শওকতকে বরখাস্তের দাবি তুলে স্থানীয় মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:৪৫ পিএম
# শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাপতি এমপি চুন্নুর সুপারিশ
# তার বিরুদ্ধে পাহাড় পরিমাণ দুর্নীতির অভিযোগ
# ফেঁসে যাচ্ছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার বক্তাবলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলীর দুর্নীতির নিয়ে বক্তাবলীর মানুষ মুখ খুলতে শুরু করেছে।
একই সাথে তার নানা বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত করে শওকত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়।
তার বিরুদ্ধে দেয়া অভিযোগ নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক ইসমত আরা তদন্তের দায়িত্ব পান। তবে তার তদন্তের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে স্থানীয় জনগণ তদন্তকারী পরিবর্তনের জন্য পুনরায় দুদকে অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান তাতে সুপারিশ করেন।
এবার দুদকের পর গত ১৬ নভেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর বক্তাবলী ইউনিয়নরে চেয়ারম্যান শওকত আলীকে চেয়ারম্যান পদ হইতে সাময়িক এবং স্থায়ীভাবে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আবেদন করা হয়। এই আবেদনেও কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের এমপি এবং শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মজিবুল হক চুন্নু অভিযোগের বিষয় বিবেচনার জন্য সুপারিশ করেন। আর এতে করে সচেতন মহলে আলোচনা হচ্ছে এবার শওকত চেয়ারম্যান ফেঁসে যাচ্ছেন। এত সহজে পার পাচ্ছেন না।
এদিকে ১৬ নভেম্বরের অভিযোগে উল্লেখ্য করে বলা হয় , নারায়ণগঞ্জ জেলা ফতুল্লা থানার চরবক্তাবলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো শওকত আলীর অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতা অপব্যবহার করে হত দরিদ্রদের অর্থ আত্মসাতসহ অন্যান্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়। সেই সাথে তার চেয়ারম্যান পদ হইতে সাময়িক বরখাস্ত সহ স্থায়ীভাবে বরখাস্তের কথা বলা হয়।
এছাড়া অভিযোগে উল্লেখ্য করে বক্তাবলীবাসী জানান, ২০১০ সাল হইতে অদ্য পর্যন্ত আমাদের বক্তাবলীর চেয়ারম্যান শওকত আলী চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তিনি ১৯৯৭ সালে চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে অগ্রনী ব্যাংক কালীর বাজার শাখায় ২৪ লক্ষ ৬৮ হাজার টাকা ঋণ খেলাপি ছিলেন।
যা অফিসিয়াল ডকুমেন্ট চেক করিলে তার সত্যতা পাওয়া যাবে। তখন এই জন প্রতিনিধির ফতুল্লার ৮ শতাংশ জমির উপর ১টা টিনের ঘর ছিল। কিন্তু বক্তাবলীর চেয়ারম্যান হওয়ার পর তার ভাগ্য বদলে যায়। অভিযোগে বলা হয়, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং পরিবেশ আইন অমান্য করে চরবক্তাবলী ইউনিয়নের উত্তর গোপালনগর গ্রামের মধ্যে ইটভাটা তৈরী করেন।
অথচ তার পাশের গ্রামে ২টি স্কুল, ১টি মাদ্রাসা, মসজিদ আছে। সেই সাথে পাকা রাস্তা-ঘাট আছে। পরিবেশ আইন অনুযায়ী ইটভাটা স্থাপন করা যায় না। এই শওকত চেয়ারম্যান গ্রামের নিরীহ কৃষকের ফসলী জমির উর্বর মাটি কেটে তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে তার ইটভাটায় জোরপূর্বক মাটি নিয়ে যায় বলে জানান এলাকাবাসি।
অভিযোগে আরও উল্লেখ্য করা হয় ক্ষমতাসীন দলের এই চেয়ারম্যান দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করে বর্তমানে নামে বেনামে বহুতলা বিশিষ্ট ৩টি বাড়ী নির্মাণ করেছে যাহার বর্তমান মূল্য প্রায় ৩০ কোটি। তার ৫ টি ইটভাটা যাহার মূলা ২০ কোটি টাকা, ৫টি বল্কহেড জাহাজ যাহার মূল্য ১৫ কোটি টাকা, বক্তাবলী ফেরিঘাটে তার ১টি হৃদয় স্টীল মিল আছে যার বর্তমান মূল্য ৫০ কোটি টাকা।
চেয়ারম্যান হওয়ার পূর্বে নামমাত্র বাড়ীর মালিক ছিলেন বটে তিনি। চেয়ারম্যান হওয়ার পর ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে ১৫০ কোটি টাকার মালিক হয়েছে। উক্ত বিষয় নিয়ে এলাকার সাধারণ জনগণ দুর্নীতিদমন কমিশনে আবেদন অভিযোগ করেন। তার দূর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দূর্নীতিদমন কমিশন তদন্ত করতেছে।
তাছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে প্রেরিত হতদরিদ্রদের টাকা ইউনিয়ন পরিষদের সহকারী সচিব টিটুকে দিয়ে চরবক্তাবলী ইউনিয়নের কানাইনগর রূপালী ব্যাংক লি. শাখায় ভূয়া নামে ৯টি ওয়ার্ডের প্রায় ১ হাজারটি ভুয়া একাউন্ট খুলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেরিত হতদরিদ্রদের টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে বলা হয়। তা নিয়ে গোপনে তদন্ত করলে অফিসিয়াল ডকুমেন্টে প্রমাণ পাওয়া যাবে।
ইউনিয়নের সহকারী সচিব টিটুর টিপ সহি বা সহি দিয়া উত্তোলন করিয়াছে যাহা ফিংগার প্রিন্ট পরীক্ষা করলে ধরা পড়বে। তাছাড়া তার স্বসস্ত্র গুন্ডাবাহিনী তৈরী করে এলাকায় আশের রাজত্ব কায়েম করেছে। যে তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুলবে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে রাখা হয়।
সেই সাথে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেল খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। চেয়ারম্যানের এমন কার্যকলাপে এলাকার জনগণ ভয়ে দিন যাপন করছে। এজন্য তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ সহ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্তসহ স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার দাবী জানানো হয়।
এর আগে গত ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশ দুদকে অভিযোগ তুলে অভিযোগ করা হয়। ওই অভিযোগে উল্লেখ্য রয়েছে, বক্তাবলীর ঘাট টেন্ডার, ইট ভাটার বার্থিং টেন্ডার, ফেরি ঘাটসহ ইউপি র্নিবাচনে মেম্বার প্রার্থীদের থেকে টাকা নেয়ার অভিযোগ, তাছাড়া কমিটি বাণিজ্য সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকে দেয়া অভিযোগে উল্লেখ্য করে বক্তাবলীবাসী জানান, মানুষের জমি কেটে ইট ভাটা মাটি নেন এই আওয়ামী লীগ নেতা। আমরা বক্তাবলী এলাকার নদী বেষ্টিত এলাকার সাধারন হত দরিদ্র্ বেশীর ভাগ জনগোষ্ঠী কৃষির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের বক্তাবলী রহমান মুন্সির ছেলে ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলীর ক্ষমতার দাপটে এলাকার জনসাধারনের কৃষি আবাদী জমির মাটি কেটে, তার নিজের ইটের ভাটায় জোরপূর্বক নিয়ে যায় এবং অন্যত্র নিয়ে বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
একই সাথে আবাদী জমি ১০/১৫ ফুট গভীর করে জমিগুলিকে চিরতরে চাষাবাদের অনপুযোগী করে ফেলছে । নদীর পাড়ে জেগে উঠা চর অত্যাধুনিক ক্রেন ব্যবহার করে, মাটি কেটে ইট ভাটায় নিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা বিক্রয় করে বাণিজ্য করছে প্রায় ৫ বছর যাবত। আর এতে করে গত ৫ বছরে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে।
বি.আই.ডব্লিউ.টি এ প্রতি বছর বার্থিং এর যে টেন্ডার হয় তখন তিনি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অন্য কাউকে সিডিউল ক্রয় করতে না দিয়ে তাতে বাধাগ্রস্থ করে এককভাবে তার লোক দিয়ে ৩ লক্ষ টাকায় বার্থিং টেন্ডার নেন। বক্তাবলী এলাকায় প্রায় ৭২টি ইট ভাটা রয়েছে। প্রতিটি ইটভাটা থেকে বার্থিং এর জন্য ২ লক্ষ টাকা নেয়া হয়। এতে মোট টাকা দাঁড়ায় ১ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকা। এখানে সরকার প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
এলাকার ৭২ টি অবৈধ ইটভাটার সভাপতি এই প্রভাবশালী শওকত চেয়ারম্যান । ক্ষমতার দাপটে ১৫ বৎসর যাবত এই পদ দখল করে আছেন এবং প্রতিটি ইট ভাটা থেকে প্রতিবছর পরিবেশ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ইটভাটা চলাকালীন সময়ে ভেকু দিয়ে ইটভাটা ভাঙ্গার ভয় দেখিয়ে প্রতিটি ভাটা থেকে ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন।
