# দায়িত্ব অর্পণের তিন বছরেও আশানুরূপ সুফল মেলেনি
# ময়লা পানি সরবরাহ আগের থেকে অনেকটা কমেছে : নাসিক
নারায়ণগঞ্জবাসীর বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে ঢাকা ওয়াসা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে দায়িত্ব অর্পণের তিন বছরেও তেমন কোন সুফল মেলেনি। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য আরো বেশ কয়েকবছর অপেক্ষার আশঙ্কা করছে খোদ সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিরাই।
এদিকে বৃহস্পতিবার ঢাকা ওয়াসার পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আসছে সেপ্টেম্বর থেকেই এই বাড়তি বিল নেবে ঢাকা ওয়াসা। তবে নারায়ণগঞ্জে পানির দাম বাড়বে কিনা তা নিয়ে এখনো কিছুই জানায়নি নাসিক। ঢাকা ওয়াসার হিসেবে বাড়ানো দাম অনুসারে আবাসিক সংযোগে প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির দাম পড়ছে ১৫ টাকা ১৮ পয়সা। বাণিজ্যিক সংযোগে এই দাম ৪২টাকা।
তবে নারায়ণগঞ্জে বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র। ওয়াসা থেকে নাসিকে হস্তান্তর করার পরও তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। পানি পান করা তো দূরের কথা বাড়ির কাজে ব্যবহার করা যায় না ওয়াসার পানি। কালো পঁচা ও পানির দূর্গন্ধ এতোটা খারাপ অবস্থা কিছু না বলার মতো।
তার উপর আমরা পানি বলতে গেলে একেবারেই পাচ্ছি না যাও আসে আধা ঘন্টার মতো থাকে। শুধু এক আর দুদিন নয় বরং মাসের পর মাস চলছে এমন অবস্থা। অভিযোগ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। বাড়ির মালিক সরাসরি বলছে পছন্দ না হলে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে।
এভাবেই যুগের চিন্তুার কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন ওয়াসার গ্রাহক নারায়ণগঞ্জ শহরের গোয়ালপাড়া এলাকার বাসিন্দা শুক্কুরী বেগম ও রিনা বেগম তিনি আরো বলেন, শুধু আমাদের এখানেই না আশেপাশে যতগুলো এলাকা আছে সবাই এই ওয়াসার পানির কারণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
পানি ঠিক মতো সরবরাহ না করলেও বিলের জন্য ঠিক সময় মতো আসছেন তারা। ২০১৯ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাথে এক সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব অর্পণ করে ঢাকা ওয়াসা। চুক্তি অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকা নিয়ে গঠিত ওয়াসার মডস অঞ্চলের যন্ত্রপাতি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তখন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী আগামী দুইবছরের মধ্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের আশ্বাস দেন। তবে এখনও আশানুরূপ সুফল পায়নি নগরবাসী।
সিটি করপোরেশনে ২০১৯ এ দায়িত্ব অর্পণের আগেও ১৯৯০ সালের ১ জুলাই থেকে নারায়ণগঞ্জে ঢাকা ওয়াসা মডস জোন হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এর আগে সেখানকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার হাতে। নারায়ণগঞ্জ মডস জোন অঞ্চলে ওয়াসার ৩১টি নলকূপ,
৩২টি স্ট্রিট হাইড্রেন্ট, ৮টি ওভারহেড ট্যাংক রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে ওয়াসার দুটি পানি শোধনাগারও রয়েছে, যেগুলোর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা পাঁচ কোটি ৭০ লাখ লিটার। মডস জোনের বর্তমান লোকবল ১৬০ জন। এসব কর্মী আগামী এক বছর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে কাজ করছে। চুক্তি অনুসারে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ওয়াসার বকেয়া আদায় করে নিজস্ব তহবিলে জমা করে এবং ঢাকা ওয়াসার পানিবাহী গাড়ি আগামী এক বছর নিজেদের ব্যয়ে সিটি করপোরেশন ব্যবহার করছে।
এদিকে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওয়াসার পানি পাচ্ছেননা তারা কেউনা কেউ ওয়াসার মূল দফতরে রোজ অভিযোগ করছেন। পানির চাহিদা মিটাতে ভরসা করতে হচ্ছে গভীর নলকূপ কিংবা এলাকার স্থানীয় মসজিদ গুলোর পাম্পের উপর। প্রতিদিনই পানি নিতে সকাল-বিকাল ভিড় করছেন এলাকাবাসীরা। ওয়াসার পানিকে রান্নার কাজে ব্যবহার করতে ভরসা পাচ্ছেন না গৃহিনীরা।
পানিশোধনের পরেও সেই পানি পান করতে পারছেন না এমন প্রশ্নের জবাবে এক গ্রাহক অভিযোগ করে বলেন, যে পরিমানে ক্যামিক্যাল পানি পরিষ্কারে জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা সঠিক নয়। যদি ঠিক পরিমানে ক্যামিক্যাল ব্যবহার করতো তাহলে ওয়াসার পানিতে এতো ময়লা বা দূর্গন্ধ থাকতো না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহক বলেন, ওয়াসার পানিটা পরিশুদ্ধ না এছাড়া ওয়াসার পানিতে ছোট ছোট পোকা জাতীয় ময়লা আর্বজনা আসে। প্রচুর পরিমানে দুর্গন্ধ থাকে এই পানিতে যা পানের অযোগ্য। যে পাইপ দিয়ে পানি সরবরাহ করা হয় সে পাইপটা বেশ পুরানো। পাইপে জং থাকার কারণে পানি লাল লাল বের হয় এবং দলা দলা ময়লা আসে। তাই মানুষ ওয়াসার পানি ব্যবহার করে না।
পানি আমরা দৈনন্দিন জীবনে নানা কাজে ব্যবহার করি। দৈনিক যে সময় অনুযায়ী পানি দেওয়ার কথা তাও ঠিকমতো পাচ্ছি না । আমাদের এলাকাতে ওয়াসার পাম্প রয়েছে ঠিকই কিন্তু তাতে আর পানি আসছে না এমন অভিযোগ করেন পাইকপাড়ার এক গ্রাহক। ডন চেম্বারের এক ব্যাক্তি বলেন, আমাদের পরিবারে শুধু আমি আর আমার নাতি থাকি। যে পরিমানে আমরা পানি ব্যবহার করি তা অনুযায়ী বিলটা বেশি আসে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ওয়াসার দায়িত্বে থাকা সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা মো. মামুন যুগের চিন্তাকে জানান, পুরো নারায়ণগঞ্জ মিলে বর্তমানে আমাদের গ্রাহক আছেন ৩২ হাজার । তাদের মধ্যে অনেকে আমাদের থেকে অনুমোদন নেন আবার অনেকে নেন না। প্রতিদিন আমরা সাড়ে ১০ থেকে ১১ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে থাকি এবং প্রতি ইউনিটে (১ হাজার লিটার) ১৪ টাকা ৭৫ পয়সায় পানি সরবরাহ করে ওয়াসা।
তিনি আরো বলেন, যে পানিটা আমরা সরবরাহ করি তা ময়লা হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। তারা পানির লাইনটা মাটির নিচ বা ড্রেনের ভিতরে দিয়ে নেন ও ভালো করে কানেকশন দেন না এবং দক্ষ কর্মী দিয়ে কাজটা সম্পূর্ণ করায় না। আবার পাইপে কোথাও ছিদ্র থাকলে রাস্তার যে ময়লা পানি থাকে সেগুলো মিশে পাইপ দিয়ে ময়লা পানি বের হয়।
আমাদের এখানে ৩১টি পানির পাম্প রয়েছে এবং সব গুলো দিয়েই বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়। আমি মনে করি ময়লা পানি সরবরাহ আগের থেকে অনেকটা কমেছে। আশা করি আগামীতে আরো কমবে। তবে সবার কাছে আমার একটাই অনুরোধ আপনারা মাটির নিচ দিয়ে সচেতনভাবে লাইন টানবেন এবং দক্ষ কর্মী দিয়ে কাজ করাবেন।


