# ওভার টাইম না থাকায় শ্রমিকরা অর্থ সংকটে
# প্রতিনিয়ত ছাঁটাই আতঙ্কে থাকেন শ্রমিকরা
নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল বিসিকের বেশির ভাগ তৈরী পোশাক কারখানাগুলোর ক্রয়াদেশ বাতিল হবার কারণে এখানকার পোশাক কর্মীদের জীবন এখন সংকটে। শ্রমিকরা এখন অনিশ্চয়তার জীবন অতিবাহিত করছেন। দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেতন না বাড়ানো, ওভারটাইম (ও.টি) না হওয়া এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আতঙ্কে তারা এখন সময় পার করছেন। বিভিন্ন কারণে আজ বাংলাদেশে কর্মসংস্থান গুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর এই সংকটাপন্ন সময়ে গার্মেন্টস এর শ্রমিকদের করার কারনে তাদের জীবন এখন সংকটাপন্ন। ক্রয়াদেশ না খাকার কারনে কারখানা গুলোতে ওভার টাইম করানো হচ্ছে না।
বিসিকের অবন্তি কালার টেক্স লিমিটেডের পোশাক কর্মী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, গার্মেন্টস এর বেতন আর কয় টাকা। ওভার টাইম না করলে সংসার চলে কিভাবে। তিনি আরোও বলেন, আমাদের মূল বেতন ৫ হাজার টাকা প্রায়। আর সাথে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, খাদ্য আর চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হয়। যদিও এগুলো নামকা ওয়াস্তে। কারণ এই ভাতা বাবদ যে টাকা দেওয়া হয় তা দিয়ে ঐ প্রয়োজন মেটানো কখনোই মেটানো সম্ভব নয়। বরং মূল বেতনের টাকা দিয়ে এসব খাতে আমাদের ভর্তুকি দিতে হয়। এতো কিছুর পরও যে টাকা থাকে তা দিয়ে জীবন চালানো দুর্বিসহ।
শেষে তিনি বলেন, প্রতিনিয়ত সব কিছুরই দাম বাড়ছে। এই বেতন দিয়ে আমরা আর দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে পাল্লা দিতে পারছিনা। আমরা জানি তৈরী পোশাক শিল্পের এই খাতে বিত্তহীন, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় দশ লাখেরও বেশি মহিলা শ্রমিকের কর্মসংস্থান সম্ভব হওয়ায় জাতীয় জীবনে বেকারত্ব হ্রাসে ও স্বাবলম্বী জীবন ব্যবস্থায় এই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু বর্তমান বিসিকের গার্মেন্টস গুলোতে ক্রয়াদেশ বাতিলের কারণে অনেক শ্রমিককে ছাঁটাই করা হচ্ছে। এদিকে বিসিকের ছোট ছোট গার্মেন্টস গুলো ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
বিসিকের আরেক গার্মেন্টস ফকির এ্যাপারেলস লিমিটেডের পোষাক কর্মী শিউলী আক্তার বলেন, এখন ওভার টাইম কমে গেছে। আগে ৭ টা পর্যন্ত ডিউটি হতো, আর এখন প্রতিদিন ৫ টায় ছুটি হয়। ওভার টাইম না হলে এই বেতনে সংসার চালানো দায়। তিনি আরোও বলেন, দিনে দিনে জিনিস পত্রের যে হারে দাম বাড়ছে তাতে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা দায়। বিসিকের আরেক শ্রমিক ইমতিয়াজ বলেন, কারখানায় কাজের অবস্থা ভালো না। ওভার টাইম না হওয়ায় আমাদের জীবন সংকটে। এই বেতনে একা কাজ করে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে সংসার চালানো দায়।
এনআর গার্মেন্টস এর শ্রমিক মোঃ হানিফ মিয়া বলেন, আমাদের গার্মেন্টস এ শ্রমিক ছাঁটাই করছে। কারণ হিসেবে তিনি জানান, বৈশ্বিক পরিস্থতি ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্রয়াদেশ বাতিল হবার কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিকের একজন কারখানা মালিক জানান, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে পোশাক শিল্প চরম সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আন্দাজ করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।
প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় স্টক ক্লিয়ারেন্স সেল দিয়েও পোশাক বিক্রি বাড়ানো যাচ্ছে না। এ কারণে বিদেশি ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে চাচ্ছে না। এমনকি পুরোনো যেসব অর্ডার উৎপাদন শেষে শিপমেন্টের অপেক্ষায় আছে, সেগুলোও তারা নিতে চাচ্ছে না। ওয়্যারহাউজে সেসব পণ্য পড়ে আছে। ডেফার্ড পেমেন্টে সেসব পণ্য নেয়ার অনুরোধ জানালেও তাতে সাড়া দিচ্ছে না। তারা আরও বলেন, অর্ডার না আসার আরেকটি কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। দিনের বেশির ভাগ সময় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের চাপ থাকছে না। লোডশেডিংয়ের শিডিউলে বিপর্যয় নেমে এসেছে। কখন, কতক্ষণ লোডশেডিং হবে তা কেউ বলতে পারছে না। সব মিলিয়ে সামনের দিনে জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিদেশি ক্রেতারাও জ্বালানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। জ্বালানি সংকটের কারণে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দিতে পারবো কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে ক্রেতাদের মাঝে। নারায়ণগঞ্জের শিল্প মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই এলাকার কারখানাগুলোতে দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। অনেকে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বড় কারখানাগুলোয় দৈনিক গড়ে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার ডিজেল লাগছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে টেক্সটাইল মিলগুলোতে অনেক আগে থেকেই গ্যাস সংকট রয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় চাপ থাকছে না। ঘন ঘন লোডশেডিং ও গ্যাসের চাপ ওঠানামার কারণে কারখানার যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল কমে যাচ্ছে।
