# পারভীন ওসমানের সাজসজ্জা নিয়েও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন সেলিম ওসমান
প্রায় শত বর্ষ যাবত ওসমান পরিবারের সাথে পরিচিত নারায়ণগঞ্জবাসী। নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের গোড়াপত্তন করেন এম ওসমান আলী ১৯২০ এর দশকে। সে সময় তৎকালীন কুমিল্লা জেলা থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে বসতি স্থাপন করেন তিনি। ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে সাথে সমাজসেবা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও রাজনীতির মাধ্যমে বেশ সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হন এম ওসমান আলী।
ওসমান আলী ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। তারই ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন ওসমান আলীর বড় ছেলে একেএম সামসুজ্জোহা। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সরকারে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
তিনি বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধাসহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন অন্যতম সদস্যও ছিলেন। যার ফলে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়। এই দুই প্রজন্মের সময় ওসমান পরিবারের ব্যাপক সুনাম শোনা গেলেও আভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে কোন আভাস বা ইঙ্গিত কারও নজরে পড়ছে বলে শোনা যায়নি।
তবে তৃতীয় প্রজন্মে এসে ওসমান পরিবারের সেই সুনাম এবং ঐক্য আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শামীম ওসমান দেশে না থাকায় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হন অভিনেত্রী সারা বেগম কবরী।
২০০৯ সালে শামীম ওসমান দেশে আসার পর ওসমান পরিবারের দ্বন্দ্ব প্রথম প্রকাশ পায়। সে সময় শামীম ওসমানের চাচী কবরীর সাথে তাদের একাধিকবার দ্বন্দ্বের খবর মিডিয়ায় প্রকাশ পায়।
বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায়, সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানের দাদা ওসমান আলী ব্যাপকহারে জনসেবামূলক কাজ করার জন্য ১৯৪০ সালে বৃটিশ সরকার তার সম্মানে তাকে ‘খান সাহেব’ উপাধি প্রদান করেন। তবে বৃটিশ সরকারে শাসনামলে ভারত বর্ষে তারা যে দমন পীড়ন নীতি চালিয়েছেন তার প্রতিবাদ হিসেবে বৃটিশ সরকারের দেওয়া সেই উপাধি বর্জনের ঘোষণা দেন তিনি।
সেই ত্যাগের জন্য তিনি বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন। তবে এখনও ওসমান পরিবারের অনেককেই খান সাহেব ওসমান আলী বলতে গর্ব বোধ করতে শোনা যায়। এমনকি ওসমান আলীর নামে নারায়ণগঞ্জে নির্মিত একটি স্টেডিয়ামেও তার নামের আগে ‘খান সাহেব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
কিন্তু যেহেতু তিনি সেই উপাধি বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছেন, তাই সেই উপাধিকে ব্যবহার করা ওসমান আলীর প্রতি অসম্মান হিসেবেই দেখেন অনেকে।
একেএম সামসুজ্জোহার বড় ছেলে নাসিম ওসমান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে শেখ কামালের বন্ধু। ১৫ আগস্টের আগের দিন ১৪ আগস্টে নাসিম ওসমান ও পারভীন ওসমানের বিয়ের দিন ছিল। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শেখ কামাল। এর পরের দিনই ঘাতকদের হাতে নিহত হন শেখ কামাল।
তবে ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট ঘাতকদের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্ব-পরিবারে শহীদ হওয়ার পর থেকেই পাল্টে যেতে শুরু করে ওসমান পরিবারের দৃশ্যপট। সে সময় শক্ত হাতে হাল ধরেন পরিবারের বড় ছেলে একেএম নাসিম ওসমান। এরপর এরশাদ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন জাতীয় পার্টি গঠন করা হলে নাসিম ওসমানও জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন।
এরপর ১৯৮৬, ১৯৮৮, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। নাসিম ওসমান যখন রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেন সে সময় শামীম ওসমান ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। এই পরিবারকে টেনে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন নাসিম ওসমান ও তার সহধর্মিনী পারভীন ওসমান।
তবে ২০১৪ সালে নাসিম ওসমানের আকস্মিক মৃত্যুর পর যখন নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়, তখন পারভীন ওসমান ছিলেন অনেকটা বিমর্ষ অবস্থায়। অন্যদিকে তাদের সন্তান আজমেরী ওসমানও সাংসদ এর দায়িত্ব নেয়ার মতো করে তৈরি হননি।
ফলে সেই শূন্যতা পূরনে অনেকটা ব্যাক-আপ হিসেবে জাতীয় পার্টির রাজনীতির ব্যানারে সাংসদ হন পারভীন ওসমানের দেবর, এবং ওসমান পরিবারের মেজো ছেলে সেলিম ওসমান। সে সময় সেলিম ওসমান জানান, তার রাজনীতি করার কোন ইচ্ছে নেই। তবে রাজনীতির মজা কিংবা ক্ষমতার মজা একবার পেলে তা-কি-আর কারো ছাড়তে মন চায়!
সেলিম ওসমানের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় পারভীন ওসমান নির্বাচন করতে চাইলে পরিবারে বাধার মুখে পড়েন তিনি। সে সময় থেকেই তাদের মধ্যকার বিভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠে।
সে সময় মাসদাইর কবরস্থানে স্বামীর কবর জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারণায়ও নামেন পারভীন ওসমান। এ সময়ে নাসিমের ওসমানের ভক্ত জাতীয় পার্টির অসংখ্য নেতা-কর্মীকে তার পাশে দেখা গিয়েছিলো। নাসিম ওসমানের প্রতি থাকা আন্তরিক ভালোবাসা থেকেই পারভীন ওসমানের পক্ষে ছিলেন তারা।
ওই সময়ে বড় ভাবী পারভীন ওসমানের সমালোচনায় মেতে উঠে সেলিম ওসমান। পারভীন ওসমানের সাজসজ্জ্বা নিয়েও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন তিনি। এরপর থেকে তাদের আর কখনও একমঞ্চে বসতেও দেখা যায়নি।
এমনকি ২০১৯ সালে এক মতবিনিময় সভায় একেএম নাসিম ওসমানের স্ত্রী পারভীন ওসমানকে ওসমান পরিবারের কেউ নয় বলে মন্তব্য করেন সেলিম ওসমান। সেলিম ওসমান আরও বলেন, ‘আমার ভাবির বাড়ি নোয়াখালী। কিন্তু উনি নারায়ণগঞ্জের এমপি হতে চান। উনি ওসমান পরিবারের কেউ না।’ শুধুই কি তাই, পারভীন ওসমান রাজনীতিতে আসুক এটাও চাননি সেলিম ওসমান।
এরপর ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের পারভীন ওসমানকে জাতীয় মহিলা পার্টির উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচিত করেন এবং গত ২৪ মার্চ জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন। পারভীন ওসমানের স্বামী নাসিম ওসমানও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।
গত জুনে অনুষ্ঠিত হয় জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির সম্মেলন। সেই অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টির পক্ষ হতে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য পারভীন ওসমানকে কোন দাওয়াত করা হয়নি। একই চিত্র দেখা গেল গত ১০ অক্টোবর একেএম নাসিম ওসমান সেতু উদ্বোধনের দিন। তার স্বামীর নামে করা সেতুর উদ্বোধনের দিনও প্রশাসন বা দলের পক্ষ হতে তাকে কিছুই জানানো হয়নি।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ওসমান পরিবারের পারভীন ওসমানকে মেনে নিতে পারছেন না সেলিম ওসমান, শামীম ওসমান ও তাদের পরিবার। যেমনটা মেনে নিতে পারেননি সারাহ বেগম কবরীকেও। তবে কবরীর সাথে তাদের সম্পর্কের তুলনায় পারভীন ওসমানের আত্মীয়তার সম্পর্কটা অনেকটাই কাছের।
বিশেষ করে নাসিম ওসমান, যিনি নাকি তাদের দুই ভাইয়ের বর্তমান অবস্থান তৈরি করতে অনেক ত্যাগ ও সময় ব্যয় করেছেন, পারভীন ওসমানও বিসর্জন দিয়েছেন অনেক সুখ অনেক আহ্লাদ, সেই ভাইয়ের মৃত্যুর পর শুধু ক্ষমতার স্বার্থে তারা কেউ চাননি তাদের ভাবী রাজনীতিতে আসুক, জাতীয় পার্টির সম্মেলনে আসুক কিংবা সেতু উদ্বোধনে আসুক।
যেই সেতু তার আবেগের মানুষ, তার ভালবাসার মানুষের নামে নামকরণ করা হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা এই স্বামীর সম্মানকে চাক্ষুস করার জন্য স্ত্রী পারভীন ওসমানকে ডাকতে বা জানাতে প্রশাসনও কোন ভূমিকা রাখেনি। অথচ যেকোন আয়োজনেই স্বামীর সম্মানে তার অবর্তমানে স্ত্রীকে কিংবা স্ত্রীর সম্মানে তার অবর্তমানে স্বামীকে নিমন্ত্রণ করার রেওয়াজ এখনও বন্ধ হয়নি বলে জানা।
প্রশাসন বর্তমান এমপিদের নাখোশ করতে চাননি বলে অনেকেই ভেবে নিয়েছেন। এতে নাসিম ওসমানকে যতই সম্মানিত করা হোক না কেন, তিনি বেঁচে থাকলে তার স্ত্রীর প্রতি এমন অপমান তিনি সহ্য করতেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের এরূপ আচরণে নাসিম ওসমান ভক্তদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছেন, এই বিষয়টি নারায়ণগঞ্জবাসীর নিকট অত্যন্ত দুঃখজনক, বেদনাদায়ক ও লজ্জার।


