ঘটনা ঘটে যাবার পর নানা রকম বুদ্ধি যখন মাথায় আসে, সেই অবস্থা বুঝাতেই বোধ করি বাংলায় প্রচলিত, চর্চিত প্রবাদ চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। বাজারে মিনিকেট বলে কোনও চাউল আর বিক্রি করা যাবে না বা করা হবে না। তা বন্ধ করতে আইন করা হয়েছে।
জানা গেল মিনিকেট নামের কোনও ধান কস্মিনকালে ভ’ভারতে ছিল না। আর ধান না থাকলে চাউল পয়দা হওয়ার কোনও যুক্তি নাই। সরকার বলছে মোটা চাউল মেশিনে পালিশ কওে বাজাওে মিনিকেট নামে বিক্রি হয়। কিন্তু মিল মালিকরা বেমালুম তা অস্বীকার করছে।
তাহলে রহস্য থেকেই গেল মিনিকেটের জন্ম কবে কোথায় কিভাবে হল? যতদূর জানা যায় ভারতের কৃষি বিভাগ মিনি প্যাকেটে করে কৃষকদের এক রকমের সরু চাউল বিতরণ করত। সেই মিনি প্যাকেট শব্দ অল্পদিনের মধ্যে মুখে মুখে উচ্চারণ বিভ্রাটে মিনিকেটে পরিণত হয়।
একই চাউল ভিন্ন নামে মোড়কজাত হয়ে বাজারে যে আসবে না তার নিশ্চয়তা সাধারণি মানরুষ কার কাছে পাবে? লতাশাইল, জিরাশাইল নামে বাজারে যে জনপ্রিয় চাউল পাওয়া যায়, তা যে প্রকৃতই লতা বা জিরাশালী ধান থেকে উৎপাদিত হয়, তারই বা নিশ্চয়তা কি? দেখার কি কেউ আছে? যদি থাকে তবে মিনিকেটের দাপট কারো নজরে পড়তে এতদিন কেন লাগল, এর উত্তর কে জানে?
কিছুদিন আগে তেল নিয়ে তেলেসমাতি দেখা গেছে। আচমকা জানা গেল সয়াবিন তেল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এতদিন কোনও বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ কেউ এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা জনগণকে জানায়নি, জানাবার গরজটুকুও বোধ করেননি। এমন কি যারা বিশেষ বিশেষ সময় উপলক্ষ্যে বানী দিয়ে থাকেন, তেমন আমলা,মন্ত্রী মহোদয়গণও এই গোপন কথা প্রকাশ করেননি।
কিন্তু এখন বলা হচ্ছে চাউলের উপজাত কুঁড়ার তেল স্বাস্থ্যপ্রদ। তাই দেশে তার উৎপাদন বাড়ানো হবে। বেশ, এবার নতুন নতুন প্রকল্প নিয়ে জনগণকে উপযুক্ত তেল সরবরাহ করা হবে। কিন্তু ক্ষতিকর সয়াবিনের আমদানী, উৎপাদন, বাজারজাত করে ভোক্তাদের তা গ্রহণে যারা বাধ্য করল তাদের বিষয়ে আমাদের সরকারী ব্যবস্থাপকগণ নীরব।
ক্ষতিকর সয়াবিনে জনস্বাস্থ্যের যে বিপুল ক্ষতি হয়েছে, তার প্রসঙ্গ না হয় বাদই গেল । ঐ স্বাস্থ্যক্ষত কোনও দিনই পূরণ হবার নয়। জ্ঞানীগুণীগণ অকাতরে উপদেশ বিতরণে সিদ্ধহস্ত। কখন কোন কোন উপলক্ষ্যে কোন বাক্য উচ্চারণ করতে হবে তা যেন আগে থেকেই ছক করে নেয়া থাকে।
নিকট অতীতে সরিষার তেল নিয়ে অপপ্রচারের কথা অনেকেরই মনে থাকার কথা। অনাদিকাল থেকে এই দেশের বঙ্গ সন্তানেরা সরিষার তৈল ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল। সঙ্গে ব্যবহার হত প্রয়োজন ভেদে তিলতৈল, বাদাম তৈল ইত্যাদি। পত্রিকার পাতায় এন্তার লেখালেখি শুরু হয়েছিল, ছিল সেমিনার, কর্মশালার ছড়াছড়ি সরিষার তেল ব্যবহারের মন্দ দিক, স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয় নিয়ে।
রান্নার সময় সরিষার তেলে ফেনা সৃষ্টি হয়। সেই ফেনা আবার স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। দিনে দিনে সয়াবিনের অগুনতি উপকারের প্রচার প্রচারণার প্রভূত জয়জয়কার। শেষ পর্যন্ত রান্নাঘর শুধু নয়, কৃষকের গোলাঘর, থেকে সরিষা উধাও। পেশাদার তেলী পরিবার বাংলার সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এখন জানা যাচ্ছে সরিষার তেলের বহুবিধ উপকারিতা আছে।
ব্যবহারের তাগিদ দিয়ে পুষ্টিবিদরাও উচ্চ কন্ঠ। কিন্তু কেন আগে সয়াবিন ভাল, সরিষা খারাপ বলা হল আবার এখন কেন সয়াবিন খারাপ চাউলের কুঁড়ার তেল উপকারী বলা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বুঝতে পারা কঠিন। এমনিতে দ্রব্যমূল্যে সাধারণ মানুষের ত্রাহি অবস্থা। তার উপর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি আরেক দফা সব জিনিসের দাম বাড়াল।
জনগণের পিঠ কোথায় ঠেকবে, তা ভাবার সময় কারো আছে বলে মনে হয় না। আমাদের সব কাজকর্ম ভবিষ্যত ক্রিয়ায় আবদ্ধ। তেল সংকটের বর্তমান সমাধান না দিয়ে ভবিষ্যতে কি করা হবে, তা জেনে গৃহিনীর রান্নাঘর নিশ্চয় তৈলাক্ত হবে না। মোটা চাল মিনি হবার কার্যক্রমের গতি মন্থর হবে, ভিন্ন নামে বাজার দখল করবে না, এই নিশ্চয়তা ভোক্তাজনের সাধারণ আকাক্সক্ষা।
কালে ভদ্রে তেলের দাম কমার ঘোষণা দেখা যায়। বৃদ্ধির মূল্যের সঙ্গে তার আকাশ পাতাল ফারাক। বিশ্ব এখন যুদ্ধকালীন সংকট অবস্থায় । কেবল দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনায় বর্তমানের সমস্যা সংকট নিরসন হবে না। গালভরা বুলি, কাগুজে আইন, সুদিনের স্বপ্ন, বাস্তবতা থেকে চোখ সরিয়ে নেয়া কোনও সমাধান নয়। এন.এইচ/জেসি


