Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

প্রাণ ফিরেছে শীতলক্ষ্যার

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২২, ০৫:৪৩ পিএম

প্রাণ ফিরেছে শীতলক্ষ্যার
Swapno

 

#এমপি ও মেয়রকে এই বিষয়টি দেখার জন্য অনুরোধ জানাই : হাজী নুরুদ্দিন
#সেন্ট্রাল ইটিপি’র আওতায় নিয়ে আসতে পারলে সহজ হতো : শরীফ উদ্দিন সবুজ

 

 

শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করেই গোড়াপত্তন হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ নগরীর। এমনকি অখন্ড ভারতের সাথে যোগাযোগের প্রধান নৌপথও ছিল এই শীতলক্ষ্যা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে ভ্রমণের জন্যও নারায়ণগঞ্জের নদী বন্দরটির খ্যাতি ছিল সর্বত্র। তাই এক সময় এই নদী বন্দরটি শুধু যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী বন্দর ছিল তা নয় এর সুনাম ছিল দেশের বাইরেও। এই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণেই বিশ্ব দরবারে প্রাচ্যের ড্যান্ডির খ্যাতাব অর্জন করে নারায়ণগঞ্জ।

 

অন্যান্য নদী দিয়ে চলাচল করা বিভিন্ন ব্যবসায়ীক জাহাজের নাবিকরা তাদের খাবারের পানি সংগ্রহ করার জন্যও ছুটে আসতেন এই নদীতে। অথচ কালের বিবর্তনে, যান্ত্রিক সভ্যতার যাতাকলে এবং শিল্প বাণিজ্যের প্রসারের নামে মানুষের যান্ত্রিক আচরণে এই নদীর পানি এখন সবচেয়ে ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। এই নদীর পানি পান করা তো দুরের কথা, মানুষের শরীরে এই নদীর পানির স্পর্শও লাগাতে কেউ রাজি নয়। অতিবাধ্য ছাড়া কেউ এই নদীর পানিতে গোসলও করতেও বেশ কয়েকবার ভাববে।

 

আশপাশের শত শত গ্রামের মানুষের কাছে পানি পান করাসহ নিত্য নৈমিত্তিক কাজে ব্যবহারের জন্য এই শীতলক্ষ্যার পানিকে পবিত্র মনে করা হতো। অথচ এক কালের সেই সুপেয় পানি এখন যেন মানব জাতির জন্য বিষে পরিণত হয়েছে। শুধু মানব জাতি কেন সমগ্র প্রাণির জন্যই বিষে পরিণত হয়েছে। আর তাইতো সু-স্বাদু মাছের জন্য বিখ্যাত এই নদীতে এখন কোন প্রকার মাছই পাওয়া যায় না। মাছ এখানে বাস করবে কি করে, এখানে মাছ বেঁচে থাকতেই পারে না। তবে বর্ষা মৌসুম এলে কিছুটা হলেও রং ফিরে পায় শীতলক্ষ্যা। যা বর্তমানেও বিরাজ করছে।


 
বিশ্লেষকদের মতে শীতলক্ষ্যা নদী সংলগ্ন এলাকায় নদী কেন্দ্রীক বেশ কিছু শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। সে সব কারখানার কেমিক্যাল যুক্ত পানিসহ কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি এই শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলা হয়। শুধুই কি তাই ! নারায়ণগঞ্জের আনাচে কানাচে যত কল-কারখানা গড়ে উঠেছে সে সব প্রতিষ্ঠানের কেমিক্যাল ও বর্জ্যও খাল বা ড্রেনের মাধ্যমে ফেলা হচ্ছে এই নদীতে। একই সাথে সিটি কর্পোরেশনের যত ড্রেনেজ ব্যবস্থা আছে তা সবই এই শীতলক্ষ্যা নদী কেন্দ্রীক।

 

ফলে নদীর পানির সাথে বিষাক্ত কেমিক্যাল ও কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য মিশে পানিকেও বিষাক্ত করে তুলে ব্যবহারের অযোগ্য করে তুলেছে। অথচ শীতলক্ষ্যা নদীর পানিকে দুষণ মুক্ত রাখার জন্য প্রশাসনিকভাবে কল-কারখানাগুলোকে বর্জ্য শোধনাগারের জন্য ইটিপি নামক বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া থাকলেও তা মানছেন না সবায়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সচেতন মূলক সংগঠন বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ করলেও প্রশাসনিক নজরদারীর অভাবে এই উদ্যোগটি মুখ থুবরে পড়ে আছে। তাইতো শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে দিনের পর দিন বিষাক্ততা বেড়েই চলছে।  


 
এই বিষয়ে আমরা নারায়ণগঞ্জবাসীর সভাপতি হাজী নুরুউদ্দিন বলেন, একটি নদী একটি শহরের প্রাণ। নদীকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর সকল শহর, বন্দর ও নগর গড়ে উঠে। আমাদের এই নারায়ণগঞ্জ শহরও শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই শীতলক্ষ্যা নদী-ই এখন আমাদের নারায়ণগঞ্জ বাসীর জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষার মৌসুমে এর ভয়াবহতার চিত্রটা বুঝা না গেলেও শুষ্ক মৌসুমে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে। এ নদীর দূষণের মাত্রা এতটাই বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে যে, এই পানি খাওয়া তো যায়-ই না। এমনকি হাত দিয়ে ধরা বা পা দিয়ে ছোঁয়াও যায় না।

যারা নৌকা বা ট্রলার দিয়ে এই নদী পার হয় তারা তখন নাকে মুখে হাত বা রুমাল দিয়ে দুর্গন্ধ ঢাকার চেষ্টা করে। এই নদীতে ডায়িং কারখানার কেমিক্যাল বা কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, সিমেন্ট কারখানার বর্জ্য অবাধে ফেলছে। ডায়িং কারখানায় যখন লাইসেন্স দেওয়া হয় তখন তাদেরকে ইটিপি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ জ¦ালানী বাচানোর জন্য ইটিপি ব্যবহার করে না। তারা চোরা পথে পানির নিচে সেট করা পাইপ দিয়ে এসব বর্জ্য নদীতে ফেলছে। তিনি আরও আরও বলেন, ২০১৫ সালে প্রশাসনের একটি অভিযানে নাগরিকদের পক্ষ হতে আমি সাথে ছিলাম। সে সময় নদীর তীর ঘেঁষে বিভিন্ন এলাকায় এধরণের লুকানো পাইপের মাধ্যমে নদীতে বর্জ্য ফেলতে দেখেছি।

তাছাড়া নারায়ণগঞ্জের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত বালু নদীর মাধ্যমে ঢাকা উত্তর এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ড্রেনের মাধ্যমে সেসব এলাকার মনুষ্য বর্জ্য এই বালু নদীতে ফেলছে, যা এই নদীর মাধ্যমে নামছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য পয়:নিস্কাশনের যত বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে এই শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলছে। চারদিক থেকে ফেলা এই বর্জ্যর কারণে শীতলক্ষ্যা নদী দ্রুত দুষণ হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব দেখাশুনার দায়িত্বে যারা আছেন তাদের মধ্যে কিছু অসৎ লোকের যোগসাজশে কারখানার মালিকরা এধরণের অসৎ উপায়ে বর্জ্য ফেলছে। আমাদের বিকেএমইএ এর সভাপতি আমাদের সাংসদ একেএম সেলিম ওসমান। ওনি পদক্ষেপ নিলে বিষয়টার সমাধান করা অনেকটা সহজ হয়। আমি আপনাদের মাধ্যমে মাননীয় সাংসদ ও মাননীয় মেয়রকে সবিনয় অনুরোধ রাখব, তারা যেন নির্দেশনা দেন, এইসব বর্জ্যগুলো যারা ফেলছেন তারা যেন এগুলো পরিশোধনের মাধ্যমে নদীতে ফেলেন।

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সবুজ এই বিষয়ে বলেন, বর্ষাকালেও শীতলক্ষ্যার পানিতে কেমিক্যাল থাকে না এমনটা নয়। এ সময় নদীতে পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় রাসায়নিকের অনুপাত কম থাকে। এটা আমরা প্রমাণ করতে পারি এখানকার পানির রং এবং মেঘনা মোহনার পানি পাশাপাশি রাখলে রংয়ের মধ্যে পার্থক্য দেখলে। আমরা সব সময় বেশি কালো দেখি তাই বর্ষাকালে একটু রং পরিবর্তন হয় বলে বুঝতে পারি না। মেয়র আইভী বিষয়টি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, ইচ্ছে করলে নদীর পানিও দূষণ মুক্ত রাখা যায়।

তিনি যে খালগুলো উদ্ধার করেছেন সেখানে বাহিরের দুষিত পানি আসতে দিচ্ছেন না বলে সে পানি পরিস্কার। তেমনি শীতলক্ষ্যায়ও যদি বিভিন্ন কারখানার বর্জ্যরে আউটলেটগুলো বন্ধ করা গেলে এখানকার পানিও পরিস্কার করা সম্ভব। ওয়ান ইলিভেনের সেনাবাহিনীর সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে কারখানাগুলোকে ইটিপি ছাড়া চালাতে দিবে না। অন্যদিকে এসব ডায়িংগুলোর বর্জ্যগুলো এক জায়গায় নিয়ে এসে একটি সেন্ট্রাল ইটিপি’র আওতায় এনে তা শোধন করে নদীতে ফেলা হবে। এতে করে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়ে যেত।এমই/জেসি


 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন