হত্যারকারীদের বাঁচাতে দুই জনপ্রতিনিধির দৌড়ঝাঁপ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২২, ০৬:৩৮ পিএম
# হত্যার ঘটনা মোড় ঘুরিয়ে দিতে প্রভাবশালীদের পাঁয়তারা
# আমার অনেক টাকা আছে, কিছু করতে পারবে না : আফজাল
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের কুঁড়েরপাড় এলাকায় ১৮ দিন আগে হত্যা করা হয় জালাল বেপারির ছেলে দিদার হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে। নিহত দিদারের পরিবারের অভিযোগ তাকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যার মূলে রয়েছে দিদারের মামাতো বোন তুলির সাথে পরকীয়া সম্পর্ক। তা জানতে পেরে তুলি, নিহত দিদারের মামা আফজাল, তুলির স্বামী উজ্জল, আফজালের স্ত্রী রোজিনা মিলে দিদারকে হত্যা করেছে বলে দাবী করেন ভুক্তভোগী নিহত দিদাদেরর স্ত্রী সুবর্ণা।
কিন্তু এই হত্যাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য কুঁড়েরপাড় এলাকার মাদবর কামাল হোসেন, সাবেক মেম্বার রুহুল আমিন সহ স্থানীয় শালিশের কয়েকজন ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ের মাধ্যমে চেষ্টা চালান। তাতে ব্যার্থ হয়ে দিদারের পরিবারকে ভয় দেখিয়ে মামলার এজহার থেকে আসামীদের নাম না দেয়ার জন্য বলেন।
অন্য দিকে আসামীরা ফেঁসে যেতে পারে বলে আফজাল গংদের বাচাঁতে রুহুল আমিন মেম্বার এবং বতর্মান মেম্বার রওশন আলী, কামাল মিলে টাকার বান্ডিল নিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করার জন্য মাঠে নেমেছে। এই হত্যকারীদের বিরুদ্ধে এর আগেও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। তখন তারা ধামাচাপা দিয়ে রক্ষা পায়। আর সেই সাহসেই এবার দিদারকে হত্যার করার সাহস পান বলে জানান এলাকাবাসী।
এলাকবাসী জানান, আফজালের মেয়ে এর আগেও পরকীয়া করে কয়েকটি সংসার নষ্ট করেছে। তাছাড়া তাদের অনেক টাকা থাকায় হত্যাকারীরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে নিরীহ মানুষদের নির্যাতন করে। তাদের শেল্টার দেন স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির লোকজন কামাল সহ প্রভাবশালী মহল। সেই সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি রওশন মেম্বার এবং সাবেক সাবেক মেম্বার রুহুল আমিনও মাঠে নেমেছে বলে জানান নিহতের পরিবার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানা, এই হত্যার মোড় ঘুরানোর জন্য স্থানীয় সালিশরা মিলে দিদারের পরিবারকে ভয় দেখান। সেই সাথে সালিশের মাঝে কামাল মাদবর সহ কয়েকজন ব্যক্তি নিহতর পিতাকে বলে তাদের টাকা পয়সা নেই তাই থানা প্রশাসন করতে অনেক টাকা লাগে। পুলিশকে খবর না দিয়ে বরং দ্রুত লাশ দাফন করে ফেলো।
থানা প্রশাসন করতে ২ লাখ টাকার বেশি লাগবে। তাই নিহতের পরিবার ভয় পেয়ে যায়, আর এজন্য তারা লাশ দাফনে সম্মতি দেন। এছাড়া এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য রওশন মেম্বারের ইট ভাটায় বৈঠক করা হয়। বৈঠকের পর জালাল বেপারিকে ৫ লাখ টাকা দেয়ার কথা বলে। কিন্তু তিনি তা মেনে নেন নাই।
অথচ রওশন মেম্বার তার নামে মিথ্যা ছড়িয়ে বলছেন জালাল বেপারি নাকি তার কাছে এসে একবার ৮ লাখ আবার ১০ লাখ টাকা চেয়েছে। তবে জালাল বেপারি জানান, তিনি কারো কাছে টাকা চান নাই। হত্যাকারীরা বাঁচার জন্য রক্ষা পেতে প্রভাশালী মহল দিয়ে এই কথা বলাচ্ছে।
এদিকে দিদার হত্যার অভিযুক্ত ব্যক্তি আফজাল বলেন, আমার অনেক টাকা আছে। আমারে কেউ কিছু করতে পারবে না। পরিবারের অভিযোগ তিনি টাকা দিয়ে তার বাঁচার জন্য বিভিন্ন জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করছে। প্রশাসনকে ম্যানেজ করার জন্য মোটা অংকের টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছে। তবে সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেন, একটা হত্যার ঘটনা নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সালিশকারীরা কি করে আপোষ করার সাহস পায়? তাদেরই বিচার করারই বা কতুটুকু এখতিয়ার আছে?
জানা যায়, ১ আগষ্ট সোমবার দুপুরে দিদারের লাশ পোস্টমর্টেম করার জন্য উত্তোলন করা হয়। এর আগে নিহত দিদারের স্ত্রী আদালতে লাশ পোস্টমর্টেম করার জন্য আবেদন করেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট কে এম ইশমামের উপস্থিতে পুলিশ দিদারের লাশ উত্তোলন করে ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করেন।
এসময় পুলিশ সূত্রে জানা যায়, লাশের সুরতহালে দেখা যায়, মাথায় পচন ধরেছে। সেই সাথে শরীরের অর্ধগলিত লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ দিদারকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর তার লাশ গুম করার জন্য নিহতের মামা আফজাল মিস্ত্রির বাড়ীর টিনশেড ঘরের কাঁড়ে লাশ রেখে দেয়া হয়। একই এই লাশ যেন গুমের ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা না হয় তার জন্য নিহতের লাশের পাশে ড্রাম রাখা হয়।
যাতে করে রাতের আধারে ড্রামে করে লাশ নিয়ে ফেলে রাখতে পারে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার বিচার বলে একটি কথা আছে। তার আগেই তারা ধরা পড়ে যায়। ১৭ জুলাই ক্রোকেরচর আফজাল মিস্ত্রির বাড়ীর ঘর থেকে দিদারের লাশ উদ্ধার করে ক্রোকেরচর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এই ঘটনায় দাফনের ৬ দিন পর ২৩ জুলায় নিহতের স্ত্রী সুবর্ণা খাতুন বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় অজ্ঞাত নামা আসামী করে ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় পেনাল কোডে মামলা হয়। যার মামলা নম্বর ১৯।
ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. এস কে ফরহাদ জানান, ‘বিচারাধীন অবস্থায় কোন তথ্য বলা যায় না। আরেকটি প্রশ্নের জবাবে জানান, এখানে কোন ভাইের টাকার বিনিময়ে রিপোর্ট তৈরী করা হয় না। ঘটনায় রিপোর্ট যা আসে তাই লেখা হয়।’
মামলার তদন্তকারী অফিসার এস আই আজাহারুল ইসলাম জানান, মামলার সঠিক তদন্ত ও মৃত্যুর কারণ জানার জন্য আদালতের নির্দেশে লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। ময়না তদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ময়না তদন্তের রিপোর্ট আসলে বিস্তারিত জানা যাবে। বাদীর কোন আসামী সন্দেহ থাকলে সে ক্ষেত্রে আমরা তা আমলে নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো। সেই সাথে এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত আছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। জেসি/এনএইচ


