# ভিক্ষাবৃত্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে বিভিন্ন চক্র
# না’গঞ্জে প্রকৃত অসহায় ভিক্ষুক চেনা দায়
# শহরে বাড়ছে সুস্থ সবল ভিক্ষুকের সংখ্যা
# ভিক্ষুক পুনর্বাসনে নেই কার্যকরী উদ্যোগ
দেশের ধনী জেলাগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের অবস্থান অন্যতম। কিন্তু এই জেলায় গত দুই বছরে কয়েকগুণ বেড়েছে ভিক্ষুকের সংখ্যা। কোন একটি স্থানে দাঁড়ালেই তিন থেকে চার জন ভিক্ষুক ভিক্ষা চান। শহর কিংবা শহরের বাইরে বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলির মোড়ে, কাঁচাবাজারের মোড়ে, ওষুধের দোকানের সামনে, চায়ের দোকান অথবা বিপণিবিতান সামনে, বেশি যানজটের সড়ক ও ট্রাফিক সিগন্যালের এলাকায়, মসজিদের সামনে, বাস স্ট্যান্ডে, রেল স্টেশনে, লঞ্চ টার্মিনালে, বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে, শহরের শপিং মল গুলোতে শত শত ভিক্ষুক ভিক্ষা করছে।
যা অতীতের তুলনায় বিশেষ করে গত দুই থেকে তিন বছরের চেয়ে অনেক বেশি। অসহায় ভিক্ষুকদের পাশাপাশি পেশাদার ভিক্ষুকদের ভীড় দিনে দিনে বেড়েই চলেছে । দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ছাড়াও আরো অনেক কারণে বর্তমানে ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে পেশাদার ভিক্ষুকের সংখ্যা। ভিটামাটি আছে আবার স্বচ্ছল থাকার পরেও অনেকেই ভিক্ষা করে থাকেন। এমনটাই মনে করেন নারায়ণগঞ্জের একজন শিক্ষক এন. হোসাইন রনি। সারাদেশে ভিক্ষুক পুনর্বাসনে কাজ করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বহু পুরোনো জরাজীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। সমাজসেবা বিভাগের রয়েছে জনবল সংকট।
ভিক্ষাবৃত্তিকেন্দ্রিক চক্র, অপ্রতুল বরাদ্দ, সচেতনতার অভাব ও সমন্বয়হীনতার কারণেই মূলত ভিক্ষুকমুক্ত করা যাচ্ছে না। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সম্প্রতি ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়লেও পরিস্থিতি বিবেচনায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে দেশে ভিক্ষুকের কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ২০১০ সালে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করে সরকার। প্রথমে ঢাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জানা যায়, ২০১৩ সালে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নির্বাচন করা হয় ঢাকার সাত এলাকা। নয় বছর কেটে গেলেও ঢাকা শহর তো দূরের কথা, নির্ধারিত সাত এলাকাও এখনো ভিক্ষুকমুক্ত হয়নি।
গোটা শহরের হিসাব ধরলে ভিক্ষুক বেড়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ। মাঝে মধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ধরলেও রয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র সংকট। দু’চারজনকে অন্য পেশায় ফেরালেও কৌশলে তারা আবার ফিরছেন ভিক্ষাবৃত্তিতে। আরোও জানা গেছে,২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশপথের পূর্ব পাশের চৌরাস্তা, বিমানবন্দর পুলিশ ফাঁড়ি ও এর আশপাশের এলাকা, হোটেল রেডিসন সংলগ্ন এলাকা, ভিআইপি রোড, বেইলি রোড, হোটেল সোনারগাঁও, হোটেল রূপসী বাংলা (বর্তমানে ইন্টারকন্টিনেন্টাল) সংলগ্ন এলাকা এবং কূটনৈতিক জোনকে ভিক্ষুকমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তখন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন প্রমোদ মানকিন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ভিক্ষুকমুক্ত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে পুনর্বাসনের জন্য বিপুল সংখ্যক ভিক্ষুককে আটক করা হলেও ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা না থাকায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। চলতি অর্থবছরে মাত্র ১৪০ জন ভিক্ষুককে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের রয়েছে জনবল সংকট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি তোলারাম কলেজের একজন শিক্ষক জানান, অনেকে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।
পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কিংবা জীবিকার জন্য উপকরণ কিনে দিলেও তা বিক্রি করে তারা ফের ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে আসেন। এছাড়া ভিক্ষাবৃত্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন চক্র। এরা ভিক্ষাকে বাণিজ্যের অনুষঙ্গ বানিয়েছে। তিনি আরো জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান থেকে ভিক্ষুকদের আটক করা হলে এই চক্রের সদস্যরা তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে ফের ভিক্ষায় নামিয়ে দেয়। ভিক্ষা থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ এসব চক্রের পকেটে চলে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে নারায়ণগঞ্জকে ভিক্ষুকমুক্ত করা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকি বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোরও ভূমিকা আছে। জেলা প্রশাসকদেরও সক্রিয় ভূমিকা লাগবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নারায়ণগঞ্জের এক কর্মকর্তা বলেন, ভিক্ষুক পুনর্বাসনে বরাদ্দ আগের অর্থবছর পাঁচ কোটি টাকা থাকলেও এই অর্থবছর ছয় কোটি টাকা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পুনর্বাসন কার্যক্রম করা হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, কোনো ভিক্ষুককে প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি রিকশা কিনে দিয়ে পুনর্বাসন করার চেষ্টা করা হলে তারা এটি বিক্রি করে আবার ভিক্ষা করেন। শেষে তিনি বলেন, ভিক্ষুকমুক্ত করার কাজটি আসলে সমন্বিত কার্যক্রম। এটার সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন সম্পৃক্ত।শুধু সমাজসেবার একার কাজ এটা নয়। জানা গেছে, ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূলে ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান নীতিমালা-২০১৮’ করা হয়েছে।
যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি, পৌরসভা কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি, সিটি করপোরেশন অঞ্চলভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি, বিভাগীয় ও জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করে এ কমিটিগুলোর নির্দিষ্ট কার্যক্রম নির্ধারণ করা আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সমাজকর্মী বলেছেন, ভিক্ষুকের সংখ্যা নারায়ণগঞ্জ শহরে বাড়ছে এটা বিবেচনায় উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পরিচালনা, প্রচার, পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে।
ভিক্ষুক পুনর্বাসন করে তাদের বিভিন্ন অনুদান ও সহায়ক উপকরণ দিতে হবে। কর্মসংস্থান, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনে আবাসনের ব্যবস্থা করে এ শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে হবে। সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভিক্ষুকের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রবেশপথে, রিকশা বা বাসস্ট্যান্ড, বাসের ভিতরে ব্যাপকহারে বেড়েছে ভিক্ষুক। ফুটওভারব্রিজগুলোতেও ব্যাপক সংখ্যক ভিক্ষুকের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। আসলে কোথাও ভিক্ষুক কমেছে এমনটি দেখা যায় না।
জানা গেছে, চলতি বছর ভিক্ষুক পুনর্বাসনে ৬৪ জেলার জন্য ছয় কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এর আগের অর্থবছর বরাদ্দ ছিল পাঁচ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের ৫৮টি জেলা থেকে জেলা প্রশাসক ও সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালকদের যৌথ স্বাক্ষরিত চাহিদাপত্রে ২ লাখ ৩ হাজার ৫২৮ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের জন্য ৪২২ কোটি ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। ওই বছর বরাদ্দ পাওয়া যায় তিন কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে তিন কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। পরের বছর বরাদ্দ ছিল (২০১৯-২০) ৩ কোটি ৭ লাখ টাকা।
ভিক্ষুক পুনর্বাসনে এই বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, ময়মনসিংহের ত্রিশালের ধলা, গাজীপুর পুবাইল, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল, গাজীপুরের কাশিমপুর, মানিকগঞ্জের বেতিলা ও ঢাকার মিরপুরে আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় ২০১৭ সাল থেকে মানিকগঞ্জের আশ্রয়কেন্দ্রটি ব্যবহৃত হচ্ছে না। এই ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজার ৯শ জনের আসন থাকলেও এখন রয়েছেন ৮শ জনের মতো।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ২৮টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে। এতে মাত্র ১৪০ জন ভিক্ষুককে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। এসব মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে প্রায় ১৫শ জন ভিক্ষুক আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্থান সংকুলান না হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া যায়নি। ‘আর ভিক্ষা করবে না’ বলে প্রত্যয়ন নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছর বিভিন্ন জেলায় আয়বর্ধকমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৫শ জন। তবে এর বেশিরভাগই আবার ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে গেছেন।
এস.এ/জেসি


