তীব্র শীত আর যানজটে দুর্ভোগে না’গঞ্জবাসী
আবু সুফিয়ান
প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:১৯ এএম
পৌষের মাঝামাঝি এসে হাড় কাঁপানো শীতে ব্যাহত হচ্ছে জনজীবন। ঘন কুয়াশা আর হাড় কাপানো ঠান্ডা বাতাসে বৃদ্ধ ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। সকালে শীতের প্রকোপে একেবারে জরুরি কাজ ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না কেউই। ঘন কুয়াশার কারণে সকালেও নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি সড়কে হেড লাইট জ্বালিয়ে বাস চলাচল করতে দেখা যায়।
গরম কাপড়ের অভাবে দুর্ভোগে পড়েছে ফুটপাতে রাত কাটানো ছিন্নমূল দিনমজুর মানুষেরা। রাস্তায় পড়ে থাকা পরিত্যক্ত কাগজ ও আবর্জনা জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা চলছে প্রতি রাতে। এ ছাড়াও প্রতিদিনই নারায়ণগঞ্জের হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে সর্দি-কাশি-জ্বর, হাপানি, অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্ট ছাড়াও ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা।
বৃহস্পতিবার (২৯ ডিসেম্বর) শহরসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দুর্ভোগের বিভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। চাষাড়ায় দেখা যায়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে সূর্যের আভাস পাওয়া গেলেও শীতের তীব্রতা তেমন কমেনি। তখনও বইছে শীর-শীর হাওয়া। রাস্তায় লোকসমাগম কম। সরগরম হয়ে ওঠেনি বাজারগুলোও।
কয়েকজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে তারা যুগের চিন্তাকে বলেন, কয়েকদিন ধরে ঠান্ডা বেশি দেখা দিয়েছে। সূর্য উঠলেও প্রখরতা কম। কাজকর্ম করতে মন চাচ্ছে না। ঘরের মধ্যে বসে থাকতে ভাল লাগছে। বিসিক এলাকার বাসিন্দা আব্দুল জব্বার। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি যুগের চিন্তাকে বলেন, প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে অফিসে যেতে অনেক কষ্ট হয়। সকালে ক্লাস থাকলেও বাচ্চাদেরকে দু-দিন থেকে স্কুলে পাঠাতে পারছি না।
চাষাড়ার ফুটপাতে বসবাস করেন বিলকিস বেগম। তীব্র শীতে ছেলেমেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে দিনানিপাত করছেন। তিনি যুগের চিন্তাকে বলেন, ছেলেমেয়ে নিয়ে খুবই কষ্টে আছি। একটা কম্বল দিয়ে আমাদের ঠান্ডা যায় না। জিয়া হলের পাশে ফুটপাতে থাকা জোবেদা বেগম যুগের চিন্তাকে বলেন, কয়দিন থাইক্যা খুব ঠান্ডা।
শীতে শরীর কাইপা কাইপা ওঠে। ক্যাথা-কম্বল কিছুই নাই। পোলাপান লইয়া কেমনে বাঁচি। বৃহস্পতিবার ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, কেউ শরীরে প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে, কেউ সর্দি-কাশি ও শ্বাস কষ্টে আক্রান্ত হয়ে কেউবা আবার হাপানির জন্য চিকিৎসা নিতে এসেছেন ডাক্তারের কাছে। হাপানি বেড়ে যাওয়ার ফলে এই হাসপাতালে এসেছেন লতিফ মিয়া।
তিনি যুগের চিন্তাকে বলেন, শীত এলেই আমার হাপানি বেড়ে যায়। প্রচণ্ড শ্বাস কষ্ট হয়। এ সম্পর্কে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের চিকিৎসকদের সাথে কথা বললে তারা বলেন, বয়স্ক ও শিশুদের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অনেক কম। তাই শীত এলে তাদের শরীরে ঠান্ডাজনিত সমস্যা দেখা যায়।
আরোও বলেন, বিশেষ করে যাদের শ্বাস কষ্ট আছে তাদের শীতকালে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। কারণ শীতকালে শ্বাসতন্ত্রে ভাইরাস আক্রমণের প্রকোপ বেড়ে যায়। এ ছাড়া এ সময় নিউমোনিয়া, এলার্জি ডিজিস, সাইনোসাইটিস, অ্যাজমা ও চর্ম রোগের মতো সমস্যাও দেখা যায় বলেও তারা জানান।
তবে এসব সমস্যা থেকে পরিত্রানের জন্য সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া, ধুলোবালি এড়িয়ে চলা, গরম পোশাক পড়া ও অত্যাধিক ঠান্ডা খাবার না খাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। কয়েক দিন ধরে নারায়ণগঞ্জে বেড়েই চলেছে শীতের তীব্রতা। সন্ধ্যা নামার সাথে বৃষ্টির মতো পড়ছে শীতের শিশির বিন্দু সেই সাথে ঠান্ডা হিমেল হাওয়া। চারদিক নিস্তব্ধ আর দিগন্তজুড়ে ঘন কুয়াশা।
হঠাৎ করেই ঘন কুয়াশায় ছেয়ে যায় পুরো জেলা। কয়েকদিন থেকে যানবাহনগুলো দিনেও লাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। সূর্যের প্রখরতা না থাকায় হিমেল হাওয়ার কারণে কনকনে শীতে নাকাল হয়ে পড়েছে সর্বস্তরের মানুষ। বিশেষ করে বিসিকের পোষাক কর্মীরা। ক্রমান্বয়ে হিমেল হাওয়া ও ঘনকুয়াশায় শীতের তীব্রতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। এতে করে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষ। সবার সবই চলছে, তবে অতি কষ্টে দিন পার করছেন গার্মেন্টসের শ্রমিকরা। অন্য দিকে শীতের তীব্রতা কাঁপন ধরিয়েছে মানুষের হাড়ে। তাপমাত্রা হ্রাস পেতে শুরু করায় শীতের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। আবার ঘন কুয়াশার কারণে বিভিন্ন ধরনের ফুল, ফসল ও সবজির ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সাবদি, বন্দরের কৃষকরা।
ঘন কুয়াশায় কোনো কিছু স্পষ্ট দেখা না যাওয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে বিভিন্ন সড়কে চলাচলরত বাস, ট্রাক, অটোচার্জারসহ সব যানবাহন হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। অপর দিকে চরম বেকায়দায় পড়েছে খেটে-খাওয়া দিনমজুর শ্রেণীর মানুষরা। ঘন কুয়াশা থাকলেও শীতের তীব্রতা কম হওয়ার কারণে খেটে খাওয়া মানুষরা কাজে ফিরছে।
হঠাৎ করে ঘন কুয়াশা পড়ার কারণে চরম বিপাকে পড়েছে শিশু ও বৃদ্ধরাও। শিল্পাঞ্চল ফতুল্লার বিসিক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শ্রমজীবী নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কাজ করেন বিভিন্ন গার্মেন্টসে। তারা জানান, ভোরে ঘুম থেকে ওঠে নিজেই রান্না-বান্না করতে হয়। এই শীতে সাংসারিক কাজকর্ম সেরে কর্মস্থলে যেতে তাদের অনেক কষ্ট হয়।
গতকাল সকালে কথা হয় মুসলিম নগরের পোষাক কর্মী শিল্পী আক্তারের। সাথে তিনি জানান, খুব সকাল সকাল তাকে ঘুম থেকে উঠে রান্না-বান্না শেষে সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে তাকে কর্মস্থলে আসতে হয়। কয়েক দিনের শীতে তাকে কর্মস্থলে আসতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পেটের দায়ে অনেকেই দিনমজুর হিসেবে মাটি কেটে, ইটভাটায় কাজ করে জীবিকানির্বাহ করেন।
তাদের মধ্যে অনেকই রয়েছেন বৃদ্ধ। শীতের তীব্রতা ও গরম কাপড়ের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। যানজটে অসহায় বিসিকসহ সারা নারায়ণগঞ্জবাসী : নারায়ণগঞ্জের যানজট এখন আর নতুন কোন ঘটনা নয়। যানজট এখন খুব পরিচিত একটা শব্দ। প্রতিদিন আমরা সবাই এ যানজটের সম্মুখীন হচ্ছি। বর্তমান নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রথম ও প্রধান সমস্যা এ যানজট।
সবকিছুই যেন থমকে গেছে এ যানজটে। দিন যত যাচ্ছে, নারায়ণগঞ্জের যানজট যেন তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কবে মিলবে এই যানজট থেকে মুক্তি, এটাই নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রশ্ন। যানজটের কারণে নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি নগরবাসী। শুধু নারায়ণগঞ্জই নয় বর্তমানে সব শহরেই যানজট একটা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে গেছে। যানজটের কারণে সময়ের অনেক অপচয় হচ্ছে।
স্কুল-কলেজে সময়মতো যেতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার সময় যানজটের কারণে পরীক্ষার হলে ঢুকতে দেরি হচ্ছে। অফিস-আদালতসহ নানা কাজে মানুষের অনেক দেরি হচ্ছে শুধু যানজটের জন্য। অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় চিকিৎসা করতে দেরি হচ্ছে। এমনকি রোগীর কাছেও সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না অ্যাম্বুলেন্স। বেড়েই চলছে অসহনীয় দুর্ভোগ।
বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল বিসিকের যানজটে বিপন্ন পোষাক কর্মীদের জীবন। বিসিকের কয়েকজন পোষাক কর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা মুন্সিগঞ্জ সড়কের তীব্র যানজটে তারা দিশেহারা। সময় মতো কোন কিছুই করতে পারছেন না তারা। সময় মতো অফিসে যেতে পারছেন না। প্রায় প্রতিদিনই অফিসে যেতে দেরি হয় যানজটের কারনে।
বিসিকের কয়েকজন গাড়িচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যানজটের কারনে তার অতিষ্ট। কয়েকজন বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় বসে থাকার কারনে আমাদের আয় কমে যাচ্ছে। যাত্রীরা যানজটে বসে থাকতে অস্বস্থিবোধ করেন। পোষাক কর্মী দেলোয়ার হোসেন বলেন, এই সড়কের যানজটের জন্য আমাদের অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে।
আমরা সময় মতো কোথাও যেতে পারছি না। অফিসে যেতে প্রায় দিনই দেরি হয়। নারায়ণগঞ্জবাসী মনে করে, যানজট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব, যদি জনগণ ও সরকার একসঙ্গে কাজ করে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্সবিহিন গাড়ি সরিয়ে ফেলতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে।
ফুটপাত দখল করে যেসব হকার পসরা বসিয়েছে, সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। বিভিন্ন স্থাপনা নির্মানের সময় রাস্তার যে ক্ষতিসাধন হয়েছে সেগুলো ঠিক করতে হবে। গাড়ির রুট পরিবর্তন করতে হবে। এখনই যদি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তাহলে এ যানজট দিনদিন বেড়েই যাবে এবং এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। এন.এইচ/জেসি


