বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষে রণক্ষেত্র নারায়ণগঞ্জ শহর
রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:২৫ পিএম
# বিএনপি বলছে নিহত যুবক যুবদল কর্মী
# আওয়ামীলীগ বলছে নিহত যুবক আ’লীগ নেতার ভাতিজা
# পুলিশ বলছে নিহত যুবক গুলিতে নিহত হয়েছে কিনা তদন্ত হচ্ছে
গত মাস কয়েক আগে থেকে নানা ইস্যুতে বিভিন্ন দাবী আদায়ে আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠে দেশের প্রধান বিরোধী দল জাতীয়তাবাদী দল নারায়ণগঞ্জ বিএনপি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ জেলা মহানগর বিএনপির শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে র্যালী বের করার প্রস্তুতি নেন। র্যালী উপলক্ষে সকাল ১০ টা থেকে জেলার বিভিন্ন থানা থেকে নেতৃবৃন্দ বিশাল বড় মিছিল নিয়ে নগরীর ২ নম্বর রেলগেট সংলগ্ম চুনকা পাঠাগারের সামনে জরো হন। সকাল সাড়ে দশটায় চুনকা পাঠাগারের সামনে থেকে জেলা মহানগর র্যালী শুরু করেন ঠিক তখন জেলা পুলিশ বিএনপি নেতা কর্মীদের র্যালী না করার জন্য বাধা প্রদান করেন।
তার আগে জেলা মহানগর নেতৃবৃন্দকে রাস্তায় না নামার জন্য বলেন পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু র্যালীর শুরুতে ছিলেন মহানগর বিএনপি। চুনকা পাঠাগার থেকে ২ নম্বর রেলগেট চত্বরে যাওয়া মাত্র পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে। পরে বিএনপি নেতা কর্মীরা ক্ষুব্দ হয়ে পাল্টা পুলিশের উপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশও বিএনপি নেতা কর্মীদের উপর টিয়ারসেল, গুলি ছুড়েন। সেই সাথে তারাও পাল্টা ইট পাটকেল মারেন। ঘন্টা দেরেক পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এদিকে এই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ বিএনপি পুলিশের প্রায় দেড় ঘন্টা কয়েক দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। জানাযায় পুলিশের গুলিতে বিএনপির এক কর্মী নিহত হন। নিহতরা হলেন, এনায়েত নগর ইউনিয়নের ছাত্রদল কর্মী মাহমুদ শাওন। নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাজমুল হোসেন বিপুল বলেন, শাওন প্রধান নামের ২০ বছর বয়সী ওই যুবকের বুকে ‘গুলির চিহ্ন’ রয়েছে। “হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া আরও ২০ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ‘নিহত শাওন ফতুল্লার পঞ্চবটি নবীনগর এলাকার মৃত সাহেব আলীর ছেলে। তিনি যুবদলের কর্মী বলে দাবি করেছেন বিএনপির নেতারা’। তবে আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে নিহত শাওন সেখানকার এক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা শওকত আলীর ভাতিজা।
তবে বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে পুলিশের সংর্ঘষের ঘটনায় নিহত যুবক যুবদলের কর্মী নয় বলে দাবি করেছেন নারায়ণগঞ্জের নবাগত পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল। তার দাবি নিহত যুবক শাওন একটি গ্যারেজে কাজ করে। সে গ্যারেজের কিছু মালামাল ক্রয় করার জন্য শহরে এসেছিলো। তবে সে গুলিতে নাকি অন্য কোন কিছুর আঘাতে নিহত হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করছে।
এদিকে সংর্ঘষের ঘটনায় গুরুতর অবস্থায় তোলারাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক ফারুক খান সুজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মুমূর্ষূ অবস্থায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে সকালে সংঘর্ষের সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাশেই মর্গ্যান স্কুলে পরীক্ষা দেওয়া অবস্থায় টিয়ারশেলের গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়লে ছয়জন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানান চিকিৎসক নাজমুল।
এদিকে এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) মোহাম্মদ নাজমুল হাসান জানায়, এই সংঘর্ষের ঘটনায় দুইটি মামলা হয়েছে এর মধ্যে একটি প্রক্রিয়াধীন। এ ঘটনায় যে নিহত হয়েছে তার ভাই বাদী হয়ে কয়েকজনকে অজ্ঞাত করে একটি মামলা করেছে। এই সংঘর্ষে পুলিশকে আহতের ঘটনায় মামলাটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরও জানান, এই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সদর থানা ও ফতুল্লা মডেল থানায় পুলিশের হাতে বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে। এ ধরণের ঘটনা এড়াতে আমার মনিটরিং করছি আমরা এলার্ট আছি।
এরআগে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ায় পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়ক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বৃহস্পতিবার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়কের ২ নম্বর রেলগেট, মন্ডলপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিক, বিএনপি ছাত্রদল যুবদলের শতাধিক গুলিবিদ্ধ ও মারাত্মক আহত হন।
জানা যায়, বেলা সাড়ে ১০ টার দিকে জেলার শহরের ২ নম্বর রেলগেট সংলগ্ম আলী আহম্মদ চুনকা পাঠাগারের সামনে জেলা মহানগর বিএনপি সম্মিলিত ভাবে র্যালী বের করেন। এরপর র্যালী নিয়ে রাস্তায় বের হলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
পুলিশও লাঠিচার্জ, টিয়ারসেল, রাবার বুলেট সহ গুলি ছুড়েন। এতে সমাবেশে দুই ছাত্র দল কর্মী নিহত হন। একই সাথে শতাধিক নেতা কর্মী আহত হন। আহতদের নারায়ণগঞ্জ জেনারেল ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতাল ও খানপুর ৩শ’ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়। এদিকে পুলিশের টিয়ারসেলে বিএনপি নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় মর্গ্যান স্কুলের ছাত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে।
জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক মনিরুল ইসলাম রবি জানান, আমাদের এনায়েতনগর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্রদল নেতা শাওন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। আমাদের জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি রাকিব রাজসহ দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন শতাধিক। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শান্তিপূর্ণ র্যালীতে বিনা উস্কানিতে পুলিশ বাধা দিয়েছে ও গুলি চালিয়েছে। অথচ আমরা অনুমতি নিয়েই কর্মসূচি করছিলাম। পুলিশ সরকারি দলের পক্ষ হয়ে আমাদের উপর হামলা চালিয়েছে।
মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি এড. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে আমাদের প্রতিষ্ঠাবাষির্কীতে একটি র্যালি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ আমাদের তা করতে দেয়নি। পাকিস্তানের কালো রাত্রিতে যে ভাবে নিরস্ত্র বাঙালীদের উপর হামলা করা হয় পুলিশ বাহিনীও একই কায়দায় আমাদের উপর এবং নেতা কর্মীদের উপর গুলি ছুড়েন। পুলিশের রিভাল ভাড়ের গুলিতে যুবদল নেতা নিহত হয়। তাদের এই আচরণ আইন সঙ্গত নয়।
তিনি জানান তারা প্রথম আমাদের উপর লাঠি চার্জ করেছে। পরবর্তীতে আমাদের উপর গুলিবর্ষণ করা হয়। ছিটাগুলির কয়েকটা গুলি আমার গায়ে লেগেছে। আমি হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় অবস্থান করছি। আমি পুলিশের এই ন্যাক্কার জনক কর্মকান্ডের জন্য তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবী জানাই। সেই সাথে যারা নিহত হয়েছে তাদের হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।তিনি আরও বলেন, আমাদের যুবদলের এক নেতা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তিনিও আজ বিশাল মিছিল নিয়ে র্যালিতে যোগদান করেছে। এই ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। আমরা এই ঘটনার তিব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
মহানগর বিএনপি নেতা হান্নান মামুন বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শান্তিপুর্ণ ভাবে পালন করছি অথচ পুলিশ প্রশাসন আমাদের শান্তিপূর্ণ র্যালীকে গুলি ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করেন। আমরা তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবী জানাই। এই ভাবে একটা দেশ চলতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি মানুষ নিজের মত করে মত প্রকাশ করবে এটাই স্বাভাবিক। আর আজকে আমাদের কোন সরকার বিরোধী কর্মসূচি ছিল না। তার পরেও তারা আমদের উপর গুলি ছুড়েন। পুলিশের গুলিতে শতাধিক নেতা কর্মী আহত সহ একজন নিহত হয়। তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবী জানাই।
জেলা যুবদলের সদ্যস্য সচিব মশিউর রহমান রনি জানান, ‘শাওন সকালে এনায়েত নগর এলাকা থেকে কর্মসূচিতে যায় মিছিল নিয়ে। সেখানে কর্মসূচিতে পুলিশ আক্রমণ চালিয়েছে। পুলিশের হাতে গুলিবৃদ্ধ হয়ে শাওন মারা যায়।
সংঘর্ষের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার গোলাম মোহাম্মদ রাসেল জানান, ‘তারা কোনো ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়াই সড়ক অবরোধ করে কর্মসূচি পালন করছিলেন। তাতে বাধা দিলে পুলিশের ওপর চড়াও হয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।’ এ সময় বেশ কয়েকটি ককটেল ফাটানো হয় দাবি করে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার শেল ছোড়ে।’ সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের অন্তত ১৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে পাঁচ জনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।
এদিকে সংঘর্ষের সময় পুলিশের ছোঁড়া টিয়ার সেলের ধোঁয়ায় ১০/১৫ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সংঘর্ষ লাগার পর অন্তত চারঘন্টা শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে যানচলাচল বন্ধ থাকে। শহরে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করে। সংঘর্ষের ঘটনায় মহানগর বিএনপির সহসভাপতি এড.সাখাওয়াত হোসেন খান, জেলা ছাত্রদল সহ-সভাপতি সাগর সিদ্দিকী, রূপগঞ্জ থানা ছাত্রদল নেতা সুলতান, বিএনপি নেতা কবীর শেখ, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সদস্য সাদেক হোসেন, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি, ফরিদ হোসেন সিকদারসহ বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংঘর্ষের ঘটনার পরপর বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য এড.আনিসুর রহমান দিপুর নেতৃত্বে জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম আরাফতসহ বেশ কয়েকজন প্রতিরোধ মিছিল বের করে। বর্তমানে শহরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।


