গত ৬ই নভেম্বর সারাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। প্রথামত বাংলা ১ম পত্র দিয়েই পরীক্ষার শুভ মহরত হয়েছে। বাংলা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের একটি প্রসঙ্গ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিস্তর আলোচিত হচ্ছে।
গত পরশু অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার একটি সৃজনশীল প্রশ্নের বিষয় বস্তুর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা বিশেষ ভাবে উসকে দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে । হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের বিষয় বৈষম্য চিহ্নিত করে সাম্প্রদায়িকতা সুকৌশলে কিন্তু প্রকাশ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
এমনকি উল্লেখ করা হয়েছে এক ভাই মীরজাফরের মত আচরণ করে অপর ভাইকে শাস্তি দেয়ার জন্য হিন্দু হয়েও একজন মুসলমানের কাছে সম্পত্তি বিক্রি করে। সেই মুসলমান অপর হিন্দু ভাইয়ের বাড়ির সামনে গরু জবাই করে। যার মাধ্যমে ধর্মনাশের আশঙ্কায়, অস্তিত্ব সংকট, নিরাপত্তহীনতা ও সম্প্রদায়িকতার অদৃশ্য চাপে সে ভাই রাতারাতি তার সয়-সম্পত্তি জমিজমা সবকিছু ফেলে রেখে ভারতে পালিয়ে যায়।
এখানে বেশ কিছু বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে যেমন দেশ-কাল-পাত্র নিয়ে এত খোলাখুলি উল্লেখ করা হয়েছে যে, এতে করে দ্বিতীয় চিন্তার অবকাশ নাই। সরাসরি সমাজে বিষয়টি প্রভাব ফেলবে। পরীক্ষা মাত্রই একটি নিয়ম পদ্ধতি অনুসরন করে শিক্ষা-ধারণা তথা জ্ঞানের গভীরতা যাচাই করা।
দেশ-কাল-পাত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হতে হয় কাল্পনিক। কিন্তু এক্ষেত্রে সেসব নিয়ম নীতি না মেনে একটি প্রতিবেশি দেশ এবং সমাজে বসবাসকারী দুই প্রতিবেশিকে সাক্ষাৎ শত্রুরূপে চিত্রিত করা হয়েছে। যা যে কোনও সাধারণ শিক্ষণীয় মানদন্ডের, সাধারণ আচরণের আওতার বাইরে।
আমাদের দেশের পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অনেকগুলো ধাপের মাধ্যমে নিরীক্ষিত হয়ে গৃহীত হয়। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী অবাক হয়েছেন। আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন দায়ী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করবেন। একজন শিক্ষক একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করেন, আরেকজন শিক্ষক সেই প্রশ্নপত্র মডারেট করেন, মডারেশনের পরে অপর শিক্ষক প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত করেন।
এইভাবে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রশ্নপত্র তৈরি হয়। যারা প্রশ্নপত্র প্রক্রিয়াকরণ প্রস্তুতকরণ মডারেশন চূড়ান্ত গ্রহণ ইত্যাদি পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন তাদেরকে সুনির্দিষ্ট ভাবে লিখিত নির্দেশনা দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয় বিষয় বস্তুর মধ্যে কি কি পরিত্যাজ্য হতে হবে। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া থাকে।
এতগুলো পর্যায় পার হয়ে আসার পরেও কি করে প্রশ্ন পত্রের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ভাবে হিন্দু মুসলিম এবং ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গটি অত্যন্ত খোলাখুলি এবং সুস্পষ্টভাবে মুদ্রিত হয়েছে, যা হওয়ার কথা ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা বৃন্দ বার বার উল্লেখ করছেন।
এই প্রসঙ্গে একটু পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখি নানা সময়ে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে কখনো সৃজনশীলতার নামে কখনো ধর্মের নামে কখনো সামাজিক সংস্কার সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে পরিবর্তন করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলের দাবির মুখেও পাঠ্যপুস্তকে মানসম্পন্ন পাঠ্য বিষয় বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে হিন্দু কবি বা গল্পকারের লেখা অজুহাতে ।