আর পরিবেশ অধিদপ্তর জেলা শাখায় দেয় ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা । বাকী ৬ থেকে ৭ লক্ষ টাকা তিনি নিজে আত্মসাৎ করে। এতে ৭২টি ইটভাটা থেকে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেন এই প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ বছর যাবত শওকত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থেকে প্রধানমন্ত্রীর মহোদয়ের বিশেষ বরাদ্ধকৃত হতদরিদ্রদের টাকা তাদেরকে না নিয়ে নিজে আত্মসাৎ করে। অন্যদিকে বক্তাবলীর তহসিল অফিসের তহশিলদারদের যোগসাজশে মানুষের জমি খারিজ মিউটেশন নামে বেনামে তৈরি করে; সেই জমি তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে জমি দখল করে শত শত কৃষককে নিঃস্ব করেছে ।
বক্তাবলী খেয়াঘাটের টেন্ডার প্রায় ১৫ বছর যাবত তার নিয়ন্ত্রণে চলছে। তার প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাউকে সিডিউল কিনতে না দিয়ে তাঁর ছেলের নামে নামমাত্র টাকায় ডাক নিয়ে আসে। অথচ সবাই যদি ওপেন সিডিউল কিনতে পারতো তবে প্রতি বছর ডাক আসতো প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা।
অথচ তিনি তার ছেলের নামে ৭ থেকে ১০ লক্ষ টাকায় টেন্ডার নিয়ে আসে। এখানে সরকার প্রতিবছর রাজস্ব হারাচ্ছে ২৫ লক্ষ টাকা। এমনিভাবে ১৫ বছরে সরকারের ৩ কোটি ৭৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সে আত্মসাত করে আসছেন। এছাড়া বক্তাবলী ফেরিঘাট প্রায় ১০ বছর যাবত কাউকে সিডিউলই কিনতে না দিয়ে তার ক্ষমতা অপব্যবহার করে তার পিএস বাধন এন্টারপ্রাইজ এর প্রোপ্রাইটর আনোয়ারের নামে মাত্র ১৯ লক্ষ টাকা দিয়ে ডাক আনে।
কিন্তু ওপেন সিডিউল কিনার সুযোগ থাকলে তা ১ কোটি টাকা দাঁড়াতো। সওজ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রতি বছর ডাক নেওয়ার নিয়ম থাকলেও সে প্রভাবে খাটিয়ে ৩ বছরের ডাক একসাথে নিয়ে আসে। এতে করে সরকার ১০ বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে।
তাছাড়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটি থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা উৎকোচ নিয়ে ক্ষমতার দাপটে তাঁর ইচ্ছা মতো নেতা কমিটিতে পদ দেয়, বলে অভিযোগ উঠে। আর এমপি সাহেবের দোহাই দিয়ে পকেট কমিটি তৈরী করে। এতে প্রায় ১ কোটি টাকার উপর আত্মসাৎ করে।
বক্তাবলী খেয়াঘাটের সন্নিকটে জোরপূর্বক জায়গা দখল করে তার ছেলে হৃদয় এর নামে হৃদয় স্টীল মিলস স্থাপন করেছে। অথচ এই জায়গা তার বংশের কোন ওয়ারিশকেও বিন্দু পরিমাণ দখল দেয় নাই এবং তার পাশেই আরেকটি বালির ব্যবসা দিয়েছে, জোর পূর্বক জায়গা দখল করে। যার ফলে পরিবেশের অনেক ক্ষতিসাধণ করে। এলাকায় সে তার নিজস্ব সিন্ডিকেট বাহিনী গড়ে তুলেছে।
তাদের দিয়ে সাধারণ মানুষের জমির অংশ কিনে মানুষকে হয়রানি করে এবং বিচার সালিশের নামে অন্যায়ভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়। সাধারন মানুষ তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তার কাছে জিম্মি হয়ে আছে। এছাড়া এলাকার এল.জি.ই.ডি কাজ ও ইউনিয়নের ১% কাজ তার পিএস আনোয়ারকে দিয়ে নিম্ন মানের কাজ সম্পন্ন করে সে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।
এলাকাবাসীর মতে, এই শওকত চেয়ারম্যানের বর্তমানে ৪/৫টি বাড়ী, ৫/৬টি শিপিং জাহাজ এছাড়াও নামে বেনামে বেশ কয়েকটি ইটভাটা রয়েছে। তার সঠিক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দাবী জানিয়ে স্থানীয়রা দুদকে অভিযোগ দেন তার বিরুদ্ধে।
অথচ গত ২৫ বছর আগেও তিনি এত সম্পদের মালিক ছিলেন না। তিনি একজন সাধারন পরিবারের লোক হয়ে সাদা মাটা জীবন যাপন করতেন। চেয়ারম্যান হওয়ার পর তার জীবন ধারন বদলে যায়। তবে তার এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি সকল অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন।


