Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

সংগ্রামী নারী লক্ষ্মী চক্রবর্তী

Icon

মেহেরীন জারা

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২২, ০৮:১৩ পিএম

সংগ্রামী নারী লক্ষ্মী চক্রবর্তী
Swapno


# নারী ও শিশু নির্যাতনের মত দুষ্কর্মকে প্রতিহত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে


 
বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম নারী সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। নারী ও পুরুষের সমতাভিত্তিক দেশও সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে একসূত্রে গাঁথার মাধ্যমে ১৯৭০ সালের ৪ঠা এপ্রিলে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই এই সংগঠনের আঞ্চলিক কমিটি হিসেবে গঠিত হয় নারায়ণগঞ্জ মহিলা পরিষদ। 

 

 

নারায়ণগঞ্জ মহিলা পরিষদের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হলেন বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা লক্ষ্মী চক্রবর্তী। মুক্তিযুদ্ধে যিনি ২নং সেক্টরে কাজ করেছেন এবং সেখানকার প্রধান ছিলেন খালেদ মোশারফ। জীবনের নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁর অনেক প্রাপ্তির সাথে সাথে অর্জন করেছেন অনেক অভিজ্ঞতা। নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রতি তাঁর আহ্বান, সকলে মিলে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও মিলেমিশে দেশকে গড়ে তুলে মানবতাকে জয় করা। দীর্ঘ ৫২ বছর যাবত তিনি নারায়ণগঞ্জ মহিলা পরিষদের সভাপতিত্ব করে আসছেন।

 


 
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বহু ঘটনার স্বাক্ষী এই লক্ষ্মী চক্রবর্তী বলেন, পাকিস্তান আমলে উনসত্তর এর গণঅভ্যূত্থানে এ দেশের ছাত্র-যুবক ও কৃষকরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তখন বাঙ্গালীরা শিক্ষা-দিক্ষা পুরোপুরিভাবে লাভ করতে পারছিলো না। পাকিস্তানি শাষকগোষ্ঠী বাঙ্গালি জাতিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার সুযোগও দেয়নি। 

 

 

এদেশের মানুষ তখন পুনরায় আন্দোলন শুরু করে এবং সেই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসর্কোস ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভার ডাক দেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সারাদেশের জনগণ, ছাত্র ও জনতা একত্রিত হয় এবং অসহযোগ আন্দোলন করতে থাকে। তারা তখন শ্লোগান দেয় ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, তারপর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেন। 

 

 

তখন এ দেশের ছাত্রসমাজসহ সর্বশ্রেণির মানুষ বিক্ষোভ করতে থাকে। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করে বহু শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করে এবং তাদের উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পাশবিক নির্যাতন চালায়। এরফলে সারা দেশের জনগন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।  নারায়ণগঞ্জ থেকেও আমরা এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হই। এখান থেকে ঢাকেশ্বরি কোয়ার্টারে বসবাস করতাম এবং ২৫ মার্চ রাতে মিলিটারিরা নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে তেলের পাম্প দখল করে নেয়। সে সময় সেখানে অবস্থিত মিলের অধিবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে জীবন বাঁচাতে কুমিল্লার দিকে অগ্রসর হন।

 

 
তিনি জানান, কুমিল্লার মধ্যে দিয়ে ভারতের আগরতলায় আমরা আশ্রয় নেই। প্রথমে বিশালগড় হাইস্কুলে আশ্রয় গ্রহণ করি। তখন সেখানকার মাঠ এমন লোকে লোকারণ্য হয় যে, তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। সেখান থেকে আমাদেরকে ভারতীয় সরকার শরণার্থী কার্ড প্রদান করেন। সেখান থেকে ট্রাকে করে আমাদেরকে সূর্য্যমনি নগর শরণার্থী ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তারা প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে ঘর প্রদান করেন। 

 

 

সেখানকার ক্যাম্পগুলো ছিল বাঁশের তৈরি। ক্যাম্পে জনগণের মধ্যে চাল-ডালসহ সকল প্রকার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস রিলিফ হিসেবে প্রদান করে এবং সেখানে তারা চিকিৎসায় সেবারও ব্যবস্থা রাখে। প্রতিটি পরিবারকে তারা কম্বলও বাসনপত্র দিয়ে সহযোগিতা করে। আমি শরণার্থী শিবির থেকে আমার বাবাকে নিয়ে আগরতলা শহরের জয়বাংলা অফিসে যাই। সেখানে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য নাম লিখাই। সেখানে মেয়েদের মধ্যে অনেকেই তালিকাভুক্ত হয়।

 

 

নারায়ণগঞ্জের খাজা মহিউদ্দিনের স্ত্রী ফরিদা আক্তারসহ আরো গুরুত্বপূর্ণ নারী নেত্রীগণ পরিচালনার কাজে লেগে যান। আমাদের সূর্য্যমনি নগরের পাশেই ছিল হাফানিয়া ক্যাম্প। যেখানে রাইফেল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার তরুণরা ট্রেনিংয়ের জন্য তৈরি হতে থাকে। আগরতলাতে যে ক্যাম্পগুলো আছে সেগুলো হলো কোনাবন ক্যাম্প, সূর্য্যমনি বনগর ক্যাম্প, আমতলী ক্যাম্প, বর্দো আলি ক্যাম্প, কাকড়া বনরানি ক্যাম্প, বিশাল গট ও উদয়পুর ক্যাম্প যেখানে বাংলাদেশের মানুষেরা আশ্রয় গ্রহণ করে।


 
আমাদের নামের তালিকা অনুযায়ী ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আগরতলা শহরের কুঞ্জবন এলাকায় গোবিন্দ বল্লব ডি.বি হাসপাতালে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সেখানে মেট্রোন ছিলেন একজন অবাঙ্গালী নারী। ঢাকা মেডিকেলের সিনিয়র নার্স রানি দি ছিলেন তার দায়িত্বে। হাসপাতালের সুপারইন্টেডেন্ট রথিন দত্ত সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। এই রথিন দত্তকে বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করেন। 

 

 

আমরা যখন ট্রেনিং নেই তখন আমাদের একটা অঙ্গীকার নামায় স্বাক্ষর করতে হয়। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ দলের সাথে আমাদেরও যেতে হয়। আমরা যখন হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় ছিলাম, তখন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা আহত মুক্তিযুদ্ধারা হাসপাতালে ভর্তি হন। সে কী মর্মান্তিক দৃশ্য! এটা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। 

 

 

এই মুক্তিযোদ্ধারা এমনভাবে আহত হয় যে, কারোর দু’হাত নেই, কারো দু’পা নেই, কারো পা এবং হাত নেই। এরা প্রত্যেকে বাড়ি থেকে প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলেন, দেশকে স্বাধীন করার জন্য জীবন দিয়ে যুদ্ধ করবেন। এ রকম দৃশ্য দেখে আমাদের পক্ষেও মানসিকভাবে ঠিক থাকার কথা ছিল না। আমাদের ট্রেনিং হওয়ার পরেও ১৬ই ডিসেম্বরে বিজয় অর্জন করার পরবর্তী মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা হাসপাতালের কাজে যুক্ত ছিলাম।

 


 এ সময় তিনি একটি বিশেষ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় ঘোষনার আগে ভারতীয় সেনা বাহিনী (মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী) একত্রিত হয়ে ঢাকা দখল করার আগমুহূর্তে কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টর্মেন্ট আক্রমণ করে। সেসময় পাকিস্তানি সেনা বাহিনী সেখানকার বাঙ্কারগুলোতে নারীদেরকে আটক করে রেখে দিনের পর দিন পাশবিক নিযার্তন করে। মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনী তাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করে  আগরতলায় জিবি হাসপাতালে নিয়ে যায় আমরা তখন কর্মরত ছিলাম। 

 

 

আমরা সেই ভয়াবহ চিত্র দেখলাম নারীদের পড়নে কোনো বস্ত্র ছিল না। ভারতের শিখ সেনাদের মাথায় পাগরি ছিড়ে মেয়েদেরকে কোনো রকম পরিধান করিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। নারীদের শরীর এত ক্ষতবিক্ষত ছিল যে, তা দেখে সহ্য করা যায় না। তাদের শরীরে অসংখ্য কামড়ের চিহ্ন, তাদের প্রায় অনেকেই উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। তাদের অনেকে নিজেদের নামও বলতে পারছিলেন না। 

 

 

এই অবস্থায় ডাক্তাররা তাদের সুুচিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই অবস্থায় দেশ বিজয় অর্জনের খবর যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন সারা আগরতলাতে আনন্দের মিছিল শুরু হয়। আমরাও সূর্য্যমনি নগর থেকে পরের দিন সকাল বেলা বিশাল মিছিল বের করে আগরতলা কংগ্রেস ভবনের সামনে সমাবেশে অংশগ্রহণ করি। আমাদের মিছিলে গানের টিম ছিল, নোয়াখালী অঞ্জলী দি নামে একজন দিদি গানের পরিচালনা করছিলেন। 

 

 

গান গাইছিলেন,‘ জয় বাংলা , বাংলার জয়।’ ‘আগে চল বাহিনী আগে চল, পিছে ভয় পিছে পড়ে রয়’। সমস্ত মিছিলটিতে জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত ছিল। আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গর্বিত। দেশের এই মহান কর্মের সাথে আমার ক্ষুদ্র্র প্রয়াস আমি অপরিসীম বলে মনে করি।
 
 

তিনি বলেন, বর্তমানে আমি বাংলাদেশে মহিলা পরিষদের কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। আমি মনে করি স্বাধীনতার ’৫২ বছর পরে এসে নারীদের এখনও মুক্ত করা যায়নি। এখনও প্রতিদিন নারীও শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আমরা মনে করি সামাজিকভাবে এ দুষ্কর্মকে প্রতিহত করার জন্য শুধু নারী আন্দোলনের কর্মীরাই নয়, এখানে সমাজের সকল ব্যাক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। একই সাথে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাকে জোড়দার করে মুক্ত মানুষে মুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। এন.এইচ/জেসি

 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন