Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

সিন্ডিকেটে জিম্মি হোসিয়ারী এসোসিয়েশন নির্বাচন

Icon

শুভ্র কুমুদ

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫:৪২ পিএম

সিন্ডিকেটে জিম্মি হোসিয়ারী এসোসিয়েশন নির্বাচন
Swapno

 

# হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিন সার্টিফিকেটের বালাই নেই
# পছন্দের বাইরে মনোনয়নপত্র কেনার আগ্রহ থাকলেই অত্যাচারের খড়গ  

 

সারাদেশে নারায়ণগঞ্জে হোসেয়ারী ব্যবসায়ীদের কদর ছিল আকাশচুম্বী। দেশের নানা জেলা থেকে মানুষ ছুটে আসতো এই হোসেয়ারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে। জৌলুস কমেছে তবে লোলুপ দৃষ্টি সরেনি বাংলাদেশ হোসেয়ারি এসোসিয়েশন থেকে। গেল কয়েক দফা নির্বাচনে হোসেয়ারী সমিতির নির্বাচনে অশুভ শক্তি ভর করেছে। নিয়ম নীতির বালাই তো নেই যেন পুরো এসোসিয়েশনই মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। গুটি কয়েক মানুষের সিন্ডিকেটে জিম্মি হয়ে পড়েছে পুরো এসোসিয়েশনের সাধারণ সদস্যরা। সুবিধা নিচ্ছে উড়ে এসে জুড়ে বসারা।

 

প্রথম প্রথম প্রতিবাদ যারাই করতো তাদের উপর নির্যাতনের খড়গ এতো বেশি ছিল যে পুলিশ পর্যন্ত অভিযোগ করার দুঃসাহস করতে পারেনি কেউ। তাই বছর ঘুরে বছর আসে, হোসেয়ারি এসোসিয়েশনের নির্বাচনে নীরবে নির্ভৃতে সিন্ডিকেট মেম্বাররাই বারবার দায়িত্বে আসছে। নারায়ণগঞ্জের জনপ্রিয় সাংসদ নাসিম ওসমান মারা যাওয়ার পর ব্যবসায়িক নেতা সেলিম ওসমান সাংসদ হওয়ার পর থেকেই এমনটি হচ্ছে অভিযোগ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসোসিয়েশনের অনেক সদস্যের। অথচ ব্যবসায়িক নেতা হিসেবে সেলিম ওসমান এই বিষয়টি জানতে পারলে আদৌ এমনটি হতো কিনা প্রশ্ন রাখছেন সদস্যরা।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ হোসিয়ারী এসোসিয়েশন নির্বাচন এখন পেশীশক্তিতে কুক্ষিগত হয়ে আছে কয়েকবছর। পরপর দুইবার নির্বাচিত হলে যে ওই ব্যক্তি তৃতীয়বার সুযোগ পাবেনা এমন বিধিনিষেধও তোয়াক্কা করা হচ্ছে না ক্ষমতার জোরে। ভোটার তালিকা নিয়েও রয়েছে জোর যার মুল্লুক তার নীতি। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে যাতে নির্বাচনে অন্য কোন প্যানেল না দিতে পারে সেজন্যই রয়েছে সুচতুর কৌশল এবং পেশী শক্তির ব্যবহার। ভঙ্গুর ব্যবসায়িক পরিস্থিতিতেও তাই এসোসিয়েশনের সদস্যরা আরো কাতর সংগঠনের বেহাল দশা দেখে। কারা এই সংগঠনের নির্বাচনী ধারাকে ক্ষতবিক্ষত করে প্রতিনিয়ত ব্যবসায়ীদের তাদের নুন্যতম অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন তা খতিয়ে দেখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ব্যবসায়ীরা।

 

সূত্র জানায়, সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ হোসেয়ারি এসোসিয়েশনের দ্বি-বার্ষিক (২০২৩-২০২৫) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনে ভোটার তালিকায় নাম অন্তুর্ভূক্তির জন্য কয়েকটি শর্ত দেয়া হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী হালসনের (২০২২-২৩) ইং সনের ট্রেড লাইসেন্স, বার ডিজিটের ই-টিন (আয়কর সনদপত্র ২০২১-২০২২) অথবা কর পরিশোধের চালানের ফটোকপি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, সদ্য তোলা দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি ২ জানুয়ারি এসোসিয়েশনের মনোনীত ব্যাংকে পরিশোধ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং চাঁদা পরিশোধের জামার ব্যাংক পে-ইন-স্লিপ এাসসিয়েশন কার্যালয়ে জমা প্রদান করে রশীদ সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।

 

এর ব্যত্যয় ছিল না আগেই কয়েকটি নির্বাচনেও। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখন এসোসিয়েশনের বেশিরভাগ সদস্যরই হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স এবং ইটিন সনদ অথবা কর পরিশোধের চালান কপি আপডেট করেননা। সমিতির নাম সর্বস্ব চাঁদা দিয়েই এসোসিয়েট এবং জেনারেলগ্রুপের সদস্যরা ভোটার হয়ে যান। আদতে নির্বাচনে ভোটার হওয়ার শর্ত অনুযায়ীয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপরের দুটি শর্তই পূরণ করেননা। নামমাত্র এসোসিয়েট গ্রুপের মাত্র ২ হাজার টাকা এবং জেনারেল গ্রুপের মাত্র ৪ হাজার টাকা দিয়েই ভোটার তালিকায় স্থান পেয়ে যান।

 

গত নির্বাচনের ভোটার তালিকা অনুযায়ী এসোসিয়েট গ্রুপের ৬৭৫ জন এবং জেনারেল গ্রুপের ১৭৪ জনসহ সর্বমোট ৮৪৯ জনের মধ্যে বেশিরভাগই এবারও হালসনের ট্রেড লাইসেন্স এবং বার ডিজিটের ই-টিন অথবা কর পরিশোধ করেননি। যদিও আজ ভোটার হওয়ার জন্য এসব কাগজপত্র জমা দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির ইশারায় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিংয়ের অভাবকে পুজি করে ভোটার তালিকায় নাম চলে আসে বেশিরভাগদেরই। এই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়েই নানা লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা বলছেন এসোসিয়েশনের সদস্যরা। এমনকি অভিযোগ করে তারা বলছেন, বর্তমান পর্ষদে রয়েছেন এমন অনেকেরই হালসনের ট্রেড লাইসেন্স কিংবা ই-টিন নেই। নির্বাচনে ৬ জন এসোসিয়েট গ্রুপ থেকে এবং ১২ জন জেনারেল গ্রুপ থেকে নির্বাচিত করা হয়।

 

সূত্র জানিয়েছে, ভোটার তালিকায় ভৌতিকভাবে স্থান পাওয়াই যে আশ্চর্য্য এমনটি নয়। রয়েছে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত বিসিক এসোসিয়শন কার্যালয়কেও নিরাপদ ভাবেননা নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক আগ্রহীরা। তারা বলছেন, ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে হবে বিসিকে অবস্থিত এসোসিয়শন কার্যালয় থেকে। আর সেখানে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে হবে ২৬ জানুয়ারি এবং ২৮ জানুয়ারি এই দুই দিন বেলা ১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। দুইদিনে এই ৬ ঘন্টা পাহারা দেয়া হয় যাতে সিন্ডিকেটের সদস্যরা ব্যতিত অন্য কেউ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ না করতে পারে। হুমকি-ধমকি তো রয়েছেই সাথে লোমহর্ষক নানা অভিজ্ঞতার কথাও বলছেন অনেকে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকে অনেকে জীবনের হুমকি স্বরূপ বলে মনে করছেন।

 

এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা গত কয়েকটি নির্বাচনেই হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। এব্যাপারে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতেও আপত্তি সদস্যদের। তাদের দাবি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোটার তালিকা নিয়ে তদন্ত করতে গেলেই অনেক কিছু জানতে পারবেন। বেশ কয়েকটি সংগঠনের অভিভাবক হিসেবে থাকা সেলিম ওসমানও বিষয়টি আদৌ জানেন কিনা তাও খতিয়ে দেখার আহবান সাধারণ ব্যবসায়ীদের। ভোটার তালিকায় যাচ্ছেতাই ভাবে ভোটার বানানো এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহের আগ্রহ মাত্রই সরিয়ে দেয়াকে ওই সিন্ডিকেটের নীল নকশা হিসেবে অভিহিত করছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। চলতি তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলে শেষ তারিখ ২৯ জানুয়ারি এবং ২ মার্চ নবাব সলিমুল্লাহ রোডের হোসিয়ার কমিউনিটি সেন্টারে ভোটগ্রহণের কথা রয়েছে।

 

যদিও বাংলাদেশ হোসিয়ারী এসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. সবদার হোসেন যুগের চিন্তাকে বলেন, গত ১ জানুয়ারি পর্যন্ত  ভোটার হওয়ার জন্য সাড়ে ৫০০ জন সদস্য তাদের কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। শেষ দিনে ২ জানুয়ারি বাকিরা দিবেন। জমা দেয়া ব্যক্তিদের হালনাগাদ ট্রেড লাইনেন্স এবং হালসন নাদাড়গ ইনকাম ট্যাক্সের সনদ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এদিকে হোসিয়ারী এসোসিয়েশনের সদস্যদের একটি পক্ষের দাবি, গত ২০১৭-২০১৯ ইং নির্বাচনের ৪/৫দিন আগে সমিতির সাধারণ সভায় নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি একেএম সেলিম ওসমান প্রধান অতিথি ছিলেন।

 

তারা বলেন, সেদিন সভা শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে এসে তুমুল উত্তেজিত হয়ে ভোটার লিস্ট ভুয়ার অভিযোগ তুলে নির্বাচনের ধার্য্যকৃত তারিখ বিভিন্ন ভুলা অজুহাত দেখিয়ে বেআইনীভাবে বাতিল করে দেয়। এর কিছুদিন পর দুই প্যানেলেইর প্রার্থীদের এক জায়গা যেকে পাঠালে উভয় প্যানেলেরই প্রার্থীগণ কম-বেশি দুই শতাধিক হোসেয়ারী প্রতিষ্ঠানের মালিকরা এমপি সাহেবের সাথে দেখা করে।

 

এমপি সেলিম ওসমান তখন অত্যন্ত কঠোরভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রত্যেক ভোটারকে হোসিয়ারী ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত (ক্রাইটেরীয়) অনুসরণকারীরাই ভোটার হতে পারবে বলে জানান। এরমধ্যে যথার্থভাবে হোসেয়ারী পন্য উৎপাদনের মেশিনপত্র আছে, ট্রেড লাইসেন্সের নবায়নকৃত ফটোকপি, হালসন নাগাদ ইনকামট্যাক্স সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, পাসপোর্ট সাইজের ছবি, প্রতিষ্ঠানের সিল, হোসেয়ারি এসোসিয়েশনের ফরম পূরণ করে জমা দিয়ে নতুনভাবে ভোটারলিস্ট করার উপদেশ দেন।

 

 কিন্তু ২০১৯-২০২১ এবং বর্তমান ২০২১-২০২৩ ইং মেয়াদের নির্বাচনের জন্য ভোটার লিস্ট প্রণয়নের সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বর্ণিত কাগজপত্র ছাড়াই ভোটার লিস্ট প্রদান করা হয়েছে। এই দুই নির্বাচনে এমপি সেলিম ওসমান এসব আর তদারকি করেননি বলেই এমনটা হয়েছে দাবি ব্যবসায়ীদের। আর তাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রতিকার গ্রহনের ব্যবস্থার জন্য সাধারণ হোসেয়ারি ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন