দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আকাঙ্খিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন । সর্বসাধারণের যানবাহন চলাচলের জন্য পদ্মা সেতু খুলে দেয়া হবে ২৫শে জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক উদ্বোধন ঘোষণার পর। তিনি মাওয়া প্রান্তে সুধী সমাবেশে অংশগ্রহণ শেষে টোল পরিশোধ করে পদ্মা সেতুর একটি ফলক উম্মোচন করে সেতু পথে যাবেন অন্য প্রান্তে। ফরিদপুরের জাজিরা প্রান্তে আরেকটি ফলক উম্মোচন করবেন। পরে মাদারিপুরের শিবচরে বিকালে এক বৃহত্তর জন সমাবেশে অংশগ্রহণ করবেন।
পদ্মা সেতুর কাজে অংশগ্রহণকারী সকল কর্মচারী কর্মকর্তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ছবি উঠাবেন। এই উপলক্ষ্যে সবাইকে পোশাক সরবরাহ করা হয়েছে। সবাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেতুর উপরে ছবি উঠাবেন। এসবই স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষিত হবে, শোভা পাবে পদ্মা সেতু জাদুঘরে। দেশী-বিদেশী সকলের জন্য পদ্মা সেতু জাদুঘর এক বিশেষ আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় জায়গা হবে। পদ্মা সেতু এলাকার প্রায় ২৩০০ প্রানীর নমুনা থাকবে পদ্মা সেতু জাদুঘরে।
বাংলাদেশ নিজের সক্ষমতায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ জয় করেছিল, দেশ স্বাধীন হয়েছিল। বিশ্ববাসী সবিস্ময়ে দেখেছিল একটি জাতির অভূতপূর্ব অভ্যুদয়। দুর্ধর্ষ, আধুনিক অস্ত্র-সমৃদ্ধ, সুপ্রশিক্ষিত, অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কৃষক, শ্রমিক, নিরক্ষর ছেলেমেয়েরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আহবানে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। সেই রকম সক্ষমতা আবারো অবাক হয়ে দেখল সারা দুনিয়া। সেতুর ইতিহাসে বাঙালি পদ্মা সেতু নির্মাণ করে তাক লাগিয়ে দিল। জগত জোড়া যোগাযোগ ব্যবস্থায় নিজেকে সংযুক্ত করে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো ।
পদ্মা সেতুর নির্মাণ পরিকল্পনা শুরু থেকেই নানান রকম গুজব ও ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তাজা রক্ত লাগবে, মানুষের মাথা লাগবে সেতু নির্মাণে, দূর্নীতির অভিযোগ তো ছিলই। তারই জের ধরে ২০০৮/২০০৯ সালে বিশ্ব ব্যাংক সেতু নির্মাণে প্রয়োজনীয় ঋণ দেয়া থেকে দুর্নীতির অজুহাত দেখিয়ে বিরত থাকে। বিশ্ব ব্যাংকের দেখাদেখি একই পথ অনুসরণ করে এডিবি, জাইকাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। মন্ত্রি, সচিব, উপদেষ্টাদের সরে যেতে হয় অভিযুক্ত হয়ে। কানাডার আদালতে মামলা হয়। বিশ্বব্যাংক তিন সদস্যের তদন্ত প্রতিনিধিদল পাঠায় বাংলাদেশে। শূন্য হাতে ফিরে গেলেও মামলা চলতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত কিছুই প্রমাণিত হয়নি আদালতেও। দেশের কিছু বুদ্ধিজীবি ও এনজিও বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ নেয়। বাংলাদেশের অক্ষমতাকেই সেই সময় তারা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন। কিন্তু এখন সবাই সুর পাল্টেছেন।
এই রকম প্রতিকুল পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হয় বাংলাদেশ সরকার। পাঁচটি প্রকল্পে বিভক্ত করে কাজের পরিকল্পনা করা হয়। প্রথম কাজ মূল সেতুর দুই দিকে অ্যাপ্রোচ সড়ক তৈরি। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লিমিটেডের মালয়েশিয়ান অংশীদারও সরে দাঁড়ায়, বিশ্ব ব্যাংক ঋণ না দেয়াতে।
তখন এককভাবে এই বাংলাদেশী কোম্পানি কাজ করতে এগিয়ে আসে। শত কোটির অভিজ্ঞতা আর অদম্য সাহস দিয়ে কাজ শুরু করে হাজার কোটির প্রকল্পে। আর্থিক সহযোগিতা দেয় যমুনা ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের উৎসাহে । পরবর্তীকালে চীন, কোরিয়ার বড় কোম্পানি পদ্মা সেতু নির্মাণে চুক্তিবদ্ধ হয়।
৪২টি পিলার এবং ৪১টি স্প্যান নিয়ে ৬.১৫ মিটার লম্বা এবং ১৮.১০ মিটার প্রস্থের পদ্মা সেতু বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা যায় ২০১৪ সালের ২৬শে নভেম্বর পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এর আগে ১৭ই জুন চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চার বছরের চুক্তি হয় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে।
কিন্তু পাইলিং জটিলতা, নদী ভাঙ্গন,করোনাসহ বিভিন্ন কারণে সেতু নির্মাণের সময়সীমা বাড়াতে হয়েছে ৩০শে জুন ২০২২ পর্যন্ত । কাজ শেষ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে আরো এক বছর। এই সময়ে সেতুর যে কোনো রকম কাজ এবং মেরামত এই কোম্পানি করবে । সেতুর টোল আদায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে কর্পোরেশন’ এবং ‘চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানী’ কে।আগামী পাঁচ বছর এই দুই কোম্পানি যৌথভাবে ৬৯৩ কোটি টাকায় সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ এবং টোল আদায়ের দায়িত্ব পালন করবে ।
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে চারিদিকে সাজসাজ রব । বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, আড়িয়াল খাঁ নদীর উপরে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে তিনটি সেতুতে উদ্বোধনের দিন টোল আদায় বন্ধ থাকবে। আগত যানবাহনের টোল ম্যানুয়ালি আদায় করতে গেলে ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হতে পারে । তা এড়ানোর জন্যই সেতু কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ।
পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সঙ্গে উত্তরপূর্ব অংশের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে । পণ্য পরিবহনের, যাতায়াতের সময় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে । কমবেশি ১০০ কিলোমিটারের মতো রাস্তা চলাচলের জন্য সংক্ষিপ্ত হবে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ অনেকাংশেই বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হবে । কৃষিজাত পণ্য পরিবহনে সময় কম লাগবে। তাছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা প্রাত্যহিক জীবন ব্যবস্থায় সুদুর প্রসারী প্রভাব পড়বে বলেই বিশেষজ্ঞ, পর্যবেক্ষক এবং সাধারণ মানুষের ধারণা ।
সাধারণ মানুষ মনে করে এখন আর ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় বসে থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছার আগেই রোগীর মৃত্যু হবে না। নিকট অতীতে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার জন্য ফেরি আটকে রাখা হয়। অসুস্থ রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ফেরি পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে সেই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পদ্মা সেতু এই রকম অবস্থা থেকে সাধারণ মানুষকে পরিত্রান দিবে।
পদ্মা সেতু নির্মাণে কারিগরি অনেক সমস্যা ছিল বলা হয়ে থাকে । দাবি করা হয় সবচেয়ে গভীর খরস্রোতা এই পদ্মা নদীতে সেতু নির্মাণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করা হলো । মূল সেতুতে ২৬৪টি পাইল রয়েছে। নদীর দুই প্রান্তে ও নদীর ভেতরে ৪০টি পিলারের নিচে পাইপের মত দেখতে পাইলগুলো বসানো হয়েছে। ভেতর ফাঁপা ৩ মিটার ব্যাসার্ধ ও ৬২ মিলিমিটার পুরু ইস্পাত দিয়ে নলের মত তৈরি পাইলগুলো ।
