দুই সারিতে দাঁড়ানো পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্য, ডিসি,এসপি উপস্থিত। আছে সাধারণ জনগণ, অভিভাবক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক। জুতার মালা গলায় কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তার সঙ্গে পেছনে আছে এক ছাত্র। দুজন জোড় হাতে ক্ষমা চাইতে চাইতে উপস্থিত জমায়েতের মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেলেন। অপরাধের শাস্তি আদালতের দিতে হলো না। অপরাধী কিনা তাও যাচাই হলো না। কিন্তু বিচার হয়ে গেল। পুলিশ বাহিনী নীরব দর্শক, একজন শিক্ষকের চূড়ান্ত অপমানে সহায়ক শক্তি। অথচ এমন ঘটনা ঘটতে না দেয়ার দায়িত্বই বর্তায় পুলিশ, ডিসি, এসপির উপর। অনেক গুরুত্বপূর্ণ দরকারে পুলিশ বা জনবল সংকটের অজুহাতে দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার সংস্কৃতির মাঝে এমন ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার যোগ্য বটে। আবার যেখানে ছাত্র ও অধ্যক্ষ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের । তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ইসলাম ধর্মের অবমাননা বা অবমাননায় সমর্থন দেয়া। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার নিষেধ ধর্মে থাকলেও, কেউই তা মানতে তেমন আগ্রহী নয়। অনেকদিন আগের কথা, চিটাগাং শহর থেকে কক্সবাজার বাস যাত্রায় রাস্তার পাশে দেখা গেছে বিভিন্ন মাদ্রাসার সাইনবোর্ড। একটু পরপরই টিলার ঢালগুলোতে সাইনবোর্ডে যাত্রীদের নজর আটকে যেত। কিন্তু দৃষ্টিগোচর হতো না কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন, ঘর দুয়ার কিংবা দালানকোঠা। এমন কি কোনও জনবসতি বা দু‘চার ঘর বাসিন্দা বাস করে, আশেপাশে এমন কোনও নজিরও ছিল না। কিন্তু ছিল অসংখ্য সাইনবোর্ড। পরে একসময় জানা গেল পাহাড়ের উপরে টিলার মাঝে কিংবা জঙ্গলবেষ্টিত দুর্গম স্থানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব। মাদ্রাসা নামের আড়ালে সেখানে চলত নানারকম সন্ত্রাসী বা জঙ্গি প্রশিক্ষণ। নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায় আরও জানা গিয়েছিল যে, পদ্মা-যমুনার গহীন চরাঞ্চলেও ছিল জঙ্গি-প্রশিক্ষণ-তৎপরতার কেন্দ্র। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা ওইসব মাদ্রাসার নামের আড়ালে অপ তৎপরতা বন্ধ হয়। বন্ধ হয় মাদ্রাসা নামাঙ্কিত সাইনবোর্ড। এসবই ছিল প্রধানত ৯০ দশকের দিকের কথা।
দিন গেল, দশক গেল পাহাড়ের মাদ্রাসা উচ্ছেদ হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ল লোকালয়ে। প্রবাসে বসবাসের কারণে দেশের যে কোনও বদল হঠাৎ করে নজর চমকে দেয়। দেশে এলেই দেখা যেত দু‘দশ জন নারী রাস্তাঘাটে বোরকা পড়ে চলা ফেরা করছে। কারো গায়ে শোভা পেত মধ্যপ্রাচ্যের বোরকা। আরবি ভাষায় যা ‘আবায়া’ নামে পরিচিত। নজরে পড়ত কারো কারো সারা মুখ ঢাকা শুধু চোখ দুটো খোলা। আবার কেউ হয়তো সেই চোখের উপর আলগা পট্টির মত কাপড় মাথায় পেচিয়ে রাখত। মনে করতাম প্রবাসী স্বামী,ভাই,বাবা বা আত্মীয় পরিজনের দেয়া-আনা উপহার শখ করে পড়ছে। নতুন ফ্যাশন হিসেবে বাইরে বের হয়। সময় গড়িয়ে চলে, পরের বার ছুটিতে এসে দেখা মেলে হাত মোজা. পা মোজা আর চোখে পট্টি বাধা। রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে গিয়ে আবারও সেই সাইনবোর্ড। এবার দূর পাহাড়-জঙ্গলে নয়। খোদ শহরে, উপকন্ঠে,পাড়ায় মহল্লায়। ফ্লাট বাড়ি ভাড়া নিয়ে চালু করা হয়েছে মাদ্রাসা।
পরেরবার এসে দেখা, পাই মহিলা মাদ্রাসার সাইনবোর্ড। আস্তে আস্তে দেশের সর্বত্র,আনাচ-কানাচে গড়ে ওঠে তাক লাগানো ক্যাডেট স্টাইলের মাদ্রাসার সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপন। শব্দ-দূষণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে রিক্সায়, সিএনজি-স্কুটারে উচ্চ শব্দে বাজানো হয় ক্যাডেট মহিলা মাদ্রাসাসহ অন্যান্য মাদ্রাসার ভর্তির চটকদার বিজ্ঞাপন। প্রশাসনের, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই এই পরিবর্তন ব্যাপকভাবে দেখা গেল। জানা গেল না কে বা কারা এই সব প্রতিষ্ঠান দেখভাল করে বা কারা এই সব মাদ্রাসার অনুমোদন দেয়। প্রত্রিকার পাতায় খবর প্রকাশ হতে থাকল মাদ্রাসা শিক্ষক, সুপারিন্টেডেন্ট, ওস্তাদের সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের সম্পর্কের , নির্যাতনের, অত্যাচারের খবর এমনকি ব্যাভিচারের খবরও। সাধারণ মানুষের ধর্মভীরুতার সুযোগ নিয়ে এই সব ধর্ম ব্যবসায়ীরা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে চলল। নানারকম অপপ্রচার, অপর ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো হতে লাগল ধর্মীয় জলসা, অনুষ্ঠানের নামে-মাধ্যমে। যা খুশি তারা বলতে লাগল। অন্য ধর্মের কুৎসা রটনার মাধ্যমে উত্তেজনাকর কথাবার্তা সীমা ছড়িয়ে গেলেও কেউ কিছু বলল না। ফলে দেখা গেল করোনার দুর্যোগের সময় একজন ঘোষণাই করে বসলেন যে করোনার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। কোড নম্বর দিয়েছে এবং এও বলেছে যে, মুসলমানের কখনই করোনা হবে না।
তলে তলে সমাজ মানসের যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে তা বোধ করি আমাদের সমাজ-চিন্তকরাও অনুধাবন করতে পারেননি। কেননা ‘তাহাদের’ অপকর্মের পরিণতি কী হতে পারে, বিষয়টি গভীরভাবে কেউ ভাবেনি, এমনকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, কর্মকর্তারাও। তার ফলাফল এখন সরেজমিনে,মাঠে-ময়দান, ঘরে-বাইরে সর্বত্র, জীবনের সবক্ষেত্রে অশুভ ছায়ার বিস্তর ঘটিয়েছে।
যেমন দেখা যায়, কেউ একজন সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করে পোস্ট দিল। আর অমনি শত শত লোক একত্রিত হয়ে সেই ব্যক্তির সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িঘর ভাঙচুর লুটতরাজ করে আগুন লাগিয়ে দিল। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আগেই একটি জনগোষ্ঠী ব্যক্তির বদলে তার সম্প্রদায়কে আক্রমণ করে বসল। ফেইক বা বেনামী আইডি থেকে কেউ ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় তথাকথিত উত্তেজিত জনতা আইন কৌশলে নিজের হাতে তুলে নিয়ে সংখ্যালঘু সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি করল। পরে জানা যায়, অগ্নি সংযোগকারীদের মধ্য থেকেই একজন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান অর্থাৎ অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একজনের নাম ব্যবহার করে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। প্রতিশোধ হিসেবে উত্তেজিত জনতা অন্য ধর্মের উপাসনালয় ভাঙচুর করে। অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের ক্ষতিকরাও যে ধর্মীয় অবমাননা তা কেউ বিবেচনাই করে না। প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, সংখ্যা গুরুর ধর্মই শুধু অবমাননা হয়, সংখ্যালঘুর ধর্মের কোনও গুরুত্বই নাই।
তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি মন্তব্য প্রচারের পরপরই সংগঠিত একটি জনগোষ্ঠী সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়ে তথাকথিত অভিযোগকারী সম্প্রদায়ের উপর চড়াও হয়। সন্ত্রাসী তৎপরতার দ্বারা তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। এতে সমাজ বিজ্হানীরি নানা রকমের সমীকরণ খুঁজে পান। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু পরিবারের ক্ষতিপূরণ বা আতঙ্কের কোনও উপশম হয় না।
এই রকম পরিস্থিতিতে কিন্তু সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। প্রকারান্তরে এই নীরবতা, উশৃঙ্খলতাকেই উৎসাহিত করে, সমর্থন জানায়। কেননা শিক্ষায়, চিন্তায়, আচরণে, মননে অদৃশ্যভাবে সাম্প্রদায়িকতা জায়গা করে নিয়েছে। মুখে আমরা যতই অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলি কিন্তু মনে মনে অজান্তে হলেও তার বীজ লালন করি। সংগঠিত ভাবে প্রায়ই তা প্রকাশ্যে আসে। সমাজের এই অনাকাঙ্খিত পরিবর্তনের লাগাম টেনে ধরার সময় বিলম্বে হলেও অচিরেই শুরু করা দরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভাজ্য মানস গঠনের কুফল সম্পর্কে পাঠদান এখন সময়ের দাবী, অত্যাবশ্যকীয় বটে। অপচিন্তা, বিভেদচর্চা সমাজ মানস থেকে নির্মূল করা না হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যত সংকটাপন্ন। স্বাধীনতা অর্জনের সুফল হয়তো আরেকটি স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বার অর্জন করতে হতে পারে। এই সব বিবেচেনা থেকে আমাদের সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।এমই/জেসি


