# একটা পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে, জীবনের অনেকটা বছর কাটিয়েছে ইরানি বাড়ৈ। এই হাসপাতাল জুড়ে রয়েছে তার জীবনের নানা গল্প। আমরা তার সাথে যখন কথা বলতে গেলাম, তখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাকে এই কাজে উৎসাহ কে দিয়েছে? হুইল চেয়ারে বসা অবস্থায় তিনি মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, আমিই নিজেই।
৫৬ বছর বয়সী এই ইরানি বাড়ৈ যখন তার দুই পায়ের শক্তি হারান, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩০। সব প্রতিকূলতা পার করে জীবনে এগিয়ে গেছেন তিনি। তারও সাত বছর আগে বিয়ে করেছেন তিনি, তার দুটি সন্তানও রয়েছে। ঠিক তখনই এক রাতের জ্বরে আকস্মিক সবকিছু ভেঙ্গে যেতে বসেছিল। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। সব প্রতিকূলতাকে পাড়ি দিয়ে ফিরেছেন হাসপাতালে। হুইলচেয়ারে বসা জীবন নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন অসুস্থ রোগীদের। তিনি যখন সুস্থ ছিলেন তখন যেভাবে রোগিদেও সেবা দিতেন উনিশ বছর ধরে হুইলচেয়ারে বসে সেই সেবাই এখনো দিয়ে যেোচ্ছন তিনি। ইরানি বাড়ৈ আমাদের নিয়ে যান হাসপাতালের কোয়ার্টারে তার বাসায়। সেই বাসাতেই তিনি তার জীবনের গল্পগুলো শুনান। তিনি বললেন, রাতে যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন তিনি অনুভোব করলেন তার জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। তার হাত-পা নাড়াতে পারছিলেননা তিনি। তিনি যখন শয্যাশায়ী ছিলেন তখন সুস্থ জীবনে ফিরে আসার কথা তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার স্বামী দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলেন তাকে। বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে কেটে গেলো বছর খানেক। তার পিছনে নিয়মিত একজনকে লেগে থাকতে হতো। ছোট দুই মেয়েকে দেখার কেউ ছিল না।
এ রকম একটি সময়ে ভর্তির সুযোগ পান সাভারের (সিআরপি) পক্ষাঘাত পুর্নবাসন কেন্দ্রতে। কয়েক মাস পরই তিনি তার হাতে শক্তি ফিরে পান। ইরানি বাড়ৈ বলেন, আমি যেহেতু নার্স ছিলাম, তাই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় আমাকে সেই কাজটি করতে দেওয়া হলো। ওয়ার্ডে নার্স হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়ে ইরানি যেন ফিরে পেলেন নতুন করে বাচাঁর পথ। তাই আনন্দের সাথে কাজ করে গেলেন তিনি। তবে দুই পায়ের শক্তি ফিরে পেলো না। তিনি আরও বললেন, হাসপাতালে ফিরার পর অনেকে ভাবতো আমিও সেবা নিতে আসা রোগী। তখন নার্সের সংখ্যাও কম ছিল,হুইলচেয়ারে বসে আউটডোরে আসা রোগীদের দেখাশোনা করেছি।
দৈনন্দিন জীবনের সব কাজ করেন এই হুইলচেয়ারে বসেই। ইরানি বাড়ৈ এর একজন সহকর্মী বললেন, আমরা তার সুবিধার কথা ভেবে নিচতলায় ডায়রিয়া ওয়ার্ডে তাকে দায়িত্ব দিয়েছি। নার্সের কাজই ছিল ইরানি বাড়ৈ এর প্রানকেন্দ্রও মানুষের প্রতি ভালোবাসা। ওয়ার্ডে ঢুকেই একে একে সব রোগীদের খোঁজ নেন তিনি।
ইরানি বাড়ৈ এর জন্ম গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় উপজেলার বেতকাঠিয়া গ্রামে। অস্বচ্ছল পরিবারে আট ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে বাবাকে। তার স্বপ্ন ছিল উচ্চ শিক্ষার। জার্মান মিশনারি সিস্টার এল গা তখন ইরানিদের গ্রামে এসেছিলেন। সিস্টার এল গা তাকে সঙ্গে নিয়ে যান বরিশালের শান্তি কুঠির ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি মা ও শিশু হাসপাতালে। মিশনারি হাসপাতালে তত দিনে নার্সিং বিষয়টা বেশ উপভোগ করেছেন ইরানি। মানুষের সেবা করার এমন সুযোগ তিনি মনে মনে চেয়েছিলেন।
ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্সে ভর্তির সুযোগ পেলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। আবার চলে গেলেন শান্তি কুঠিরে কয়েক মাস কাজ করলেন সেখানে। এরই ফাঁকে সরকারি নার্সের জন্য পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ততদিনে বদলি হয়ে এসেছেন নারায়ণগঞ্জে। তার জীবনের বাকি গল্প এখানেই। তিনি তার শেষ কথায় বললেন, মানুষের সেবা করার স্বপ্নই আমি সারা জীবন লালন করে এসেছি। কয়েক বছর পর অবসর নিতে হবে। এরপর যেন মানুষের পাশে থাকতে পারি, তাই একটা পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।এমই/জেসি