একেকটি পিলারের নিচে ৬ থেকে ৭ টি করে পাইল বসানো আছে। এ পাইল নদীর তলার মাটিস্তর থেকে সর্বাধিক ১২৫ দশমিক ৪৬ মিটার অর্থাৎ প্রায় ৪১২ ফুট গভীরে স্থাপিত হয়েছে। সহজ করে বলা যায় প্রায় ৪০ তলার সমান। প্রতিটি পাইল ৮২৫০ টন ভার বহন করতে সক্ষম । আবার প্রতিটি পিলার প্রায় ৫০ হাজার টন ভার বহন করতে পারবে।
আর ৪০০০ ডেড ওয়েট টনেজ সক্ষমতার জাহাজের ধাক্কাও সামলাতে পারবে এই সব পিলার। পাইল জটিলতায় কেটে গেছে অতিরিক্ত দুই বৎসর। এক পর্যায়ে দেখা যায় মাটির নিচে যেখানে পাইল শেষ করার কথা সেখানে নরম মাটি রয়েছে। পরে সবমিলিয়ে চৌদ্দটি পিলারের নিচে পাইলিং নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়। মূল সেতুর ২২টি পিলারের প্রতিটির নিচে ৭টি করে এবং ১৮টি পিলারের নীচে ৬টি করে পাইল বসানো হয় । দুই প্রান্তের দুটি পিলারে ১৬টি করে পাইল বসানো হয়। ৩১শে মার্চ ২০২০ সালে পাইল বসানোর সব নির্মাণকাজ শেষ হয়।
পদ্মা সেতু নির্মাণ সবদিক থেকেই ছিল চ্যালেঞ্জিং । খরস্রোতা পদ্মা নদী পৃথিবীতে অ্যামাজন নদীর প্রবাহের সঙ্গে একমাত্র তুলনীয়। পদ্মার পানি প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৪০ হাজার কিউসেক। সহজ করে কেউ কেউ বলেন পদ্মা নদীর জলধারার ৩০ সেকেন্ডে যে পরিমাণ পানি বয়ে যায়, তা ঢাকা শহরে একদিন ব্যবহার করা পানির সমান।
নদী ব্যবস্থাপনা সেতু নির্মাণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান অংশ। কারণ নদী যেন সেতুর পিলারের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় এই ব্যবস্থাটি নিশ্চিত না করলে বা করতে না পারলে দেখা যাবে সেতু এক জায়গায়, আর নদীর প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে অন্য জায়গা দিয়ে। এইসব কারিগরি খুঁটিনাটি বিষয় বিবেচনায় রেখে নদী ব্যবস্থাপনার কাজ করতে হয়েছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ।
আগামী ১০০ বছরের স্থায়ীত্বকাল বিবেচনা করে এই সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। দ্বিতল এই সেতুর প্রথম তলা দিয়ে যানবাহন চলাচল করবে । নিচের তলা দিয়ে ট্রেন চলাচল করবে । অর্থাৎ সড়কপথ ও রেলপথে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগ স্থাপিত হতে যাচ্ছে ২৫ তারিখ থেকে । যা আগে ছিল যানজট এবং প্রকৃতি নির্ভর। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের গর্বের নিদর্শন ।
পর্যটনের বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে পদ্মা সেতু। কলকাতা ভ্রমণে গেলে পর্যটকরা দুটো বিষয়ে অবাক হয়। একটি হাওড়া ব্রিজ অন্যটি টালা পানির ট্যাংক। কোন পিলার ছাড়া হুগলি নদীর উপরে ক্যান্টিলিভার দিয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য হাওড়া সেতু নির্মিত হয়েছে । ২৬০০০ টন লোহা কোনরকম নাট বল্টু ছাড়া শুধু রিভিট দিয়ে তৈরি এই সেতু ১৯৪৬ সালে চালু করা হয় । আরেকটি হচ্ছে টালা ওভারহেড পানির ট্যাংক।
পৃথিবীর মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনার বৃহত্তম একটি স্থাপনা, যার ধারণ ক্ষমতা ৯০ লক্ষ গ্যালন। ১৯১১ সালে এই ট্যাংকের পানি বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়ে এখনও চলমান ।
কয়েক লক্ষ গাছ কাটা পড়েছে জমি অধিগ্রহণের ফলে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সৌন্দর্য সাধনে এ পর্যন্ত প্রায় লাখ দেড়েক গাছ লাগানো হয়েছে। বাকি গাছ লাগানোর কাজ চলমান। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নত করার লক্ষ্যে।
