মেধার মত মানুষ ঘরে ঘরে গণ্ডায় গণ্ডায় জন্মায় না। মেধার আরাধ্য ছিল জগত, জগতের সমুদয় জীবন; কিন্তু নিজের জীবন নয় কিছুতেই। যদিও জীবনের শুরুতেই এক ধরনের বিপর্যয় চাক্ষুষ করতে হয়েছে সংখ্যালঘুর তকমা বহন করা জন্মের মধ্য দিয়ে। তারপরও সংখ্যালঘুর পরিচয় ছাপিয়ে নিজের পরিবার-পরিজন-প্রতিবেশি-পরিচিত-জন-মানুষসহ মানুষের মতোই বাঁচার চেষ্টা করছিল মেধার পরিবার । ৪৭ এর দেশভাগের পর এবং আরেকবার বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর স্বজন পরিজনের অনেকেই পাড়ি দিয়েছে ভারতে; ভাবখানা এরকম, আমি যাচ্ছি- তুমি কি যাবে অথবা আমরা গেলাম- তুমিও এসো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেধার বাবা চন্দন দাদা, মা, স্ত্রী এবং মেধা, মেধার বোনকে নিয়ে মাটি কামড়ে স্বদেশেই পড়েছিলেন। আমৃত্যু থেকে যাওয়ার ইচ্ছেও ছিল। কিন্তু সেই যে তকমাটা সংখ্যালঘু, তা একসময় এতটাই প্রকট পরাক্রান্ত আতঙ্কের জন্ম দিল যে, মলয় দাশ চন্দন নিজেকে আর নিজ বাসভূমে নিরাপদ মনে করলেন না।
যেখানে মেধা তার বোনের সঙ্গে, মা মাসির সঙ্গে, বাংলাদেশের জল হওয়ায় বেড়ে উঠছিল এক মানবিক চেতনার দ্বীপ অন্তরে ধারণ করে। তবে দীপ প্রজ্জ্বলিত হবার আগেই দেশান্তরে যেতে হল। সেখানেও বাতি জ্বালানোর কাজটি, মানুষকে মানুষ পরিচয়ে গরীয়ান করার মহৎ উদ্যোগ, জীবনকে জীবনের মত, প্রকৃতিকে প্রকৃতির মত, সময়কে সময়ের মতো, সবকিছুর সমন্বয়ে এগিয়ে যাবার প্রত্যয় থেকে কখনোই বিচ্যুত হয়নি। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম অন্যায়-অন্যায্য আচরণ যার নাম দেই আমরা দুর্ঘটনা। তেমন ঘটনায় বৃক্ষ-তরু-পল্লবের জীবন বাঁচাতে গিয়ে মেধার নিজের জীবন বিসর্জিত হল, সমর্পিত হল জগতের প্রকৃতির পদপাতে। অচিন্তিত, অনাকাঙ্ক্ষিত এই জীবন-বিসর্জন মেধার চলার গতি থামিয়ে দিল। চলমান বৃক্ষপ্রেমীর চির অবসান হল বৃক্ষের নিচে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর এমন ঘটনা বিশ্বে বিরল। এ যেন প্রকৃতির প্রতিশোধ কিন্তু ভুল প্রতিশোধ।
নারায়ণগঞ্জের মেয়ে মেধার বিরল মৃত্যুর সংবাদ ভাষ্যের অবিকল নিম্নরূপ: “গাছ বাঁচানোর গান গাইতে গাইতে গাছ চাপা পড়ে মৃত্যু গাছ বাঁচাতে গাছের জন্য গান গাইতে গাইতেই হঠাৎ করে গাছের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হল এক সংগীত শিল্পীর। আহত আরও বেশ কয়েকজন সংগীত শিল্পী। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার রাতে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাবরা থানার অন্তর্গত যশুর ঘোষপাড়া এলাকায়। বেলঘড়িয়া এলাকার বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী কিশোরী সৌমিতা দাস চৌধুরী সহ তাঁর একদল বন্ধু সংগীতশিল্পীরা এসেছিলেন গাছের জন্য গান করতে। আর হাবড়া থানার যশুর ঘোষপাড়া এলাকায় অ্যাডভোকেট গৌতম ঘোষের একটি বাগানকে বেছে নেয় তাঁরা। সেখানে গাছের জন্য অর্থাৎ গাছ বাঁচাতে করা হয়েছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন। শনিবার থেকে দুই দিনের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলেন তাঁরা। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের শেষ দিকে এসে মুহূর্তে ঘটে গেল দুর্ঘটনা। সৌমিতা দাস চৌধুরী যেখানে বসে ছিলেন ঠিক তাঁর পিছনে ছিল একটি নারকেল গাছ। নারকেল গাছটি আচমকাই উপড়ে গিয়ে পড়ে। ঠিক তখনই গাছের নিচে চাপা পড়েন সংগীত শিল্পী সৌমিতা দাস চৌধুরী সহ তাঁর বেশ কয়েক জন সঙ্গী। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সহকর্মীরা তাঁকে তড়িঘড়ি উদ্ধার করে নিয়ে আসেন হাবরা হাসপাতালে। সেখানের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। বাকি আহতদের আঘাত সামান্য থাকায় তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, গাছের গোড়া দুর্বল ছিল। তবে গাছটা ভালোই ছিল। হঠাৎ এভাবে গাছটা উপড়ে পড়বে সেটা কেউ বুঝতে পারেনি। কীভাবে হঠাৎ একটি গাছ উপড়ে পড়তে পারে? এর পিছনে অন্য কারোর যোগসাজোশ রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে হাবরা থানার পুলিস ” (সূত্র: Calcutta News.tv)।
এই সংবাদ জানার পরে বুকে, মনে বল পাইনি চন্দন দাদার সঙ্গে এতটুক কথা বলার। এখন পর্যন্ত মাসি বা কারো সঙ্গে কোনও কথা বলিনি। কয়েক সপ্তাহ আগে শুধু ছোট মাসির এক কাকা, হায়দারাবাদ নিবাসী তমাল দাদা , যার ওখানেই ছিলাম ওই যাত্রায় কয়েকদিন, তাঁর সঙ্গে মাসির মৃত্যু প্রসঙ্গে সামান্য আলাপ হয়। মনের জোর এখনও ফিরে পাইনি মেধার পরিবারের কারো সঙ্গে কথা বলার। না আছে কিছু সান্ত্বনা দেবার, না আছে অন্য কিছু বলবার। মেধাকে নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলবে, কিন্তু সে ত আর আমাদের মাঝে কিংবা তার বান্ধব স্বজনদের নিয়ে নতুন কর্মযজ্ঞে নামবে না অথবা পুরনো কাজ এগিয়ে নিতে সবার সঙ্গে হাত বাটবে না। প্রতিশ্রুতিশীল জীবন এইভাবে কেন শূন্যে মিলিয়ে যায় ! হাহাকার করেও যাকে ফেরানো দায়। আমরা বেঁচে আছি, আজ মেধার জন্য দুঃখ করছি, শোক তাপ জানাচ্ছি, তাতে মেধার কিছু কি যায় আসে ! সময়ের পলেস্তারায় আমরা একদিন অন্য মেধার জন্য শোক করব, এই মেধাকে হয়ত মনে করাই কষ্ট হয়ে যাবে। তাতেও মেধার কিছুই যাবে আসবে না। ভুলে যাওয়া মানুষের মানুষিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্য শুধু ভোলে না সন্তানের পরিবার, ভুলতে পারে না। মনের কোনে সময়ের প্রতি পলে মেধার শূন্যতা বয়ে বেড়াবে আজীবন ওর পরিবার । অনপনেয় চেতনার সংশ্লিষ্ট অভিঘাতে বার বার মেধা বস্তুত মননকে নাড়া দিয়ে যাবে নিখিলের বিরাট ব্যাপ্তিতে। হয়ত অথবা নয়।
ব্যতিক্রমী ছিল মেধা জীবনে, সংসারে। ব্যতিক্রমীই থাকলো মরণে। মেধার মৃত্যুর সময় যে সঙ্গীরা তাকে আবেষ্টন করেছিল তাদের কাছে জীবন মৃত্যুর মহিমা একরকম, আর আমাদের কাছে আরেক। মেধার আরাধ্য কর্মসূচি আন্তরিকভাবে অব্যাহত রাখলে বোধ করি তার প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান জানানো হবে। তার কাজ কিন্তু অসমাপ্ত বিবেচনা করা যাবেনা। তার অংশটুকু সে যথাযথরূপে পালন করেছে, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে ঘোষণা জানিয়ে গেল। মেধা আমার ছোট মাসি। মেধার দাদি আমার মাসি, সেই সূত্রে তার বড় বোন বড় মাসি আর সে ছোট মাসি। তার সঙ্গে খুব যে আলাপ হয়েছে এমন নয়। মূলত যে কয়দিন তাদের বাসায় ছিলাম, তাকে তার মত ব্যস্ত দেখেছি। টুকটাক দুয়েকটা কথাবার্তা হতো, নিবিড় করে কথা না বলার কষ্ট এখন অনুভব করি। তবে মেধা এবং তার পরিবারের মানবিক আবেদন সবসময়ই অনুভবের বিষয় ছিল । প্রকট প্রচারের কুন্ঠা তার পরিবারের সবাইকে মহত্ব দিয়েছে। তার পড়ালেখার বাইরে সামাজিক কাজকর্ম সম্পর্কে গভীর ধারণা ছিল না। ছিল ভাসা ভাসা।
আত্ম প্রচার বিমুখ চন্দন দাদা, মেধার বাবা, কখনো কখনো মেয়েদের সামাজিক ভূমিকার দু এক কথা, প্রসঙ্গ এলে বলতেন। তখন দেখতাম গভীর আবেগ-গর্বে তার চোখে আনন্দাশ্রু। চন্দন দাদা জীবনের শুরুতেই বাম ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। মানবিক মানুষ রূপে তার পরিবার তাকে গড়ে উঠতে সহায়তা করে। মাসি মা অর্থাৎ চন্দন দাদার মা রাজনীতির সুবাদে হয়ে ওঠেন প্রায় গণমাতা কিংবা গণমাসি। এপার বাংলা, ওপার বাংলা, দুই দিকেই চন্দন দাদার বহু অনুসারী, শুভানুধ্যায়ী আছে। মাসি, বৌদি এবং চন্দন দাদা তিনজন মিলে বড় মাসি, ছোট মাসিকে দীক্ষিত করেছেন মানবিকতার বিশুদ্ধ জল সিঞ্চনে। চন্দন দাদার বাসাবাড়ি আসলে অলিখিত আবাসিক হোটেল। বাংলাদেশ থেকে যারা কলকাতা যেতেন তাদের অধিকাংশের একমাত্র ঠিকানা হত তাদের ছোট্ট বাসা। ছোট আয়তনের বাসাখানি পরিবারের সদস্যদের উদারতায় এত বড় এবং স্বাচ্ছন্দ্যের আবাস হয়ে উঠত, যা শব্দ বাক্যে প্রকাশ করা আমার জন্য দুরূহ বটে। আমি যে কয়দিন ছিলাম আস্ত একটি কক্ষ আমাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। মাঝখানে হঠাৎ অসুস্থতা, তবু মনে হয়নি আমি বহিরাগত কেউ। ছিল না কোনও কমতি রোগীর সেবায়। এমন একটি পরিবারের মানবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মেধা জগতের মঙ্গলের জন্য, সকল প্রাণীর কল্যাণার্থে নিজেকে নিয়োজিত করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা সব মিলেমিশে গিয়েছিল প্রকৃতির কল্যাণ চেতনায়, জগতের মঙ্গল ভাবনায়। মেধার ২৩ তম জন্মদিনে ,মেধার স্বজন-বান্ধবেরা মিলে আয়োজন করে এক বিশেষ অনুষ্ঠান, যার নামকরণ করা হয়েছে “মেধাযাপন”।
২৯ আষাঢ় ১৪২৯ মোতাবেক ১৪ জুলাই ২০২২,পশ্চিমবঙ্গের বারাসাত জেলা পরিষদ ভবন, তিতুমীর সভাগৃহে মেধাযাপন মঞ্চের দ্বিতীয় আয়োজন ছিল। এই দিন মেধা স্মারক গ্রন্থ "মেধামন" এর উদ্বোধন হয়। পাশাপাশি নবম শ্রেণী থেকে স্নাতক স্তর পর্যন্ত ১০ জন মেধাবী,সহায়তাযোগ্য ছাত্রছাত্রীকে মাসিক বৃত্তিপ্রদানের শুভ উদ্বোধন হয়। ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,বীজ উৎসব এবং স্মৃতিচারণ। মেধা স্মারক গ্রন্থ ‘মেধামন’ এর প্রকাশ। গত মার্চে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা বৃক্ষ রোপন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়াও "গাছের জন্য গান" - এর সকল কর্মসূচি যথারীতি চলমান রাখার অঙ্গীকার ঘোষণা করেছে মেধার সংগঠন-সঙ্গীরা। যে গান গাইতে গিয়ে মেধার অকাল জীবনাবসান হয়। যদি তুলনা করে দেখা হয়, এই সময়ে মেধার সমবয়সীরা কি করে? হয়ত মোবাইল হাতে ফেসবুক, ইউটিউব অর্থাৎ ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আনাগোনা করে, সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে অনেকেই। চারপাশের বদলে যাওয়া পরিবেশে মানিয়ে নিতে নিজেকে নানাভাবে বিবর্তিত করে, সাজসজ্জায় ফ্যাশন দূরস্ত থাকে, হৈ-হুল্লোড়ে মাতে কিংবা মাতে বন্ধু বা একান্ত কোন বন্ধুর সঙ্গে ভবিষ্যৎ ভাবনায় ব্যস্ত সময় কাটায়। মেধা এর কোনটাই করেনি, সে ছিল সময়ের ব্যতিক্রমী সাহসী, উজ্জীবিত এক সন্তান। যে শুধু নিজের নয়, সামগ্রিকভাবে বন্ধুবান্ধব, স্বজন, সহপাঠী নিয়ে চেষ্টা করেছে জীবনের অসম্পূর্ণতাকে প্রকৃতির অংশে মিলিয়ে দিয়ে সম্পূরণ করতে। তার ত্যাগ অসামান্য, অতুলনীয়, অনুসরণীয়, উৎসাহ ব্যঞ্জক। ইন্টারনেট ব্যবহার করেও জগতের কল্যাণে প্রভূত ভূমিকা পালন সম্ভব, এটাও তার জীবন থেকে শেখা যায়।
দুঃখ পেয়েছি জেনে যে,‘মেধা যাপন’ উদ্যোগে আশানুরূপ সংবেদ তৈরি হতে না দেখে। স্মারক সংকলনের জন্য প্রয়োজনীয় লেখার অপ্রাপ্তি সংবাদ জানিয়ে ফেসবুকে আবারো জানান দেয়া বেদনাদায়ক। মেধার মৃত্যুর মত মৃত্যুই বুঝি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, অন্য কোনো মৃত্যু নয়। মেধার বাবার এক বন্ধু, নাসিম আফজাল, মেধার সঙ্গে তার কখনই দেখা হয়নি। আর কখনই দেখা হবেও না। এই না দেখা মেধার মৃত্যু সংবাদ তাকে এতটাই বেদনাহত করেছে যে, মেধার প্রসঙ্গ এলেই তার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল গড়াতে থাকে, আর তিনি হাউমাউ করে মেয়েটার জন্য শিশুর মত কাঁদতে থাকেন। আমরাও তার এমনধারা আচরণে অস্থির হয়ে উঠি। তাকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা হািরিয়ে ফেলি। তাই পারতপক্ষে আমি এখন তার সামনে মেধার কোনও প্রসঙ্গ আলোচনা করি না। অসাধারণ মেধা ও তার পরিবার চিরঞ্জীব। মেধার গৌরব বহন করে আমরা গর্বিত। আমাদের আশা,মেধা অবশ্যই চিরন্তন প্রেরণার উৎস হয়ে বেঁচে থাক। “সততার কোনও/ প্রার্থনা ঘর থাকে না;/ পূজ্য বাগান।/ লোকালয় কিংবা বনান্তর/ সমূহ সমান।/ শাঠ্যে-শঠতায়/আরাধনা মহান।”
তথাকথিত মহত্ত্বের আড়ালে মেধা যেন হারিয়ে না যায়।এমই/জেসি