যা কিনা চরম সাম্প্রদায়িকতার পরিচয়। আর তা হয়েছে সুসংগঠিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দোহাই দিয়ে। অথচ তারা শান্তির ধর্ম অনুসারী বলে নিজেদের দাবী করে। অনেকেই যুক্তি দিয়ে বলেন সাম্প্রদায়িকতার শুরু সেখান থেকেই হয়েছে বা হয়ে থাকতে পারে। তারই ধারাবাহিকতায় আজকে প্রশ্নপত্রের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্প ছড়িয়ে দিয়ে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের মনোজগত উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিষিয়ে তোলা হচ্ছে।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায় এক সময় বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধা একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করা ছিল নিষিদ্ধ। ভিন্নভাবে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির পছন্দ অনুযায়ী সাজিয়ে পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন করা হয়েছিল। সেই প্রজন্মের সন্তানেরা এখন প্রকৃত ইতিহাসের সত্য জেনে চমৎকৃত হচ্ছে। অথবা সন্দেহের দোলায় দ্বিধায় আক্রান্ত হয়ে বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থান করছে।
এই দোলাচলের মধ্যে যেমন ব্যক্তিত্বের অভাব ঘটে, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় শক্তির সঞ্চার হয় না। তদুপরি সংস্কৃতি চর্চা পথ হারিয়ে ফেলে অথবা বন্ধ হয়ে যায়। পরিণতি দেশ প্রেমহীন একটি প্রজন্মের উত্থান। যাদের কাছে দেশ নয় দেশের মানুষ নয় দেশের মান নয় সর্বোপরি তারা নিজেরাই জানে না তারা কি চায়। কি তাদের করণীয় কোন উপায়ে তারা তা করবে।
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে যে সাম্প্রদায়িক বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে সন্নিবেশিত হয়েছে এটির গভীরে ষড়যন্ত্রের উল্লেখ করলে তা বাহুল্য বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কলেজ পর্যায়ে পরীক্ষার জন্য যে প্রশ্নপত্র তৈরি হয় তা একজন ডিগ্রীধারী কলেজ শিক্ষক প্রস্তুত করে থাকেন। লিখিত নির্দেশনার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারবেন না এমন শিক্ষক খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তাই যদি হয় যিনি প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেছেন, যিনি মডারেশন করেছেন, যিনি চূড়ান্তভাবে গ্রহণের অনুমোদন নিয়েছেন, দিয়েছেন। তারা সবাই মিলে উদ্দেশ্য মূলক ভাবে জেনে বুঝে কাজটি করেছেন। তাদেরকে চিহ্নিত করা খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু হতাশার দিক হলো আমাদের দেশে যখন যে পর্যায়ে কোনোরকম অঘটন ঘটে তার জন্য অনতিবিলম্বে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়।
সময় নষ্ট না করে সেসব কমিটি প্রায় ক্ষেত্রেই কাজ শুরুও করে । তদন্তের ফলাফল যথাসময়ে যথাস্থানে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু জানা সম্ভব হয় না, জানা যায় না তদন্তে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের শাস্তি বিধানের কথা। ধারাবাহিকভাবে এইরকম একটি সংস্কৃতি চালু আছে বলেই আমাদের দেশে বার বার একই রকম অপরাধ ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত হয়।
কেননা এর জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হয় না। তাছাড়া কোনও পর্যায়েই জবাবদিহির কোনো বালাই নাই। যার যেমন খুশি তেমন উদ্দেশ্য অনুযায়ী তা সাম্প্রদায়িকই হোক আর স্বদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধেই হোক নিজের মতবাদ অনুযায়ী তা করতে পারাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারো ভাষায় তা বিপ্লব, কারো ভাষায় তা হাসিল অথবা কামিয়াবী, কারো কাছে হয়তো সার্থকতা।
আমরা এই সমস্ত শব্দের বেড়াজালে শেষ পর্যন্ত আসল সত্য আসল শব্দ হারিয়ে ফেলি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবাদ মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের এই সাম্প্রদায়িক সংযোজন নিয়ে আলোচনা হবে, বিরোধিতা হবে, পক্ষে-বিপক্ষে নানান কথা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কাজির গরু, কাজির গোয়াল, কাজির খাতা যেমন ছিল তেমনি থাকবে।
এই দুঃসময়, এই দুরাচারী মনোভাব, এই ব্যক্তি ও সমাজের প্রতি দায়হীনতা, ব্যক্তিগত খায়েশমত যাচ্ছেতাই করার মাধ্যমে কামিয়াব হওয়া কঠোর হস্তে দমন না করা পর্যন্ত, শাস্তির আওতায় না আনা পর্যন্ত, জবাবদিহিতার আওতায় না আনা পর্যন্ত কোন সুষ্ঠু সমাধান আশা করা দূরাশা না হোক।