এমনিভাবে এই পদ্মা সেতুও পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হবে । পৃথিবীতে তুলনামূলক ভাবে এমন সেতু খুব কম নির্মিত হয়েছে। সর্ববৃহৎ বিয়ারিং স্থাপন করা হয়েছে যাতে করে সেতুর নিজস্ব ভার বহন ক্ষমতা, ভূমিকম্প সহনশীলতা, বাতাসের চাপ, পানি প্রবাহের চাপ, যানবাহনের নিজ ভার এবং যানবাহনের গতির ভার বহন করতে সক্ষম হয়। এই সবকিছু হিসেবের মধ্যে নিয়ে সেতুর নকশা পরিকল্পনা করতে হয়েছে। ৪১৫টি বাতি দিয়ে সম্পূর্ণ সেতু সজ্জিত করা হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মানে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ছিলেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরি।
৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত জাতীয় গৌরবের এই সেতু নিয়ে সমগ্র দেশের মানুষের একাত্ম হয়ে যেখানে কথা বলা দরকার, বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে তা হয়ে উঠছে না । বরং ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’ এইরকম মনোভাব নিয়ে প্রতিদিনই একটা না একটা নেতিবাচক মন্তব্য সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক দাওয়াত পত্র গ্রহনেও কোনও কোনও দল অস্বীকার করছে বা অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অথচ এ গৌরব সকল বাংলাদেশীর।
কেবলমাত্র বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা বাস্তবসম্মত আচরণ নয়। ঈর্ষা অসূয়া প্রসূত মনোজাগতিক ভাবনা দিয়ে কখনই দেশ বা সমাজে ইতিবাচক অর্থবহ ভূমিকা পালন করা সম্ভব হয় না। যদ্দিন এই ভেদবুদ্ধির নিবারণ না হবে ততদিন সমাজ বিভক্ত আচরণের মাধ্যমে পশ্চাদমুখী হবে । বাস্তব সত্যকে স্বীকার করার মধ্যে গৌরব আছে, সাহস আছে, কল্যাণময় ইতিবাচকতা আছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অংশে বন্যা দেখা দিয়েছে। মানুষ ও পরিবেশ বিপর্যস্ত। এমন অবস্থায় উৎসবমুখর পরিবেশে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠান করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে । বন্যা দুর্গত মানুষের সংখ্যার পাশাপাশি সেতু চালু হলে যে পরিমান মানুষের যোগাযোগ সুবিধা নিশ্চিত হবে তা তুলনা করলে যত দ্রুত সম্ভব এই সেতু চালু করার গুরুত্ব খাটো করে দেখা যায় না।
এমনিতেই সেতু চালু করতে যথেষ্ট সময় চলে গেছে। তেমনি ভাবে বন্যা দুর্গত মানুষের বাস্তব অবস্থা কোনভাবেই অবহেলার যোগ্য নয় । বন্যা দুর্গত অঞ্চলে বানভাসি মানুষের দুরবস্থা লাঘবের জন্য সরকারি প্রশাসন এবং বেসরকারি পর্যায়ে কার্যক্রম চলছে । একটার জন্য আরেকটা বন্ধ করে দিতে হবে, থামিয়ে দিতে হবে, এই যুক্তি বাস্তবসম্মত নয় ।
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন জাতীয়ভাবে যতটুকু জাঁকজমকপূর্ণ উপায়ে পালন করা দরকার ছিল তা বন্যা বিপর্যস্ত দেশবাসীর কথা বিবেচনা করে সম্ভব নয় এবং হচ্ছেও না। আনুষ্ঠানিকতার জন্য সীমিত উদযাপনে যতটুকু আয়োজন দরকার তা না করাও কোন কার্যকর সমাধান নয়।
কেননা পদ্মা সেতু একবারই নির্মিত হয়, একবারই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করতে হয়। এমনিতেই করোনা এবং অন্যান্য কারণে নির্মাণ সময় দীর্ঘায়িত হয়েছে, খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে । তারপরও স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হতে যাচ্ছে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, পরিকল্পনা,প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে বিজয় ইত্যাদি।
দেশের আজ গর্বের দিন, একাট্টা হয়ে দৃঢ় মনোবল নিয়ে কাজ করলে যে কোনও কাজ করা বাঙালির পক্ষে সম্ভব। তলাবিহীন ঝুড়ির মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে, অনুন্নত দেশের সামনে অনুসরনীয় দিশারী হয়ে। বঙ্গবন্ধুর সেই বাক্য সত্যের ন্যায় অটুট,“এই দেশের মানুষকে দাবায় রাখতে পারবা না”।


