# উদ্বোধনের পর উচ্ছস্বিত দুই পাড়ের বাসিন্দারা।
একটা সেতুর জন্য শহর-বন্দরবাসীর ছিল দীর্ঘদিনের হাহাকার। হবে হবে করেও যেন স্বপ্ন সত্যি হয়ে উঠছিলনা। বন্দরের ফরাজিকান্দা হয়ে সৈয়দপুর পর্যন্ত তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর যখন কাজ শুরু হল দীর্ঘসূত্রিতায় সেই স্বপ্ন যেন অধরা হয়েই রয়ে গিয়েছিল।
তবে সকল অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গতকাল এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দর উপজেলার সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটল তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে।
গতকাল দুপুরে গণভবন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নড়াইলের মধুমতী ও নারায়ণগঞ্জের তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর শুভ উদ্বোধন করেছেন। নারায়ণগঞ্জের তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর নাম করণ করা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রয়াত সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিম ওসমানের নামে।
দীর্ঘদিনের এই স্বপ্ন পূরণের স্বাক্ষী হয়ে থাকতে সেতুটি পূর্ব-প্রান্ত অর্থাৎ বন্দরের মদনগঞ্জের ফরাজীকান্দা এলাকায় সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলো অনেকে। বন্দরের সম্পূর্ণ এলাকার মানুষ এই সেতুর সুবিধা না পেলেও এই সেতুর গুরুত্ব বিশেষ কম নয়।
১২৩৪ দশমিক ৫০মিটার লম্বা এই সেতুর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬০৮ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি বন্দরের মদনগঞ্জ ও সদরের সৈয়দপুর এলাকায় তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এর নামকরণ করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিম ওসমান সেতু। উদ্বোধনের পর উচ্ছস্বিত দুই পাড়ের বাসিন্দারা। উদ্বোধনের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম নাসিম ওসমান তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হারুন মিয়া বলেন, ‘এটা শুধু সেতু না, স্বপ্ন। অনেক অপেক্ষার পর পেয়েছি।’
‘ভালো মানুষই তো ট্রলারে উঠতে ভয় পায়। আমি তো অন্ধ, তারপর আবার বৃদ্ধ। এত কষ্ট নিয়া যাতায়াত করতে হয়। এখন তো আর কষ্ট নাই। লাঠি নিয়ে হেঁটেই সেতু পার হতে পারবো। অনেক বছর ধরে তো এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম।’
স্থানীয় সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দরের মাঝে বয়ে চলেছে শীতলক্ষ্যা নদী। এ নদী পার হতে হাজীগঞ্জ-নবীগঞ্জ পয়েন্টে ফেরি চলাচল করলেও সেতুর আক্ষেপ ছিল দীর্ঘদিনের। শীতলক্ষ্যা নদী বন্দর উপজেলা ও সোনারগাঁ উপজেলাকে জেলা সদর থেকে পৃথক করেছে।
এ দুটি উপজেলা সরাসরি সড়কপথে জেলা সদরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না। দুই উপজেলা থেকে সদরে যেতে কাঁচপুর ব্রিজ (শীতলক্ষ্যা-১ সেতু) ব্যবহার করতে হতো। এজন্য নৌকায় নদীপথের ৩-৫ কিলোমিটারের দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হতো।
এখন থেকে আর ঘুরে যেতে হবে না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নদী পাড়ি দেওয়া যাবে। বহুল প্রত্যাশিত এ সেতু উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হাজার হাজার মানুষ। উদ্বোধনের পরপরই বিনা বাধায় লোকজন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যাতায়াত করেন।
আনোয়ারুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘এই সেতুর জন্য আমাদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এখন থেকে আমাদের আর কোনো দুর্ভোগ থাকবে না। এখন ইচ্ছা করলেই হেঁটেই নদী পার হতে পারবো। আমাদের ব্যবসার দ্বার খুলে দিয়েছে এই সেতু।’
সেতুর উদ্বোধন দেখতে আসা মিজানুর রহমান বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। সেতুটি হওয়ায় শীতলক্ষ্যা নদীর দুই পাড়ের বাসিন্দাদের জন্য কি যে সুবিধা হয়েছে তা বলে বোঝানো যাবে না।’
বন্দরের বাসিন্দা শিপলু মিয়া বলেন, ‘আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম, সেতু চালু হলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখব। অনেক বছর ধরে সেতুর কাজ হয়েছে। অপেক্ষায় ছিলাম কবে চালু হবে। ‘কাল থেকে সেতু পার হয়ে কাজে যাব। কত ভালো লাগছে কীভাবে যে বোঝাবো!’
হারুন ও শিপলুর মতো নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দরের মানুষের কাছে এই সেতু ভোগান্তির কমানোর পথ তৈরি করে দিয়েছে। শহর থেকে বন্দরে যেতে এখন আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর হয়ে যেতে হবে না। বরং এই সেতু হয়ে চট্টগ্রাম ও সিলেট মহাসড়কের পথ কমেছে অন্তত ১০ কিলোমিটার।
বন্দরের ফরাজীকান্দা এলাকার রোজিনা বেগম বলেন, ‘এখন নদী পার হওয়ার কষ্ট কমলো। রোগী নিয়ে নারায়ণগঞ্জে যেতে হলে আগে পথে পথে ভোগান্তিতে পড়তে হতো। এই কষ্টের দিন শেষ। ‘এখন আমাদের আনন্দের সময়। বাড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে শহরে যেতে পারব।’
বন্দর উপজেলার নির্বার্হী কর্মকর্তা (ইউএনও) কুদরতে খোদা জানান, উচ্ছ্বসিত লোকজন সেতুতে হাঁটাহাঁটি করছেন। তারা উপভোগ করছেন দিনটি। তাদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সদস্যরা আছেন। রাত ১২টার পর বড় যানবাহন চলতে শুরু করবে সেতু দিয়ে।
বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দিপক চন্দ্র সাহা বলেন, ‘সেতুর বন্দরের অংশে পুলিশের টহল থাকবে, আর নারায়ণগঞ্জের অংশে সদর থানার। মূলত রাতে সেতুতে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা এড়াতে সেতুর দুপাশে সর্তক থাকার ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলেন, ‘সেতু চালু হওয়ায় নৌকা ও ট্রলারে ভোগান্তি নিয়ে নদী পারাপার হওয়া অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের কষ্টের অবসান ঘটেছে। নতুন দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে দুটি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার। ‘এখন এখানে বিভিন্ন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
আরও উন্নয়ন হবে এ অঞ্চলের মানুষের।’ নতুন এই সেতুতে ট্রেলার ৬২৫ টাকা, হেভি ট্রাক ৫০০ টাকা, মাঝারি ট্রাক ২৫০ টাকা, মিনি ট্রাক ১৯০ টাকা, বড় বাস ২২৫ টাকা, মিনিবাস ১২৫ টাকা, মাইক্রোবাস ১০০ টাকা, প্রাইভেটকার ১০০ টাকা, তিন চাকার মোটরযান ২৫ টাকা, মোটরসাইকেল ১৫ টাকা এবং রিকশা, ভ্যান, সাইকেল ও ঠেলাগাড়িকে পাঁচ টাকা করে টোল দিতে হবে।
এই সেতুর উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। বিশেষ করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিক থেকে নারায়ণগঞ্জ সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের সংগঠনের দিক থেকেও নারায়ণগঞ্জ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সেদিক থেকে আমরা চিন্তা করেছি নারায়ণগঞ্জবাসীর যোগাযোগ সহজ করা এবং তাদের জীবনযাত্রা উন্নত করা, এটা একান্তভাবে দরকার। সেদিকটা মাথায় রেখেই আমি শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর তৃতীয় সেতু নির্মাণ করলাম। ইতোমধ্যেই শীতলক্ষ্যার ওপর আরও কয়েকটি সেতু করেছি। শীতলক্ষ্যা-১ ও ২ আমার হাতে হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘আজকে নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ-ঢাকা শহরের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যার ফলে এখন ঢাকা শহর দিয়ে যেতে হবে না। পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে ঢাকা-সিলেট বা ঢাকা-চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে সরাসরি এই সেতু পার হয়ে চলে যেতে পারবে। তাহলে ঢাকার ভেতর যানজটটাও কম হবে।’
অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) মঞ্জুরুল হাফিজ বলেন, এই সেতুর ফলে পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকা শহরে প্রবেশ না করেই চট্টগ্রাম যাতায়াত করতে পারবেন দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলসহ আট জেলার বাসিন্দারা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যানবাহন ও যাত্রীরা বর্তমানে যাত্রাবাড়ী-পোস্তগোলা ব্রিজ হয়ে অথবা চাষাঢ়া-সাইনবোর্ড রুটে চট্টগ্রামে যান।
এখন শীতলক্ষ্যা সেতু দিয়ে যানজট এড়িয়ে সহজে চট্টগ্রাম যেতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, ১ দশমিক ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলগামী যানবাহন এবং একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী যানবাহন যানজট এড়াতে এবং সময় বাঁচাতে নারায়ণগঞ্জ শহরকে বাইপাস করতে সক্ষম করবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর থেকে সেতুটি মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর থেকে শ্রীনগরের ছনবাড়ি পর্যন্ত যুক্ত করবে। এর মাধ্যমে পদ্মা সেতুর সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সড়ক নেটওয়ার্ক দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে। সেতুতে সংযুক্ত হচ্ছে দেশের ১৮টি জেলা। এন.এইচ/জেসি


