Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

হেলফায়ার সমাচার ও জাওয়াহিরি

Icon

করীম রেজা

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২২, ০৮:৫৫ পিএম

হেলফায়ার সমাচার ও জাওয়াহিরি
Swapno

 

# হেলফায়ারের এর বাংলা হতে পারে নরকাগ্নি বা দোযখের আগুন

# বিস্ফোরকের পরিবর্তে ইস্পাতের চাকু ব্যবহার করা হয়েছে এই মিসাইলে

 

হেলফায়ার নিয়ে সংবাদ মাধ্যম এখন সরগরম। হেলফায়ারের এর বাংলা হতে পারে নরকাগ্নি বা দোযখের আগুন। হেলফায়ার আলোচনায় নরক গুলজার না হলেও বিন লাদেন এবং তার পরবর্তী আল কায়েদার উত্তরাধিকারী আল জাওয়াহিরির হত্যা নিয়ে লেখালেখি, সংবাদ বিশ্লেষণ হচ্ছে। চলবে আরও বেশ কিছুদিন।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দাবি অনুযায়ী হেলফায়ার মিসাইল দিয়ে আল জাওয়াহিরিকে হত্যা করা হয়েছে অনেকটা নীরবে, নিভৃতে। তাকে হত্যার পর স্বয়ং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই ঘোষণা দিয়েছেন। হেলফায়ার নামক সর্বাধুনিক মিসাইলের সুবিধা ব্যবহার করে, সুনির্দিষ্ট ভাবে আলজাওয়াহিরিকে হত্যা করা হয়েছে।

 

হেলফায়ার এমন একটি অস্ত্র যা নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম; আশেপাশে কোন ব্যক্তি বা বস্তুর উপর আঘাত না করেই। শব্দের গতির চেয়ে একটু কম গতিসম্পন্ন ৪৫ কেজি ওজনের এই মিসাইল। নিখুঁতভাবে প্রায় নিঃশব্দে আঘাত করতে পারার কারণে ইউএস আর্মির পছন্দের এবং অগ্রাধিকারের মারণাস্ত্র হিসেবে হেলফায়ার ব্যবহার হয়ে আসছে। লেজার নিয়ন্ত্রিত ৮ কেজি ওজনের ওয়রহেড বহন করতে পারে এই মিসাইল। দৈর্ঘ্য ১৬৩ সেন্টিমিটার বা ৬৪ ইঞ্চি। প্রায় ৮০০০ মিটার দূর থেকে লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত করে।

 

ইস্পাতের ঘুর্ণায়মান ব্লেড থাকার কারণে বাড়ির দেয়াল বা গাড়ির ছাদ সহজেই ফুটো করে প্রবেশ করতে পারে। ব্যালকনিতে দাঁড়ানো জাওয়াহিরি সেই তুলনায় ছিল অত্যন্ত সহজ টার্গেট। একটি ড্রোন থেকে মিসাইল ছুঁড়ে তাকে হত্যা করা হয়।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭২ সনে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সামরিক শক্তি মোকাবেলায় একটি উন্নত মানের আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল তৈরীর কাজ হাতে নেয়। এক দশক সময়ের মধ্যে এটির যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটায় । মার্কিন সেনাবাহিনীর চাহিদার প্রেক্ষিতে হেলিকপ্টার থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য একটি এন্টি ট্যাংক বিধ্বংসী মিসাইল রূপে প্রাথমিক ভাবে তৈরি করা হয়।

 

পরে আমেরিকান মেরিন ফোর্সও ১৯৭৮ সনে এই মিসাইল প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে। পরবর্তীকালে ব্যাপক উন্নতির ফলে ভূমি থেকে ভূমি, ছোট যানবাহন থেকে, আকাশ থেকে, নৌযান থেকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেয়া হয়। মিসাইলটি প্রাথমিকভাবে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করা হয়। ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি গাড়ি, বাড়ি, যেকোন রকম সাঁজোয়া যান, কম গতি সম্পন্ন হেলিকপ্টার অথবা উড়োজাহাজে আঘাত হানতে সক্ষম হয়।

 

১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ এই সময়ের মধ্যে হেলফায়ারের সফল পরীক্ষা শেষে ১৯৮২ তে উৎপাদন শুরু হয় । নানা রকম উন্নয়ন ঘটিয়ে এটা ১৯৮৫তে বিভিন্ন সংস্করণ তৈরি হয়। রোমিও, লঙবো প্রভৃতি নামকরণও করা হয়। ১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাসে সামরিক বাহিনীতে এর ব্যবহার শুরু হয়। প্রথমে এর নাম ছিল (“HELiborne, Laser, FIRE and Forget Missile” ) ‘হেলিবোর্ন, লেজার, ফায়ার এন্ড ফরগেট মিসাইল’ পরে প্রচলিত হেলফায়ার শব্দ ইউ এস সেনাবাহিনী অফিশিয়াল নাম হিসেবে গ্রহণ করে।

 

সর্বাধুনিক সংস্করণ যা আল জাওয়াহিরিকে হত্যার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তার বিশেষত্ব হচ্ছে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পূর্ব মুহূর্তে ছয়টি লম্বা ইস্পাতের ধারালো ব্লেড খুলে যায়, নিঃশব্দে লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত হানে। আশেপাশে কোন ব্যক্তি বা বস্তুর প্রায় ক্ষতি সাধন না করেই টার্গেটে পৌঁছাতে পারে, মানুষ কিংবা বস্তু যা-ই হোক। বিস্ফোরকের পরিবর্তে ইস্পাতের চাকু ব্যবহার করা হয়েছে এই মিসাইলে। সর্বাধুনিক সংস্করণ হচ্ছে আর৯এক্স।

 

এটি লক্ষ্যবস্তুর অতিকাছে প্রায় কয়েক ফুটের মধ্যে গিয়ে আঘাত হানে, ইংরেজিতে বলে ‘ডেঞ্জার ক্লোজ রেঞ্জ’ । প্রথম দিকে টার্গেটের সীমা ছিল ১০০ ফুট বিস্তৃত। এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই বোধ করি আদর করে এর নাম দেয়া হয়েছে নিনজা মিসাইল। আবার ফ্লাইং জিন্সু নামেও ডাকা হয়।

 

আড়াই কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা ছিল আল কায়েদার শীর্ষ নেতা আল জাওয়াহিরিকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য। কাবুলের একটি বাড়িতে মিসাইলের আঘাতে তাকে হত্যা করা হয়। এ পর্যন্ত অন্য কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর তিনি কাবুলে গোপন আস্তানায় বসবাস শুরু করেন। এর আগে তিনি থাকতেন হেলমান্দ শহরে।

 

জাওয়াহিরির আগে গোপনে এই অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যা করা হয়েছে ইয়েমেনে ২০১৯ জানুয়ারিতে, জামাল আহমেদ মোহাম্মদ আল বাদাওয়িকে। ২০০০ সনে ইউএসএস কোল জাহাজে বোমা হামলার মাস্টারমাইন্ড বলে মনে করা হয় তাকে। আল-কায়েদার অন্য এক শীর্ষ নেতা আবু খায়ের আল মাসরিকে ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সনে এই নিনজা মিসাইল দিয়ে সিরিয়ায় হত্যা করা হয়। অপর এক নেতা খালিদ আল আরুরী ২০২০ সালের জুন মাসে সিরিয়ায় এই আর৯এক্স আঘাতে নিহত হন।

 

আমেরিকার সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিভাগ এই মিসাইল ব্যবহার করে থাকে। যেমন সেনাবাহিনীর এ এইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার, ও এইচ-৫৮ কিওয়া ওয়ারিয়র, এ এইচ-১ ডব্লিউ সুপার কোবরা, এ এইচ-১ জেড ভাইপার, এম কিউ-১ সি গ্রে ঈগল ইউ এ এস এবং স্পেশাল অপারেশন্স এয়ারক্রাফট। নেভিতে ব্যবহার করে এসএইচ-৬০ বি/এইচ এইচ-৬০এইচ সিহক, মেরিন কর্পস ব্যবহার করে কেসি-১৩০জে ট্যাংকার এবং এ এইচ-১ ডব্লিউ সুপার কোবরা। এয়ার ফোর্স এর মধ্যে এম কিউ-১ প্রিডেটর এবং এম কিউ-৯ রিপার ইউ সি এ ভি।

 

উপমহাদেশের ভারত এবং পাকিস্তানের কাছেও এই অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র মজুদ রয়েছে। এই মারণাস্ত্রের একেকটির দাম সংস্করণ ভেদে প্রায় ১৫০,০০০ থেকে ২০০,০০০ লাখ ডলার । এছাড়াও এই অস্ত্র সংগ্রহের তালিকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে রয়েছে- অস্ট্রেলিয়া, বাহরাইন, ক্রোয়েশিয়া, ইজিপ্ট, ফ্রান্স, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, ইসরাইল, ইতালি, জর্দান, কুয়েত, লেবানন, নরওয়ে, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরাবিয়া, সিঙ্গাপুর, স্পেন, সুইডেন, তাইওয়ান, তিউনিসিয়া, ইউনাইটেড আরব আমিরাত, ইউনাইটেড কিংডম এবং ইউনাইটেড স্টেট।এসএম/জেসি
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন