নাসিক কাউন্সিলর মতির সম্পদ অনুসন্ধানে দুদক
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:৪২ পিএম
# রিফিউজিদের নামে বরাদ্দ জমি ৫০ কোটি টাকায় বিক্রি
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতির বিরুদ্ধে রিফিউজিদের নামে বরাদ্দ দেওয়া জমি জালিয়াতির মাধ্যমে ৫০ কোটি টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এ সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর কাউন্সিলর মতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ইতিমধ্যে মতি, তার স্ত্রী রোকেয়া রহমান ও তিন ছেলেমেয়ের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র, আয়কর নথি ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে দুদক। এরই মধ্যে একাধিক দপ্তর থেকে কিছু তথ্য দুদকের হাতে এসে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।
জালিয়াতির মাধ্যমে রিফিউজিদের নামে বরাদ্দ দেওয়া জমি বিপুল টাকায় বিক্রিতে সম্পৃক্ত থাকায় মতির পাশাপাশি তার সহযোগী শাহ আলম, আশরাফ ও আক্তার হোসেন ওরফে পানি আশরাফসহ আরও কয়েকজনের বিষয়েও খোঁজখবর নিচ্ছে দুদক। তাদেরও কমিশনে তলব করা হবে। কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
রিফিউজিদের নামে বরাদ্দ জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রির অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন দুদকের উপপরিচালক মোনায়েম খান। গত মাসে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক কার্যালয়, বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মহাপরিচালকসহ বেশ কয়েকটি দপ্তরে তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছেন।
বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া চিঠির শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘মতিউর রহমান মতি, কাউন্সিলর ৬ নম্বর ওয়ার্ড, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদকব্যবসা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রিফিউজিদের জন্য বরাদ্দ জমি দখল করে একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের কাছে ৫০ কোটি টাকা বিক্রির অভিযোগ।’
মতির বিরুদ্ধে দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়, নাসিকের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি ২০১৭ সালে প্যানেল মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে পড়েন। মতি তার সহযোগী আশরাফ উদ্দিন, শাহ আলম ও পানি আক্তারের সহযোগিতায় আদমজী ইপিজেড এলাকায় রিফিউজিদের জন্য বরাদ্দ কয়েক বিঘা জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি করে দিয়েছেন।
এ ছাড়া নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে এলাকায় বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন। কেউ তার অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে সহযোগী শাহ আলমকে বাদী করে মামলা দিয়ে হয়রানি করেন। রিফিউজিদের নামে বরাদ্দ করা জমির ভুয়া দলিল তৈরি ও একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছে তা বিক্রিতে মধ্যস্থতা করেন সহযোগী আশরাফ।
জমি বিক্রি বাবদ মতির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন নেন আশরাফ। এলাকায় মতি বাহিনীর ক্যাডার হিসেবে পরিচিত আক্তার হোসেন ওরফে পানি আক্তারের মাধ্যমে ক্যাডার বাহিনী দিয়ে রিফিউজিদের ওই জমি দখল করে নেন মতি। অভিযোগে আরও বলা হয়, একসময় নূর হোসেনের সহযোগী মতি ১৯৯৮ সালে জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
তিনি আদমজীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। গড়ে তোলেন নতুন বাহিনী। অব্যাহত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মতিকে ২০০৫ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে। ওই সময় এক বিএনপি নেতার মধ্যস্থতায় কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ থেকে বেঁচে যান তিনি। মুচলেকা দেন যে তিনি বা তার বাহিনী কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে না।
পরে কিছুদিন এলাকাছাড়া ছিলেন। কিন্তু বছর তিনেক বাদে এলাকায় ফিরেই সুমিলপাড়া, আমদজী ইপিজেড, সোনামিয়ার বাজার, বাগপাড়া, মণ্ডলপাড়া, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাড়ৈপাড়া এবং শীতলক্ষ্যার তীর ও এর আশপাশের এলাকায় বেপরোয়া চাঁদাবাজি শুরু করে মতি ও তার সহযোগীরা।
মতির সঙ্গে যোগ দেয় আশরাফ উদ্দিন, পেটকাটা মানিক, বোমা ওহাব, ফেন্সি শামীম, পানি আক্তারসহ বিশাল এক বাহিনী। আশরাফ এলাকায় মতির ডান হাত হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া আরও দলে ভেড়ে শীতলক্ষ্যা নদীকেন্দ্রিক চোরাই তেলের কারবারের নিয়ন্ত্রক পেটকাটা মানিক।
এরশাদের আমলে আদমজীতে রেহান ও মতি বাহিনীর মধ্যে প্রতিনিয়ত দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে থাকত। মতি ও আশরাফ বাহিনীর ক্যাডারদের বিরুদ্ধে হত্যা, দাঙ্গা, বিস্ফোরক, অস্ত্র, মারামারি, চুরি, ছিনতাইসহ মামলা রয়েছে প্রায় ২৪টি। বেশ কটি মামলা থেকে খালাস পেলেও বর্তমানে চলমান আছে কমপক্ষে ৭টি।
আশরাফের সহযোগিতায় মতি মেঘনা তেল ডিপো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও রাতের আঁধারে জাহাজ থেকে তেল চুরির চক্র গঠন করেন। তেল চুরি, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও খাসজমি দখল করে বিক্রির মাধ্যমে নাসিকের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মতি ও তার কয়েক সহযোগী কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে বলে দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মতিউর রহমান মতি বলেন, ‘দুদক বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে, আমি সেটা শুনেছি। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত কোনো চিঠি পাইনি। আমার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, সেটাও আমি জানি না।’
রিফিউজিদের নামে বরাদ্দ করা জমি ৫০ কোটি টাকায় বিক্রির অভিযোগ সম্পর্কে মতি বলেন, ‘আমি যেহেতু রাজনীতি করি এবং এলাকার জনপ্রতিনিধি, তাই কেউ আমার বা আমার লোকজনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে থাকতে পারে। আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।’ এন.এইচ/জেসি


