Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

চনপাড়া বস্তির অতীত-বর্তমান জুড়ে এক বজলু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২২, ০৬:২৪ পিএম

চনপাড়া বস্তির অতীত-বর্তমান জুড়ে এক বজলু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে
Swapno



# অপরাধ সংগঠিত না হলে কেউ খবর রাখে না
# আগে জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ
# দরকার র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির যৌথ অভিযান


রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তির অতীত ও বর্তমানের সকল প্রকার অপরাধ জুড়ে রয়েছে এক ব্যক্তি। প্রকাশ্যে গোলাগুলি, অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজীর ঘটনায় নাম ওঠা এক ব্যক্তি বজলু মেম্বার। বারংবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় চানপাড়া এলাকার অপরাধ দিন দিন বেড়ই চলছে।

 

 

ফলে চনপাড়ার অপরাধ ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের বাইরে চলে গেছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এদিকে চানপাড়া বস্তি এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুরুর দিকে কেউ এগিয়ে আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা।

 

 

তারা মনে করেন, চনপাড়ায় সামাজিক অপরাধের পাশাপাশি, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও লুটতরাজ আগে থেকেই সংগঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু তখন কেউ মুখ খোলে নাই, যতটা  স্বোচ্চার বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিন হত্যাকাণ্ডের পর হয়েছে। চানপাড়ার এলকার অপরাধ তথ্য খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ২০২১ সালের জুলাই মাসে টানা চার দিন সংর্ঘষের ঘটনা ঘটে।

 

 

সে সময় শতাধিক মানুষ আহত হয়। বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ভয়ে বস্তি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিল সাধারণ মানুষজন। ওই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মূলহোতা হিসেবে নাম উঠে আসে বজলু মেম্বারের। এ ঘটনার সময় পুলিশ বজলুর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রসহ বেশকিছু ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করে।

 


এসব ঘটনায় রূপগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মারুফ ও পরেশ বাগচি বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা করেন। উপ-পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মারুফ বাদি হয়ে দায়েরকৃত মামলায় (এঅআইআর নং-১১) ১৪ জনের নাম উল্লেখ করেন।

 

 

তাদের মধ্যে ৭ নম্বর আসামী বজলুর রহমান ওরফে বজলু মেম্বরের সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়, দাঙ্গা, হাঙ্গামা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তার বাড়িতে বিভিন্ন ধরণের দেশী ও মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করেছে এবং তার বাড়িতে অনেক লোকজন জমায়েত করা হয়েছে। উক্ত খবরের ভিত্তিতে পুলিশের একটি দল বজলুর বাড়িতে অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়।

 

 

পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অজ্ঞাত আসামীরা বজলুর বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এর পর বজলুর চার তলা বাড়ির চতুর্থ তলা থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এক নম্বর আসামী শাহজালালের কোমরে ডান পাশের্^ গোজা অবস্থায় কালো রংয়ের গ্রিপসহ ট্রিগার ও সিলিন্ডারযুক্ত একটি রিভালভর জব্দ করা হয়।

 

 

যাহার সিলিন্ডারে ৬টি চেম্বার আছে, ব্যারেলের দৈর্ঘ্য ২ ইঞ্চি। এছাড়া অন্যান্য আসামিদের তথ্যমতে  ১টি কাঠের বাটসহ একপাশে ধারালো ৩২ ইঞ্চি ছোরা, ১টি ২৮ ইঞ্চি ছোরা, ১টি লোহার হাতলযুক্ত ৩৪ ইঞ্চি ছোরা, ২টি রামদা, ১টি চাপাতি, ২টি ছ্যান দা, ১টি সুইচ গিয়ার উদ্ধার করা হয়।

 


জানা গেছে পুলিশ বাদি হয়ে দুটি মামলা দায়ের করে পুলিশ আর সামনে আগাতে পারেনি। একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও অর্থের বিনিময়ে পুলিশ সদস্যদের থামিয়ে দেয়। মূলত ওই সংসদ সদস্যর জন্য বজলু বিভিন্ন স্থানের প্লট ব্যবসা, বালুনদীর চাঁদাসহ বিভিন্ন অপরাধের কমন্ডার হিসেবে কাজ করে।

 

 

মামলাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের ডিবি কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, এ মামলার তদন্ত শেষ করে তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। মামলাটি নিয়ে পুলিশের হাতে আর কোন কাজ নেই। চনপাড়া এলাকায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজী এমনকি জমি দখলের ঘটনার প্রতিবাদে কেউ এগিয়ে আসেনি।

 

 

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি গণমাধ্যম এতোদিন নিরব ভূমিকা পালন করেছে। বুয়েট ছাত্র ফারদিন হত্যাকাণ্ডের পর একযোগে সবাই স্বোচ্চার। এলাকাবাস ও পুলিশের বরাত দিয়ে বলা হয়, চনপাড়ায় বেশিরভাগ মাদকের চালান ঢোকে নদীপথে। অভিনব কায়দায় স্থলপথেও আনা হয় মাদকের ছোট-বড় চালান। অস্ত্রের কেনা-বেচাও চলে এখানে।

 

 

চনপাড়ার ভেতরে শতাধিক চিহ্নিত মাদকের স্পট রয়েছে। এসব মাদকের অন্তত ২০০ ডিলার রয়েছে। যাদের ছত্রছায়া হয়ে আছে বজলু মেম্বার। ওই বস্তিতে প্রতি মাসে প্রায় চার কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকার মাদক বেচাবিক্রি হয়। এছাড়াও জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।

 

 

প্রতি মাসে চানপাড়া এলাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা চলে যায় থানা পুলিশ, ডিবি, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তিদের পকেটে। চনপাড়া এলাকার এমন অপরাধ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও আন্তর্জাতিক অপরাধবিজ্ঞান সোসাইটির পরিচালক ড. জিয়া রহমান বলেন, দুর্ভাগ্য হচ্ছে এই, কোন একটা ঘটনা ঘটার পর আমরা জানি।

 

 

এই চনপাড়ায় এতোবড় একটা মাদকের আখড়া আরো আগে আমাদের জানা উচিৎ ছিল। আগে থেকেই এসব দমন করা গেলে এমন ঘটনা আগে ঘটতো না। তিনি মনে করেন, একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমরা যেন শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার দিকেই নজর দিয়ে স্বস্তি না খুঁজি।

 

 

আমাদেরকে  প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের দিকেও সফলভাবে এগোতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে অপরাধ কমিয়ে আনা যাবে না।চনপাড়া বস্তির অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের প্রচারে এখন মাদকের জন্য খুবই পরিচিত একটি স্থান।

 

 

সেখানে আইনশৃখলা রক্ষাবাহিনী অপরাধ দমনে চূড়ান্ত অর্থে কি আদৌ কোনো উদ্যোগ নিয়েছে? তাদের কৌশলগুলো সেখানে কতটা কার্যকর ছিল? যদি তা না থাকে তাহলে শুধু পুলিশ নয়, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফর, দুুদকসহ রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

 

জল ও সড়ক পথের জন্য সেখানে অভিযান পরিচালনা করা নাগেলে, নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি প্রয়োজনে বিজিবি নিয়ে যৌথ অভিযানে চনপাড়া এলাকা মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ নির্মূল করার কথাও বলছেন তিনি। চনপাড়া বস্তি এলাকার অপরাধ দমনে পুলিশিং কৌশলের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া বলেন, কোন এলাকার সবাই মাদক ব্যবসায়ী নন।

 

 

হাতে গোনা কয়েকেজন অপরাধী অপরাধ করে। তাদের বিরুদ্ধে জনগণ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে পুলিশকে।

 

 

আর যদি জনপ্রতিনিধি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যায়, সবার আগে আইনানুগ ব্যবস্থা সম্পন্ন করে জনপ্রতিনিধিকে গ্রেফতার করতে হবে। শুধু গ্রেফতার নয় মাদক ও সমাজিক অপরাধের জন্য পুলিশ জনগণকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়তে পারলে প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক এই কর্মকতা।  এন.এইচ/জেসি 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন