স্ত্রীসহ কাউন্সিলর মতির বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশীট
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:৩৬ এএম
# অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) প্রমাণ পাওয়া গেছে : দুদক
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা মামলায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ছয় নাম্বার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সভাপতি মতিউর রহমান (মতি) এবং তার স্ত্রী রোকেয়া রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুদকের তদন্তকারি কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহীম আদালতে এই চার্জশীট দুটি দাখিল করেন। পরে দুপুরে সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সচিব মাহবুব হোসেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের তিনটি ধারায় আদালতে পৃথক দু’টি অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়েছে। এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারিতে নাসিক কাউন্সিলর ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দু’টি মামলা করে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা। মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রে দুদক জানায়, আসামিদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) প্রমাণ পাওয়া গেছে। স্বামী স্ত্রীর নামে জ্ঞাত বহির্ভূত ১৯ কোটি ৫০ লাখ ৫৩ হাজার ২০২ টাকার সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। অভিযোগপত্রে দুদক বলেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৬ নাম্বার ওয়ার্ড কাউন্সিলর মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করার পরে সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়। গত বছরের সাত সেপ্টেম্বর সম্পদ বিবরণী দুদকে দাখিল করেন মতিউর রহমান। তার বিবরণীতে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থাবর সম্পদের মূল্য পাঁচ কোটি পয়ষট্টি লাখ এক হাজার দুইশত চব্বিশ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ তিন কোটি সাতানব্বই লাখ চল্লিশ হাজার আটশত তিন টাকা। তিনি তার স্থাবর ও অস্থাবর হিসেবে মোট সম্পদের মূল্য নয় কোটি বাষট্টি লাখ বিয়াল্লিশ হাজার সাতাশ টাকা বলে ঘোষণা করেন। দুদক তাদের তদন্তে স্থাবর হিসেবে এগারো কোটি পয়ত্রিশ লাখ সাতষট্টি হাজার দুইশত তিরাশি টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে। অর্থ্যাৎ কাউন্সিলর মতিউর রহমান ছয় কোটি বাষট্টি লাখ বিরাশি হাজার সাতশত তিপ্পান্ন টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। অন্যদিকে তার এগারো কোটি পয়ত্রিশ লাখ সাতষট্টি হাজার দুইশত তিরাশি টাকার জ্ঞাত আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। একইসাথে বিভিন্ন ব্যাংকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চুয়াত্তর কোটি ছিয়ানব্বই লাখ চল্লিশ হাজার একশত তেরো টাকা জমা করে এবং সেখান থেকে চুয়াত্তর কোটি তেরো লাখ আটাশি হাজার ছয়শত আটাশি টাকা তুলে নেবার তথ্য পাওয়া গেছে। একইভাবে দুদক আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে, কাউন্সিলরের স্ত্রী রোকেয়া রহমানের (৪৭) দাখিল করা সম্পদের বিবরণীতে তিনি স্থাবর সম্পদের মূল্য এক কোটি উনপঞ্চাশ হাজার আটশত ত্রিশ টাকা ও অস্থাবর সম্পদ বিশ লাখ বিশ হাজার আটশ টাকা অর্থ্যাৎ মোট এক কোটি বিশ লাখ সত্তর হাজার ছয়শত ত্রিশ টাকা বলে জানায়। তবে তদন্তে পাঁচ কোটি বিরানব্বই লাখ সাত চল্লিশ হাজার তিনশত সাতাশি টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। এছাড়া অস্থাবর সম্পদের মধ্যে আয়কর বিভাগে বিশেষ সুবিধায় বৈধ করেছেন দুই কোটি বাইশ লাখ আটত্রিশ হাজার পাঁচশত বত্রিশ টাকা ও অন্যান্যভাবে বিশ লাখ বিশ হাজার আটশ টাকা। মোট দুই কোটি বেয়াল্লিশ লাখ উনষাট হাজার তিনশত বত্রিশ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে দুদক। তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ আট কোটি চৌদ্দ লাখ পঁচাশি হাজার নয়শত উনিশ টাকা। তদন্তে রোকেয়া রহমানের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে দুই কোটি বেয়াল্লিশ লাখ উনষাট হাজার তিনশত বত্রিশ টাকার সম্পদের তথ্য প্রদর্শন না করে মিথ্যা তথ্য সম্বলিত সম্পদ বিবরণী দাখিলসহ আট কোটি চৌদ্দ লাখ পঁচাশি হাজার নয়শত উনিশ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিভিন্ন ব্যাংকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এক কোটি ছিয়াত্তর লাখ পনেরো হাজার চুরানব্বই টাকা জমা করে পরবর্তীতে এক কোটি পঁচাত্তর লাখ টাকা তুলে নেন।
