিআইডব্লিওটিএ’র মতো দুইটি অথারিটি আছে। তারা কেন এই নৌ পথকে নির্বিঘ্ন করতে পারে না। এ নৌ পথ রহিম করিম যেই দখল করুক না কেন এই যান চলাচলের রাস্তা পরিস্কার করার জন্য এদের সরে যেতে হবে। যদি না যায়, তাহলে তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তিসহ জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণ একজন সমাজকর্মী হিসেবে বিষয়টি আমার খুবই ব্যথা লাগে, কষ্ট লাগে। এদের কারণে নিস্পাপ মানুষগুলো দূর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে। তিনি জানান, আমাদের শাসন ব্যবস্থায় এগুলো রক্ষার দায়িত্বে যারা নিযুক্ত থাকেন, তাদের অনেকের মধ্যেই ঔপনিবেশিক যে মনমানসিকতা তা বিদ্যমান আছে। তাছাড়া এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক অসৎ লোক আছে যারা নাকি কিছু সুবিধা পাওয়ার জন্য দেখেও দেখে না, এমন একটি ভাব দেখায়।
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি খন্দকার শাহআলম জানান, নদী পথের সমস্যা দেখার জন্য আলাদা বিভাগ আছে। যেমন বিআইডব্লিওটিএ, বিআইডব্লিওটিসি কিংবা নৌ পুলিশ। তারা এই বিষয়টি দেখার দায়িত্বে আছেন। নদীতে নোঙর করে যদি নদী ব্লক করে দেয়া হয় তাহলে সেটা দেখার দায়িত্ব নৌ পুলিশের। নৌ পুলিশের এসপি কিংবা ওসি নদীতে নোঙর করা জাহাজের সারেং কিংবা সুকানীদের বলবে এখান থেকে নোঙর তুলে নিয়ে নদী পরিস্কার করার জন্য। তিনি জানান, কোম্পানীর জাহাজগুলো নোঙর করে এমনভাবে চাপিয়ে নিয়ে আসে যে, নদী দিয়ে নিরাপদে আর কোন জাহাজ চলাচলের সুযোগ থাকে না। একপাশ থেকে একটি ট্রলার বা জাহাজ আসলে নোঙর করা জাহাজগুলোর জন্য অন্য পাশ থেকে কি আসছে বা কিছু আসছে কি না তা দেখার সুযোগও থাকে না। এর ফলে যেকোন সময়ই দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিআইডব্লিওটিএ, বিআইডব্লিওটিসির কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী আছে একই সাথে নৌ পুলিশের খেয়ালিপনায় এগুলো হচ্ছে। এই বিষয়ে আমি দাবি জানাচ্ছি অনতিবিলম্বে এগুলো দেখার দায়িত্বে যারা সেসব কর্তৃপক্ষ যেন এ বিষয়টি দেখেন। নৌ পথে জাহাজ চলাচলের জন্য। কোম্পানীগুলোর কাছে পণ্য নিয়ে জাহাজ আসে অনেকে আবার নিজেদের জাহাজ দিয়ে পণ্য নিয়ে আসে। তাই কোম্পানীগুলো চেষ্টা করবেই তাদের জাহাজগুলো কারখানার কাছাকাছি নোঙর করে রাখতে। কিন্তু এটা দেখার জন্য নৌ পুলিশ, বিআইডব্লিওটিএ, বিআইডব্লিওটিসি আছে।
এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ নৌ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান জানান, আমরা প্রতিমাসেই ভ্রাম্যমান অভিযান চালাই। নৌ পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ এবং জেলা প্রশাসকও ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সেখানে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন সময় জরিমানা করেছেন। কিন্তু জাহাজ চালকরা যখন প্রশ্ন করে আমরা থাকব কোথায় তখনতো আমরা কোন জবাব দিতে পারি না। জাহাজগুলো কোথায় থাকবে তাও আমরা নির্ধারণ করেও দিতে পারি না। তিনি জানান, নদী পথের কোন জায়গায় জাহাজ নোঙর করবে আর কোন জায়গায় নোঙর করা যাবে সেটা নির্ধারণ করবেন বিআইডব্লিওটিএ। এই বিষয়টা সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। আমাদের দেখার বিষয় হলো সেখানকার আইনশৃঙ্খলার বিষয়টা। আমাদের যখন তারা ডাকবেন, পুলিশের সহযোগিতা চাইবেন তখন আমরা তাদের সাথে যাব। এখানে যদি জাহাজগুলো রাখার জন্য পোতাশ্রয়ের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে এই বিষয়টার একটা সমাধান করা যেত।
বিআইডব্লিওটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের নৌ নিরাপত্তা বিভাগের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) বাবু লাল বৈদ্য জানান, আমরা প্রতিনিয়ত এই বিষয়ে নৌ পুলিশকে জানাইতেছি। ঐখানকার সমস্যা হলো জাহাজগুলো কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের জন্য আসে। কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের বিষয়টা যদি না করা যায়, তাহলে এর কোন সমাধান হবে না। পুলিশ প্রশাসনও যাচ্ছে, আমরাও যাচ্ছি, সরিয়ে দিয়ে আসছি, আবার তারা আসছে। তারা সেখানে শুধু ক্লিায়ারেন্সের জন্যই আসে। আপনারা সেখানে গিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করে তারা এখানে কি জন্য থাকছে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন। তারা কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের জন্য সেখানে আছে। সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি দূর্ঘটনার জন্যই আমরা যখনই কোন যানজট বাধে, যদি আমাদের সুযোগ পাই নিজেরা যাই। আর যখন না পারি তখন যে টহলদারি নৌ পুলিশ আছে তাদেরকে বিষয়টি দেখতে বলি।এমই/জেসি