অবস্থা এমনই বেগতিক যে, একদিকে অর্ডার নেই, অন্যদিকে দর কমাতে ক্রেতারা চাপ দিচ্ছে। অর্ডার দিলেও গ্যাস-বিদ্যুৎ, পরিবহণ খরচের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অর্ডার নেওয়াও যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অনেকে এখন শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কথাও ভাবছেন। করোনা মহামারিতেও পোশাক রপ্তানিতে ভালো সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের কারনে সামনে সে ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডাব্লিউটিও) প্রকাশিত বিশ্ব বাণিজ্য পরিসংখ্যান পর্যালোচনা ২০২২-এ দেখা যায়, বাংলাদেশ ২০২১ সালে বৈশ্বিক তৈরি পোশাক রপ্তানি বাজারে আবারও দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। ২০২০ সালে ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে তৃতীয় অবস্থানে ঠেলে দিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিল। আশির দশকের শেষভাগ থেকে তৈরী পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তৈরী পোশাক খাতের ভূমিকা প্রতি বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প-এর কৌশল হলো কম মূল্যে বিশ্ববাজারে উন্নত মানের পোশাক সরবরাহ করা। সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায় বলেই এটি সম্ভব হয়।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা অন্য যেকোনো বিবেচনায় বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত হলো পোশাক শিল্প। রিজার্ভ নিয়ে যে এত কথা, তার একটা বড় অংশ আসে রেডি গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে। কিন্তু সম্প্রতি সংকটের মুখে এই পোশাক শিল্প। বিশ্বজুড়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পোস্ট কোভিডের ধাক্কায় টালমাটাল অর্থনীতিতে নতুন মাথাব্যথার কারণ হতে যাচ্ছে পোশাক শিল্প। এর মূল কারণ হচ্ছে আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোর ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় গ্রাহক এসব দেশের বাজারে গত ২ মাসে ক্রয়াদেশ কমেছে প্রায় ২০-৩০ শতাংশ। এমন তথ্য জানিয়েছে পোশাক শিল্প রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম সংগঠন বিজিএমইএ। এসব বাজারে রপতানির জন্য পাইপলাইনে থাকা পণ্যের ক্রয়াদেশ স্থগিত হওয়ায় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ খুচরা বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের পণ্যের ক্রয়াদেশ স্থগিত হওয়া। ইউরোপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকখাতের বড় ক্রেতাদের অন্যতম এই প্রতিষ্ঠান।
যে কারণে বিষয়টি মাথাব্যথার কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা: বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চতুর্মুখী চাপে পড়েছে পোশাক শিল্প। বিশ্বমন্দার কারণে অর্ডার কমে গেছে। বিদেশিদের কাছ থেকে অর্ডার আনা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অর্ডার নিতে পারছি না। এ কারণে বিদেশি ক্রেতারাও অর্ডার দিতে সংকোচবোধ করছে। তার ওপর বন্ড-কাস্টমসের ঝামেলা তো আছেই। তিনি আরও বলেন, সরকার এই শিল্পকে পলিসি সহায়তা দেওয়ায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ সাপোর্ট না দিলে শিল্পের ভবিষ্যৎ কী হবে তা বলা মুশকিল।
শিল্পের স্বার্থে বাসা-বাড়ি এবং গাড়িতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া উচিত। তিতাসের হিসাবেই বাসা-বাড়িতে সবচেয়ে বেশি গ্যাসের অবৈধ লাইন রয়েছে। আর সেই চুরির দায় চাপছে শিল্প মালিকদের ওপর। যেহেতু বাসা-বাড়িতে গ্যাসের বিকল্প এলপিজি আছে, তাই এখনই শিল্পের স্বার্থে বাসা-বাড়িতে গ্যাস বন্ধ করে শিল্পে সরবরাহ করা উচিত। এতে অর্থনীতি চাঙা হবে, যার সুফল সবাই পাবে। তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, বৈশ্বিক মন্দার মতো আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানে আমরা চাইলেও করতে পারব না। কিন্তু দেশে সংকটগুলো যেমন গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি এবং ব্যবসা সহজীকরণের মতো পদক্ষেপগুলো নিতে পারি। স্থানীয় সংকটগুলো মোকাবিলা করা গেলে শিল্পের সক্ষমতা বাড়বে।
এস.এ/জেসি


