সাঁড়াশি অভিযানে দুদক, ১৬১ কোটি টাকা আত্মসাতের তিন মামলা
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:১৩ এএম
# বিভিন্ন দপ্তর এবং দপ্তর প্রধানসহ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে : উপ-পরিচালক মঈনুল
নারায়ণগঞ্জে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত কার্যালয় উদ্বোধনের পরপরই দুর্নীতিবাজদের নিজেদের জালে আটকে সাফল্য দেখাতে শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। গত ৩ জুলাই নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ জেলা নিয়ে সম্বন্বিত কার্যালয় উদ্বোধনের পর থেকেই কাজ শুরু করে দুদক।
ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জে দুর্নীতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটি ব্যাংকের কর্মকর্তার (বরখাস্ত) সহযোগিতায় ১৬১ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায় দুদকের কর্মকর্তারা। এই ঘটনায় দুদক বাদী হয়ে ৬ জনকে আসামি করে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জের সোনালী ব্যাংকের মহিলা শাখা বর্তমানে ফরেন একচেঞ্জ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপক (বরখাস্ত) মো. আবদুস সামাদের (৬৮) সহযোগিতায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে আন্তর্জঅতিক বাণিজ্য ঋণ মঞ্জুরী সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে অফিস নোট অনুমোদন ছাড়াই ফার্সড লোন সৃষ্টির মাধ্যমে, রপ্তানী আয় থেকে আনুপাতিক হারে ফোর্স লোন জমা না করে ক্ষেত্র বিশেষে অন্য ফোর্স লোন ও পিএসসি সমন্বয় করে, লিমিট অতিক্রম সত্ত্বেও এবং মেয়াদ উত্তীর্ণের পর পিএসসি দেওয়া আমদানীকৃত কাঁচামালের মজুদ যাচাই না করে ঋণ বিতরণ করেছেন তিনি।
তাছাড়া গ্রাহকের ফোর্স লোনা দায় না থাকা সত্ত্বেও নতুন নতুন বিটিসি এলসি খোলা এবং পুনরায় ফোর্স লোন সৃষ্টি করে গ্রহাণের দায়ী পরিশোধ করে নিজেরাই পরিশোধ করেছেন। মূলত এই রকম করে ব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তা নয়ামাটি এলাকার মেসার্স দাইয়ান ফ্যাশনস লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাসের তাওয়াব (৫৯), চেয়ারম্যান সৈয়দা সাহেলা মুনতাসির (৭৩) এবং সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকার মোসাম্মদ রাহাতুনকে (৬০) অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দিয়েছেন।
দুদকের একাধিক সূত্র ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানিয়েছেন, দাইয়ান ফ্যাশনস লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচাল আবু নাসের তওয়াব ২০০৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র লিমিট ৩ কোটি টাকা, পিসি লিমিট ৩০ লাখ টাকা মঞ্জুরী এবং সূতা কেনার জন্য ৪৬ হাজার ৭৬৫ মার্কিন ডলার মূল্যের একটি ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র আবেদন করেন।
আবেদনে নাসের উল্লেখ করেন স্পেন থেকে ইস্যুকৃত রপ্তানী ঋণপত্র ৬২ হাজার ৩৯৪ মার্কিন ডলারেরর মাধ্যমে সাড়ে ৮৪ হাজার পিস টি-শার্ট রপ্তানির আদেশ তিনি পেয়েছেন। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে সোনালী ব্যাংক নারায়ণগঞ্জ প্রিন্সিপাল অফিস ঋণপত্র খোলার অনুমতি প্রদান করেন।
এলসির রেজিষ্টার পর্যালোচনা করে জানা যায়, সর্বমোট ১৯টি এলসি ইস্যু করা হয়। বিভিন্ন এক্সপোর্ট এলসির বিপরীতে ওই ব্যাক টু ব্যাক এলসিগুলো খোলা হয়। কিন্তু আবু নাসের তওয়াবের এসব ব্যাক টু ব্যাক এলসির বিপরীতে মালামাল তৈরি করে শিপমেন্ট করার কথা থাকলেও শিপমেন্ট না করে সব ব্যাক টু ব্যাক এলসির টাকা আত্মসাত করা হয়।
শর্তানুযায়ী মার্জিনে লোকাল ক্যাশ এলসি খোলার কথা থাকলেও নির্দিষ্ট মার্জিনে এলসি খোলা হয়নি। পরবর্তীতে ডকুমেন্টুস ছাড়া করার সময় অবশিষ্ট টাকা না দিয়েই ডকুমেন্টস ছাড় করা হয়। ফলে পিএডি লোন সৃষ্টি করে ক্যাশ এলসির মুল্য পরিশোধ করা হয়।
শহরের নয়ামাটি এলাকার মেসার্স দাইয়ান ফ্যাশনস লি. ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাসের তাওয়াব কলেজ রোডের মৃত আহাম্মদ আল মুনতাসিরের ছেলে। আবু নাসের তাওয়াব, সৈয়দা সাহেলা মুনতাসির, মোহাম্মদ রাহাতুন এবং ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপক (বরখাস্ত) মো. আবদুস সামাদ যোগসাজশে এই অর্থ আত্মসাত করেন।
আবদুস সামাদ চাপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর থানার আলীনগর এলাকার দাউদ আলীর ছেলে। পৃথক তিন মামলায় আসামি করা হয়েছে, ব্যাংকের ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপক (বরখাস্ত) মো. আবদুস সামাদ (৬৮), সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলি এলাকার মেসার্স প্রিমিয়ার ওয়াশিং প্ল্যান্টের মালিক আবু নাসের আজাদ (৫৭), নয়ামাটি এলাকার মেসার্স প্রিমিয়ার নীট ওয়ার লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাসের তাওয়াব (৫৯), তার স্ত্রী শামীমা ইয়াসমিন (৫৫), মেসার্স প্রিমিয়ার নীট ওয়ার লি. এর চেয়ারম্যান মো. মোশারফ হোসেন (৩৮) এবং মেসার্স দাইওয়ান ফ্যাশনস লি. এর চেয়ারম্যান সৈয়দা সাহেলা মুনতাছির (৭৩)।
এছাড়া দুদক নারায়ণগঞ্জ সমন্বিত কার্যালয়ের টিম মাদক ব্যবসায় জড়িত আটক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় না নেয়ার জন্য এবং গোপন রাখার জন্য ১ লাখ টাকা ঘুষ প্রদানের চেষ্টার জন্য রূপগঞ্জের হাটাব এলাকার হাজী হারুন অর রশিদের ছেলে আনিছুর রহমানের (৩২) নামে মামলা করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জে দুদকের কার্যক্রম সবে মাত্র শুরু হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে সারাদেশে অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের কার্যক্রম আরো শক্তিশালী হবে বলে আশাবাদ স্থানীয়দের।
এবিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নারায়ণগঞ্জের সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মঈনুল হাসান রওশনী যুগের চিন্তাকে জানান, ‘দুদকের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রধান কার্যালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে অচিরেই অভিযানে নামবো। বিভিন্ন দপ্তর এবং দপ্তর প্রধানসহ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’ এন,এইচ/জেসি


