Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

আজ বিশ্ব বাবা দিবস বাবা আমার স্বপ্নের সওদাগর

Icon

আহমদ তমিজ

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২২, ০৭:১১ পিএম

আজ বিশ্ব বাবা দিবস বাবা আমার স্বপ্নের সওদাগর
Swapno

আজ ১৯ জুন রোববার বিশ্ব বাবা দিবস। বিপুল শ্রদ্ধা - ভালবাসা ও উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় ৭৫ টি দেশে এ দিনটি পালিত হচ্ছে । একজন সন্তানের কাছে বায়োলজিক্যালি তার বাবা হচ্ছেন প্রথম অনুসরণীয় ও বৈশিষ্ট্য পূর্ন ব্যাক্তিত্ব। বাবা অপার্থিব পরম নির্ভরতার নাম। বাবার প্রতি আবেগ ভালবাসা একেক জনের কাছে একেক রকম।

 

 কারো কাছে স্নেহ ভালবাসার আধার কারো কাছে অনুপ্রেরণার পরম উৎস। আবার কারো কাছে নির্ভরতার চাদর। কবি বলেছেন ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। এদিনটিতে আমার স্মৃতিপর্টে ভেসে ওঠে আমার বাবা মৌলভী পিয়ার আলী মোল্লার কথা, যিনি ছিলেন আমার স্বপ্নের সওদাগর।

 

জানা যায় ১৯ ০৮ সালের ৫ জুলাই আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমেন্টের এক গির্জায় এ দিবসটি প্রথম পালিত হয়। তবে ১৯১০ সালে ১৯ শে জুন সোয়েনা লুইস স্মার্ট নাম্নী এক নারী প্রথম বারের মতো নিজ উদ্যোগে বাবা দিবসটি পালিত শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন জুন মাসের তৃতীয় রোববার বাবা দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেন। 

 

১৯৭২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রির্চাড নিক্সন তা আইনে পরিনত করেন। বলতে দ্বিধা নেই আমি শত শত বইপড়ে শত শত মনিষীদের জীবনি পড়ে নয়- আমার বাবার কাছ থেকেই প্রথম শিষ্টাচারের শিক্ষা গ্রহন করেছিলাম। বিখ্যাত জর্জ হার্বার্ট  বলেছেন একজন বাবা একজন শিক্ষকের চেয়েও উত্তম।ঔপন্যাশিক প্রবোধকুমার সান্যাল লিখেছেন সন্তানের জনক হওয়া সহজ বাবা হওয়া কঠিন। 

 

ইসলামের মহানবী (সা) বলেছেন বাবার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর বাবার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তিনি আরো বলেছেন সন্তানের জন্য পিতার রেখে যাওয়া উত্তম চরিত্র থেকে শ্রেষ্ঠ মিরাসি(উত্তরাধিকার)সম্পত্তি হতে পারে না। আমার বাবা প্রথাগতভাবে প্রাইমারী পাস হলেও স্বীয় চেষ্টা পরিশ্রম ও সাধনায় তিনি একজন স্বশিক্ষিত মানুষ ছিলেন তিনি পরিনত বয়সে ও স্থানীয় মসজিদের ইমামের কাছে সহিহ ভাবে কুরআন পাঠ ও উর্দু পড়তে শিখেছিলেন।

 

 ভারতের বিখ্যাত মাওলানা আবুল কালাম আমাদের লিখিত উর্দু কিতাব ও তার লেখা অনুদিত বাংলা বই আমি বাবার কাছ থেকে সংগ্রহ করে ছিলাম। বিভিন্ন পর্বে বিশেষ করে মোহররম মাস এলে আমাদের বাড়িতে বৈকালিক আসর বসত।

 

 বাবা একটি চেয়ারে বসে - তার সামনে আমার মা খালারা মামানিরা এবং খালাতো মামাতো বোনেরা ও বসত। বাবা মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু থেকে পাঠ করে শুনাতেন, সে সময় আমি মার সাথে বসলেও কিছুই বোঝতামনা। 

 

তবে লক্ষ করেছি ইমাম হোসাইন(রাঃ) শাহাদাত পর্ব শুনে সবার চোখ অশ্রুজল হয়ে ওঠত, বিষাদ সিন্ধুর কঠিন কঠিন শব্দ ও বাক্যগুলো বাবা সহজ করে ব্যাখ্যা করে শুনাতেন, এছাড়াও চাঁদনী রাতে আমাদের বাড়ির আঙ্গিনায় হারিকেন জ্বালিয়ে বাবা সবার সামনে সুর করে পুথি পাঠ করে শুনাতেন। সে সময় তার গুরু গম্ভীর কন্ঠস্বর পুরো পরিবেশটাই আমোদিত হয়ে উঠতো।

 

বাবা একটি বিশেষ শর্তের কারনে নলুয়া পাড়ার নানা বাড়িতে বসত গড়ে ছিলেন। তার পিতা গোপচরের বিখ্যাত মোল্লা পরিবারের সদস্য ছিলেন। আমার দাদা এলাকার একজন মাতবরও জোতদার হিসেবে সু পরিচিত ছিলেন। দাদা তার একমাত্র ছেলে আমার পিতার জন্য অনেক জমি -জরাত রেখে গিয়েছিলেন। বাবা বৈষয়িক মানুষ ছিলেন না।

 

 তার পিতার রেখে যাওয়া জমি বিক্রি করে সংসার নির্বাহ করতেন। বাড়ি থেকে মসজিদ আর মসজিদ থেকে বাড়িই ছিল তার একমাত্র যাতায়াতের ক্ষেত্র। এক দিনের ঘটনা আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি মা গম্ভীর হয়ে বসে আছেন আমাকে ডেকে বললেন তোমার বাবা রাগ করে মসজিদে চলে গেছেন খেতে আসছেননা তাকে নিয়ে আস।

 

 আমি বই খাতা রেখে দক্ষিণ নুলুয়া জামে মসজিদে গিয়ে দেখি বাবা উচ্চ স্বরে কুরআন তেলোয়াত করছেন। বাবার অভ্যাস ছিল মন খারাপ হলে মসজিদে বসে জোরে জোরে কুরআন তেলোয়াত করা। আমি আস্তে আস্তে তার পিছনে গিয়ে দাড়ালাম, তিনি আমাকে দেখে কুরআন পড়া বন্ধ করে আমার দিকে তাকালেন,

 

 বললাম বাবা বাড়ি চলেন তিনি আমাকে তার পাশ্বে বসালেন হঠাৎ বললেন আচ্ছা আমি বা তোমার মা মারা গেলে তুমি আমাদের জন্য কি করবে? বললাম দোয়া করবো আল্লাহ যেন আপনাদের ভালো রাখেন। 

 

তিনি বললেন মৃত মা বাবার জন্য কি ভাষায় দোয়া করতে হয় তা আমাদের মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইব্রাহিম (আঃ)যেভাবে কুরআনের ভাষায় মা বাবার জন্য দোয়া করেছেন সে ভাবে বলবে, আল্লাহুমা।- রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগীরা- অর্থাৎ হে আল্লাহ তুমি আমার মা-বাবার সাথে এমন ব্যাবহার করো আমি যখন শিশু ছিলাম তারা আমার সাথে যেমন করেছিলেন, আয়াতটি তিনি কয়েক বার বলে আমাকে মুখস্থ করে দিলেন।

 

 বাবা আবার বললেন, তুমি মাঝে মাঝে নামাজ পড়ে দু হাত তুলে দোয়া কর, আল্লাহর নিকট কি দোয়া কর? বললাম আল্লাহ যেন আমাকে ভালো রাখেন। না, কুরআন যে ভাষায় শিখিয়ে দিয়েছে ঠিক সে ভাবেই বলবে- "রাব্বি যিদনি এলমা" হে আমার রব তুমি আমাকে জ্ঞান দান করো। 

 

আরেক দিনের ঘটনা- আমার বড় ভাই হাসান আলী মোল্লা পীরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, তিনি ষাটের দশকের শুরুতে ভারতের আজমীরে খাজা মাঈনুদ্দিন চিশতি (রঃ) মাজার জিয়ারত করতে যান ফিরে আসার সময় পরিবারের সবার জন্য জামা কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে আসেন, বাড়িতে এসে একে একে সবাইকে জামা কাপড় তুলে দিছেন।

 

 সবশেষে আমার পালা, হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, হায় ওর কথা তো আমার মনেই ছিলনা, কথা শুনে সেই কিশোর বয়সে আমি এতটাই মর্মাহত হয়েছিলাম যে দুঃখ ক্ষোভ ও রাগে আমার পড়ার টেবিলে বসে বসে নীরবে অশ্রুপাত করতে থাকলাম, মনের কষ্ট দুপুরের খাবার ও খেলাম না। 

 

এ দৃশ্যটি সুক্ষ্মদর্শী আমার বাবার দৃষ্টি এড়ালোনা, বাবা মাকে বললেন, ওকে কিছু খাইয়ে দাও আমার কাছে এসে বললেন তোমাকে সবচেয়ে দামী কাপড়ের জামা বানিয়ে দেব, বিকেলে বাবার সাথে একটি রিকশায় টান বাজার কাপড়ের মার্কেটে গেলাম, বাবা এক দোকানিকে বললেন ওকে সবচেয়ে দামী কাপড় দেখান,

 

 পছন্দ করতে কয়েকটি দোকান ঘুরে একটি গোলাপি রঙের বিদেশি কাপড় কিনে সেখানে এক টেইলার্সে এর দোকানে জামার মাপ দিয়ে রিকশায় বাড়ি ফেরার পথে বাবা আমাকে বললেন, সামান্য একটা জামার জন্য তুমি এমন করে কাঁদছিলে কেন? দেখবে কিছুদিন পর ওটা পুরাতন হলে এর কোন মূল্য থাকবেনা।

 

 মনে রাখবে যারা ছোট ছোট বিষয় নিয়ে চিন্তায় ডুবে থাকে তারাতো বড় হতে পারবেনা, আমি মৃদু স্বরে বললাম, ভাইয়া বলছিলেন আমার কথা নাকি তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন বাবা আমার কাঁধে একটি ঝাকুনি দিয়ে বললেন, কখনও কখনও ভুলে যাওয়াটাও নিয়ামত হিসাবে দেখা দেয়। তোমার ভাই যে জামা কাপড় এনেছে তার চেয়ে ও অনেক দামি সুন্দর কাপড়ের জামা তুমি পেলে। এটা তার ভুলে না গেলে হতোনা, তার একথায় আমি শান্ত হলাম।

 

আমার বাবা বৈষয়িক মানুষ ছিলেননা, তবে তিনি সন্তান বৎসল ছিলেন। তিনি আমাদের কে তুই তোকারি কথা বলতেননা, আমি তখন কলেজ ভর্তি হয়েছি সকালে সাইদুল হাসান বাপ্পিদের ( চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় নিহত) বাড়িতে টিউশনি করি, সকালে পরিপাটি হয়ে দ্রুত টিউশনিতে যাচ্ছিলাম, বাবা দেখে বললেন, নিজের লেখা পড়াটা যদি এমন নিয়ম মতো, করতে এতে তোমার কত ভালইনা হতো। তিনি সরাসরি নির্দেশ করে কথা বলতেন না।


 
আমার দাদার রেখে যাওয়া অনেক গুলো জমি গোপচর সৈয়দপুর এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। তাদের বিরাট বসত বাড়িটি বুড়িগঙ্গা নদীতে বিলিন হয়ে গিয়েছিল। বাবার সরলতার সুযোগ নিয়ে তার চাচতো জেঠাতো ভাই বোনেরা বলতো তুমিতো জমিগুলো ফেলে রেখেছো দাও আমরা চাষ বাস করে খাই।

 

 বাবা নীরব সম্মতি দিতেন, ফলে এক সময় দেখা গেল তারা জমিগুলো পরবর্তী জরিপ কালে হয় তাদের নিজ নামে করে নিয়েছে, নয়তো অন্যর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। 

 

ষাট দশকের শুরুতে একদিন দুপুর বেলা এক ব্যাক্তি আমাদের বাড়িতে এসে বাবাকে খোঁজ করছিল, তাকে পেয়ে লোকটি বললো মোল্লা সাব বুড়িগঙ্গা নদীতে বিলীন হওয়া আপনাদের বেশ কিছু জমি চর হিসাবে জেগেছে, সে জমিতে আমি চীনা বাদাম চাষ করেছি, তা থেকে তিন ভাগের এক ভাগ আপনার জন্য নিয়ে এসেছি।

 

 ঘাঠে নৌকায় রয়েছে বাবা প্রথমে নিতে চাইলেননা, চাপাচাপিতে সে এগুলো বাড়িতে উঠালেন পরে সেগুলোর অধিকাংশই আমার মামা খালাও অন্যন্য আত্মীয়দের মধ্যে বিলি বন্টন করে দিলেন। 

 

একদিন আমার পড়ার টেবিলে বসে বই পড়ছি সে সময় বাবা অনেকটা ধীর লয়ে আমার টেবিলের পাশে শোবার খাটটিতে বসে আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখন কলেজে পরছো পড়া শোনা শেষ করে কি করবে? আমি স্বাভাবিক ভাবে বললাম আইন পড়ে আইনজীবী হবো,

 

 তিনি বললেন তোমার এক চাচা আজিজ মাষ্টার এক ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা, সে কাশীপুর গোপচর সৈয়দপুর এলাকার অনেক ছেলেকে ব্যাংকে চাকুরী দিয়েছে, তুমি চাইলে আমি তাকে বলে দিতে পারি,না বাবা আমি চাকুরী করবোনা বাবা আমার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আইনজীবী হতে চাও কেন? 

 

বললাম প্রথমত এটি একটি স্বাধীন পেশা, দ্বিতীয়তো আপনাকে দেয়া দাদার জমিগুলো মামলা করে উদ্ধারের চেষ্টা করবো। তিনি আচমকা বিস্মিত হয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ করুনভাবে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে উঠে চলে গেলেন।

 

আমার বাবাকে কখনো অসুস্থ হয়ে শর্যাশয়ী হতে দেখিনি, জীবনে কোনদিন এলোপ্যাথিক ঔষধ খাননি। তিনি ফজরের আজান শুনে ঘুম থেকে উঠে মসজিদের দিকে ধাবিত হতেন।

 

 ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এক রাতে বাড়িতে আমরা সবাই ঘুমিয়ে, রাত প্রায় দুইটার দিকে হঠাৎ বাবার চিৎকার শোনে জেগে উঠলাম, লক্ষ করলাম বাবার মাথায় শক্ত করে গামছা বাঁধা, বাবা বলছেন, ব্যথায় আমার মাথাটা ছিড়ে যাচ্ছে, মেজো ভাই দ্রুত শীতলক্ষ্যা পুল এলাকায় এক ফার্মেসী দোকানের কম্পাউন্ডারকে ডেকে আনলেন, 

 

তিনি সব শুনে তার ধারনা হলো, ঘুমের ঔষধ দিলে তার ঘুম চলে এলে ব্যাথাও চলে যাবে। তিনি ঘুমের ঔষধের ওভার- ডোজ ইনজেকশন পুশ করলেন। এতে আমার সব স্বপ্নের সওদাগর বাবা চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে গেলেন- শান্ত হয়ে। তিনি আর জাগলেন না। লেখক : আইনজীবী/সাংবাদিক ।এসএম/জেসি 


 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন