তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন বাছাই
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:১৭ পিএম
# প্রবীণদের মূল্যায়ন পরীক্ষা আজ, মনোনয়ন বোর্ডে সিদ্ধান্ত
আওয়ামী লীগের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ। তবে সময়ের সাথে সাথে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের জৌলুস কমেছে। আওয়ামী লীগের আতুঁরঘরে অবস্থান করে নিয়েছে জাতীয় পার্টি। জাতীয় রাজনীতির জটিল সমীকরণে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের মধ্যে দুটিই জাতীয় পার্টির দখলে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত সৈনিকরা তাই শত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও জেলায় নানা অবস্থানে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ কমই পেয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে ইতিমধ্যে সারাদেশে জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য ১০ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যাদের অধিকাংশেরই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সার্ভিস দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর মনোনয়ন পত্র জমা দেয়া শেষে আজ ১০ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের জন্য মনোনিত প্রার্থী মনোনয়ন বোর্ডে চূড়ান্ত করবে আওয়ামী লীগ।
মনোনয়ন বোর্ডের আজকের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ১০ জন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বাচ্চু, আরজু রহমান ভূঁইয়া, সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদল,
মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা, সহসভাপতি বাবু চন্দনশীল, জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি মতিন মাষ্টার, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব মজিবুর রহমান, স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) রকিবউদ্দিন রকিব। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন।
বিএনপি জেলা পরিষদ নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে আওয়ামী লীগের মনোনয়নই আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জন্য চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা। আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়া হলে কেউ বিদ্রোহী হলে তখন জেলার সকল জনপ্রতিনিধিদের ৬১৫ ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হতে পারে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে। কিন্তু আপাত অবস্থায় মনে করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে জয়ী হবেন।
আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে সত্তরের দশকের নেতা যেমন রয়েছেন, তেমনি আশির দশকের নেতারাও এবার জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছেন। জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন সত্তরের দশকের শুরুর দিকের নেতা আবদুল হাই। তিনি পুরষ্কারও পেয়েছেন নানাভাবে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিও করা হয়েছিল তাকে। তবে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর কমিটি বাণিজ্য, পদ বাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারিতার কারণে আবদুল হাইয়ের গ্রহণযোগ্যতা এখন তলানীতে।
এছাড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় নানা অনিয়ম থাকায় জেলা পরিষদ নির্বাচনে তার গ্রহণযোগ্যতা নিচের দিকে। তবে আবদুল হাইয়ের বন্ধু হিসেবে পরিচিত বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বাচ্চুকে এবারের জেলা পরিষদ নির্বাচনে অন্যান্য প্রার্থীর তুলনায় এগিয়ে রাখা হচ্ছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৯নং সেক্টরে খুলনা জেলার দাকোপ থানার বাজুয়া বাজারে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের যুদ্ধকালীন কমান্ডার ছিলেন। তার বীরত্বের স্বাক্ষী হিসেবে পশ্চিম বঙ্গের বসিরহাট জেলার বাগুন্ডিতে যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়।
এই স্মৃতিফলকের পাশের দেয়ালে বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বাচ্চুর নাম ৩ নম্বরে খোদাই করা আছে। মিজানুর রহমান বাচ্চু এর আগে ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আওয়ামী লীগের এই ত্যাগী নেতাকে জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনিত করলে জেলা পরিষদের সুশ্রী বৃ্িদ্ধ পাবে বলে মত রাজনৈতিক বোদ্ধাদের। তারা বলছেন, আবদুল হাইকে জেলার বেশিরভাগ এমপি, মেয়র বিশ্বাস করতে পারেননা। অন্যদিকে জেলার সকল এমপি, মেয়রের সাথে দুরুত্ব কমিয়ে এনে সুন্দর সম্পর্ক মিজানুর রহমান বাচ্চুর। আর যার ফলে এবার জেলা পরিষদ নির্বাচনে মিজানুর রহমান বাচ্চুকে বেছে নিতে পারে কেন্দ্র।
এদিকে জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রশাসক আনোয়ার হোসেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে আছেন। ছাত্রবস্থা থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত আনোয়ার হোসেন সারাদেশে আওয়ামী লীগের ক্লিন ইমেজের নেতা হিসেবেই পরিচিত। একেএম শামসুজ্জোহা এবং আলী আহাম্মদ চুনকা দুই নেতার সাথেই সুন্দর সম্পর্ক ছিলো আনোয়ার হোসেনের। বর্তমানে নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সাথে ভালো সম্পর্ক থাকলেও শামীম ওসমানের সাথের সম্পর্কটাও ততটা খারাপ নয়।
ভাবা হচ্ছে, এবার জেলা পরিষদ নির্বাচনে রাজনীতিতে সিনিয়র মিজানুর রহমান বাচ্চুর সাথে মূল প্রতিযোগিতাটা হবে আনোয়ার হোসেনের। তবে আনোয়ার হোসেনের প্রায় সমসাময়িক আরো এক রাজনীতিক জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আরজু রহমান ভুুঁইয়া। তোলারাম কলেজের ভিপি ছিলেন তিনি। রয়েছেন আওয়ামী লীগের পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসন। ছাত্রলীগ, যুবলীগ করে বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আরজু রহমান ভূঁইয়াও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের চেয়ারের যোগ্য দাবিদার।
এদিকে গত কয়েক বছর ধরেই জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কেনার নিয়মিত মানুষ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের তিন বন্ধু জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মো.বাদল, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা এবং সহসভাপতি বাবু চন্দনশীল। এরমধ্যে আবু হাসনাত শহীদ মো বাদল তিনবার তোলারাম কলেজের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন। খোকন সাহা এবং বাবু চন্দনশীলেরও আওয়ামী লীগের জন্য ত্যাগ কম নয়। তবে তাদের চাইতে সিনিয়র নেতাদের এবার মূল্যায়ন করতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক বোদ্ধা মহল।
এদিকে জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি আবদুুল মতিন মাষ্টার আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে চমক দিয়েছেন। রাজনীতিতে একেবারে নীরব থাকা মতিন মাষ্টার মনোনয়ন কেনায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পরের খেলার অংশ হতে পারে বলে রাজনীতির একটি মহল দাবি করেন। তবে মতিন মাষ্টার কখনোই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেননা বলে মত বিশ্লেষকদের।
শ্রমিক লীগের সাবেক এই নেতারও জেলা পরিষদ নির্বাচনে শক্ত অবস্থান রয়েছে বলে দাবি রাজনৈতিক বোদ্ধাদের। জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে ঝটকা দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ নারী ও শিশু আদালতের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) রকিবউদ্দিন রকিব। তার দাবি, তিনি জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন। যেহুতু নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন অবদান রাখা নেতৃবৃন্দ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সেহুতু রকিবউদ্দিন অংশগ্রহণ করেছেন এটুকুই যথেষ্ট বলে মনে করছে রাজনৈতিক বোদ্ধারা।
প্রসঙ্গত, জেলা পরিষদের তফসিল অনুযায়ী-মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ১৫ সেপ্টেম্বর, মনোনয়নপত্র বাছাই ১৮ সেপ্টেম্বর, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের সময় ১৯ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর, আপিল নিষ্পত্তি ২২ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৫ সেপ্টেম্বর। প্রতীক বরাদ্দ ২৬ সেপ্টেম্বর। আর ভোটগ্রহণ ১৭ অক্টোবর।


