‘শামীম ওসমান ত্বকী হত্যার নির্দেশদাতা’- রফিউর রাব্বি
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২২, ০৬:৫৫ পিএম
# ত্বকীর ঘাতকরা সর্বক্ষেত্রে সকল অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে : রফিউর রাব্বি
‘শামীম ওসমান ত্বকী হত্যার নির্দেশদাতা। শামীম ওসমানের বিচার করার ক্ষমতা শেখ হাসিনার নাই। এই কথা ভাবলে লজ্জায় আমাদের মাথা নত হয়ে যায়। আমাদের ঘরের সন্তান ঘর থেকে বেরিয়ে সুধীজন পাঠাগারে এসেছে আজ পর্যন্ত সেই সন্তান ফেরত আসেনি। সেই সন্তানকে আমরা কবর দিয়ে পরে তার হত্যার বিচার চাই।
আর আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী বলে আমি ওসমান পরিবারের সাথে আছি। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই আপনি ওসমান পরিবারের সাথে সারা জীবন থাকেন, আমাদের আপত্তি নাই। আমাদের সন্তান হত্যার বিচার আপনি করেন। যদি না করতে পারেন তাহলে শেখ রাসেলের হত্যার বিচার করেছেন কেমন করে। রাসেল আপনার ভাই আর ত্বকী আমাদের সন্তান। কেন এই সন্তানের কোন দাম নেই?
তনু, সাগর রনি তাদের কি কোন গুরুত্ব নেই। আর শুধু গুরুত্ব আছে আপনার বেলায়। আর যদি এমনেই চলে তাহলে আমাদের কিছু বলার নেই।’ তানভীর মুহাম্মতদ ত্বকী হত্যার ১১৬ মাস উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এড. মাহবুবুর রহমান মাসুম।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা প্রতিমাসে মোমবাতি হাতে নিয়ে একটি দাবি জানাই ত্বকী হত্যার বিচার চাই। একটা দেশে ৩০ লক্ষ লোক প্রাণ দিয়েছে, ২ লক্ষ মা বোন সম্ভ্রম দিয়েছে। একটা পতাকা এসেছে ।একটা মানচিত্র এসেছে। একটা গণতান্ত্রিক সরকার দেশে শাসন করবে। এটাইতো হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু আজকে ১১৬ মাস লজ্জার কথা দুঃখের কথা যে বার বার বলতে হচ্ছে ত্বকী হত্যার বিচার চাই কার কাছে চাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই যে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন এই যে আলো এই আলো একদিন সারা দেশে জ্বলে উঠবে। এবং আপনার এই মনোভাবকে এই আলো পুড়িয়ে ফেলবে। আমি আগেও বলেছি এখনও বলছি আপনি ত্বকী হত্যার বিচারের জন্য বলতে বাধ্য হবেন। এই কারণে যে একটা সন্তানকে হারিয়ে আমরা রাজপথে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমরা বারবার এই রাজপথে চিৎকার করেছি।
আমরা দেখেছি আপনি ওইদিন নাসিম ওসমান সেতু উদ্বোধনের দিন পরিবারের এমন গুনগান গাইলেন। মনে হয় বাংলাদেশে ওসমান পরিবার ছাড়া আর কোন পরিবার নাই। আপনি আর কাউকে চিনেন না। যেভাবে বলেছেন, যার কথা বলেছেন, ৬ দফা আন্দোলনের তিনি বিরোধী ছিলেন। এই ৬ দফা আন্দোলনকে তিনি সমর্থন করেননি।
সেই মানুষটার কথা আপনি বলেছেন আপনি অনেক বলেন, আমাদের কোন আপত্তি নাই। ওসমান পরিবারকে আপনি বার বার দেখেন আমাদের কোন আপত্তি নাই। আমাদের কাছে রাজনীতিটা মুখ্য না। আমরা আমাদের সন্তান হত্যার বিচার চাই। আর এই দাবি যদি পূরণ না করেন তাহলে আর ক্ষমতায় আসতে হবে না। এই ক্ষমতার স্বপ্ন দেখবেন না।’
কর্মসূচিতে ত্বকীর বাবা ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহবায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, ‘যেখানে গণতন্ত্র থাকেনা, দুর্বৃত্ত্ব শক্তি হয় সর্বশক্তিমান; সেখানে বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন হতে পারে না, সেখানে সুশাসন থাকে না। ত্বকী হত্যার দশ বছর হতে চলল অথচ এখনো পর্যন্ত তৈরী করে রাখা অভিযোগপত্রটি আদালতে পেশ করা হয় নাই।
রাষ্ট্রক্ষমতায় জোর করে থাকতে গিয়ে সরকার বিচার ব্যবস্থার টুটি চেপে রেখেছে। জনগণকে বাদ দিয়ে মাফিয়াদের উপরে নির্ভর করেছে সরকার। এই মাফিয়াচক্র শুধু ত্বকীকে হত্যা করেনি তারা দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি সবকিছুকে ধ্বংস করেছে। সরকার এদের পৃষ্টপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে।
ত্বকীর ঘাতকরা সরকারের ছত্রছায়ায় সিন্ডিকেট করে নারায়ণগঞ্জে পরিবহন থেকে শুরু করে সর্ব ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, মাদক ব্যাবসা, বালু চুরি, তেল চুরি সহ সকল অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে।’
তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনি বলেন, শিশু হত্যাকারীরা ঘৃণ্যজীব- আবার ত্বকীর ঘাতকদের পুরস্কৃত করেন। সংবিধান বলছে, রাষ্ট্রের চোখে সকল নাগরিক সমান। কিন্তু আজকে ভিন্ন বাস্তবতা তৈরী হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এ বৈষম্যমূলক, গণবিরোধী বিচার-ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। সংবিধানে উল্লেখিত জনগণের অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন চাই। সাগর-রুনী, তনু সহ, নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত সকল হত্যার বিচার চাই।’
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভবানী শংকর রায়ের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শাহীন মাহমুদের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন নিহত ত্বকীর বাবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এড. এবি সিদ্দিক, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের যুগ্ম আহ্বায়ক দৈনিক খবরের পাতার সম্পাদক এড. মাহাবুবুর রহমান মাসুম।
শিশু সংগঠক রথীন চক্রবর্তী, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি এড. প্রদীপ ঘোষ বাবু, সিপিবি জেলা সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, ন্যাপ জেলা সাধারণ সম্পাদক এড. আওলাদ হোসেন, বাসদের জেলা সংগঠক এসএস আবদুল কাদির, গণসংহতি আন্দোলন জেলার সমন্বয়ক তরিকুল সুজন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি মাহমুদ হোসেন, শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমির সভাপতি মাইনুদ্দিন মানিক প্রমূখ।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নগরীর শায়েস্তা খাঁ রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দু’দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই বছরের ১২ নভেম্বর আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে জানা যায়, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
৫ মার্চ ২০১৪ তদন্তকারী সংস্থা র্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, ‘নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাদেরই টর্চারসেলে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। অচিরেই তারা অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করবে।’
কিন্তু সে অভিযোগপত্র আজো আদালতে পেশ করা হয় নাই। ত্বকী হত্যার পর থেকে বিচার শুরু ও চিহ্নিত আসামীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রতি মাসের ৮ তারিখ আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট। এন.এইচ/জেসি