দুদক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আসামি মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী রোকেয়া রহমান দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬ (২) ও ২৭(১) ধারায় এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪ (২) ধারার শাস্তিযোগ্য অপরাধ করায় তাদের বিরুদ্ধে কমিশনের আদেশক্রমে দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ গত ২০ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
এ ব্যাপারে কথা বলতে কাউন্সিলর মতিউর রহমানের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি বলেন, আমি একটু বাইরে আছি। পরে ফোন দেন। আধঘন্টা পরে ফোন দিলে তিনি আর ফোন ধরেননি।
এদিকে দীর্ঘদিন যাবত নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভাবে ভুমিকা পালান করছেন আলোচিত-সমালোচিত মতিউর রহমান মতি। বাংলাদেশের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনা পর থেকেই হঠাৎ মতির ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি ঘুরে যান। তখন থেকে গতি বাড়ে তার টাকা উপার্জনের চাকার। নিজের জনবলকে খাঁটিয়ো তখন থেকেই হয়ে উঠেন অঢেল সম্পাদকের মালিক।
নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার নাসিক ৬ নং ওয়ার্ড এলাকার বাসিন্দা মতিউর রহমান মতির বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক অভিযোগ। নানান বিতর্কিত কর্মকান্ডর কারণে বিভিন্ন সময় পত্রিকার শিরোনামে দেখা মিলে তাকে। কখনো তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মারধর আবার কখনো অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করে শিরোনাম বনে যান।
সর্বশেষ দীর্ঘ ১৯ বছর আগে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা হয়। তবে তার পর থেকে আর কোনো কমিটি না হওয়ায় যুবলীগের সভাপতি বনে যান মতি। নিজেকে আহ্বায়ক নন সভাপতিতে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। রাজনীতিতে অনেকটা সক্রিয় হওয়া তার আধিপত্য বিস্তারের শিকার হয়েছে নানান ব্যবসায়ীসহ জনসাধারণ।
সিদ্ধিরগঞ্জ এরিয়াটি শিল্প এরিয়া হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিত। এখানে অবস্থিত আদমজী ইপিজেডটিতে প্রায় ৫৬টি ফ্যাক্টরি রয়েছে জানান ব্যসসায়ীরা। এই ইপিজেডের অভ্যন্তরে মতি ও তার সহযোগীদের আধিপত্য নিয়ে প্রায়সময়ই সংবাদ হয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।
নাম না বলা সত্বে একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ইপিজেডের ফ্যাক্টরিগুলোর মধ্যে প্রায় ১৯টিতেই মতির একক ব্যবসা রয়েছে। শুধুই মতিই নন তার ভাই-ভাতিজাগণের রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট। তাদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে সংরক্ষিত ইপিজেড এর লাইসেন্সবাহী ব্যবসায়ীরা।
এদিকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো কাউন্সিলর হওয়ায় তার রাজত্ব যেনো আরও বড় আকারে পরিনত হয়ে পড়েন। তার বিশাল বাহিনীর অত্যাচারে অন্যান্য মানুষ জন ঢুকতেও সাহস পান না ইপিজেড এ।
অন্যদিকে তার নাতনি জামাই কিশোর গ্যাং লিডার পানি আক্তারের হামলা, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা থেকে রক্ষা পাননি ব্যবসায়ীরা। গত (১৩ ডিসেম্বর) নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেড এর নির্মাণাধীন ফ্যাক্টরির নির্মাণ সামগ্রীর ২৫ লাখ টাকার লুন্ঠিত মালামাল উদ্ধার করেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৪। এ ঘটনার মতির নাতনি জামাই পানি আক্তারসহ দুজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিলো। তবে আসামিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।


