লিফ্ট ব্যবস্থাপনার ভ্রান্ত চর্চা : ভোগান্তির একদিক
করীম রেজা
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২২, ০৪:৪৮ পিএম
সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের জীবন যাপন ব্যবস্থায় নানা রকমে-ধরনে পরিবর্তন এসেছে। বহুতল ভবন নির্মাণও অধুনা ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হতে পারে অফিস কিংবা আবাসিক অথবা সুপারমল বা মার্কেট সবই এখন বহুতল ভবন। এ সমস্ত ভবনের উচ্চতার কারণে অন্যতম দরকারী ব্যবস্থা লিফ্টের ব্যবহার।
প্রতিযোগিতামূলক দাম ও জনপ্রিয়তার কারনে অনুচ্চ ভবনেও আজকাল লিফ্ট ব্যবহার করতে দেখা যায়। আমাদের দেশে এখনও লিফ্ট ব্যবসা প্রধানত আমদানি নির্ভর। বিভিন্ন নির্মাতা কোম্পানীর এদেশীয় এজেন্টের মাধ্যমে বিদেশে তৈরী লিফ্ট বাজারজাত হচ্ছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, লিফ্টের ফ্লোর বোতামের সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের দালান ভবনের তলার কোনও মিলমিশ নাই।
যে কোনও তলায় পৌঁছাতে চাইলে লিফ্টের পরিচালক কম্পিউটারকে বোতাম টিপে বলতে হয়। যেমন পাঁচ তলায় যেতে চাইলে ৪ নম্বর বোতামে চাপ দিতে হবে। সিঁড়ি বেয়ে উঠলে যা ৫ম তলা, লিফ্টে চড়ে গেলে তাহাই ৪ তলা তথা ৪ নম্বর বোতাম তথা লিফ্টের ৪ তলা।
সাধারন হিসাবে লিফ্টের তলার সঙ্গে একটি অতিরিক্ত অদৃশ্য তলা-সংখ্যা যোগ করে নিতে হয় এই ক্ষেত্রে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন এই সংস্কৃতি আমাদের কাছে সহনীয় হবে এবং স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হবে। ভুল চর্চায় আমরা নিজেদের অজান্তেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ব।
কিন্তু আসলে হচ্ছে কি ? এতে আমাদের চিন্তা, স্মৃতি, বিবেচনা ইত্যাদি শারিরীক ও মানসিক প্রক্রিয়ার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, যা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। অদূর ভবিষ্যতে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এক রকমের নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে। বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি কি আমরা মনের অজান্তেই ডেকে আনছি, হয়ত। ভবিষ্যতে সামাজিক সংকটের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
তাছাড়া সাইনবোর্ড, ভিজিটিং কার্ড, বিজ্ঞাপন চিত্রে লিখে দিতে হয় অমুক তলা, লিফটের অত নম্বরে । মুখেও বারবার বলে বুঝিয়ে দিতে হয় যে, অমুক তলা মানে লিফটের অমুক তলা, অমুক নম্বরের বোতাম টিপতে হবে । এতে এক ধরণের অর্থনৈতিক অতিরিক্ত চাপের দিকও সামাজিক সমস্যার মত দিন দিন বাড়তে থাকবে। সমগ্র বিষয় পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আসলে বাড়ি বা ভবন মালিক এবং ব্যবসায়ী, এজেন্ট, সরবরাহকারী সবাই কোনও কারণে এই বিষয়ে উদাসীন আচরণ করছে।
কিন্তু কেন হচ্ছে এমন ? মূলত এই অব্যবস্থার জন্য প্রধানত দুই পক্ষের দায় আছে; ভোক্তা এবং সরবরাহকারী। ভোক্তা অর্থাৎ ভবনের মালিক জানেন না সরবরাহকারীকে কিভাবে দরকারের কথা বলতে হবে। অন্যদিকে সরবরাহকারী ভোক্তার দরকার মতো কাস্টমাইজ করার সুবিধার কথা গোপন রেখে কোম্পানীর সরবরাহ করা পন্য ক্রেতাকে গছিয়ে দিচ্ছে।
ভোক্তার তুলনায় কোম্পানীর এজেন্ট বা সরবরাহকারীর দায় বেশি। হতে পারে যেন তেন প্রকারে ব্যবসা করে যাওয়া মুখ্য উদ্দেশ্য, তাই দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং কাস্টমাইজ করে না। এই বিষয়ে তারা অজ্ঞ, কিছু জানে না, এমন ধারনা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কেননা, প্রস্তুতকারক কোম্পানী তাদের এজেন্টের কাছে সবরকম অপশনের বিস্তৃত তথ্য দিয়ে থাকে।
ব্যবসা বিস্তারের জন্য, প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় এগিয়ে থাকার জন্য এসবই ব্যবসার অপরিহার্য শর্ত। দেশীয় সরবরাহকারীর অবহেলার জন্যই ভোক্তা পর্যায়ে বা লিফ্ট ক্রেতা সব বিষয় জানতে পারেন না।
লিফ্ট কেনার অর্ডার দেয়ার সময় বিক্রেতা বা সরবরাহকারীকে বলে দিলেই তারা দেশের প্রচলিত সংস্কৃতি অনুযায়ী ভবনের তলা সংখ্যার সঙ্গে মিল রেখেই লিফ্ট চালনার বোতামসমূহ প্রোগ্রামিং করে দিতে পারে বা দিতে বাধ্য।
ঢাকা শহর, নারায়ণগঞ্জ বা এর আশেপাশে তথা সারা দেশে সরকারী, বেসরকারী সব ভবনের লিফ্ট ব্যবহারে সবাইকে এই দ্বৈত ব্যবস্থার মুখোমুখী হতে হয়। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সচেতনতা এই পরিস্থিতি উত্তরণের একমাত্র উপায় হতে পারে। এন.এইচ/জেসি


