# লিগ্যাল কাগজ-পত্রের পক্ষে বিচার করায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আমার উপর ক্ষুদ্ধ : মাসুদ
বন্দরের রাজনীতিতে খান সাহেবের টাইটেলটা খুব সহজেই যুগিয়ে নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২২ নং ওয়ার্ডবাসী ছাত্রলীগ নেতা থেকে যুবলীগ নেতা বনে যাওয়া খান মাসুদ। যিনি ওসমান পরিবারের খুবই বিশ্বস্ত লোক হিসেবে পরিচিত। এমনকি নারায়ণগঞ্জের রাজননৈতিক বোদ্ধাদের মতে এই ওসমান পরিবারের নির্দেশে যেকোন কাজে দলকেও কোন গুরুত্ব দেয়নি খান মাসুদ। তাদের নির্দেশই তার কাছে বড় বলে মনে হয়েছে বলে মনে করেন তারা। আর তাইতো ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় কলাগাছিয়া ইউনিয়ন এর আওয়ামী লীগের নৌকা সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে প্রকাশ্যে জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙ্গল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামতেও দ্বিধা করেননি তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টির কর্ণধার হিসেবে পরিচিত ওসমান পরিবারের সদস্য সেই সেলিম ওসমানেরই নির্দেশ বাস্তবায়নে খান মাসুদ যে আওয়ামী লীগ ছেড়ে জাতীয় পার্টির প্রচারণায় নেমেছিলেন সে কথা কারও বুঝতে অসুবিধা হয়নি বলেও মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। সম্প্রতি এমপি সেলিম ওসমানের এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় আসেন খান মাসুদ। বিভিন্ন মিডিয়ায় সেই বক্তব্যসহ খান মাসুদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপকভাবে লেখালেখি হয়।
তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছাত্রলীগ থেকে যুবলীগ নেতা বনে যাওয়া খান মাসুদ বেপরোয়া হয়ে উঠে বলে জানা যায়। এই সময়ের মধ্যেই সে একটি বিশাল ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। আর বাহিনী গড়ের তোলার পর থেকেই বিভিন্ন অপারেশনে জড়িত হয় মাসুদ বাহিনীর নাম। এরপর এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে বন্দরে অবৈধ বাজার ও বেবীস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন পরিবহন চাঁদাবাজিতে আধিপত্য বিস্তার করে মাসুদ। এরপর স্থানীয় ডিস ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য স্থানীয় আরেক সন্ত্রাসী দুলালের সাথে দ্বন্দ্বে জড়ায় মাসুদ।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় অস্ত্রের মহড়া ও হামলা মামলা ও ভাঙচুর চালালে দলীয় ও একটি পরিবারের সাইনবোর্ড থাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসনও ব্যর্থ হয়। এরপর ওসমান পরিবারের মধ্যস্থতায় সেই বিষয়টি ধামাচাপা দিলে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে এলাকাবাসী। খান মাসুদের নিয়ন্ত্রণে একটি বিরাট মাদক সিন্ডিকেটও ছিল বলে জানা যায়। যা প্রকাশ্যে আসে ২০১৭ সালে যখন তার আস্তানায় হানা দিয়ে র্যাব-১১ তাকে গ্রেফতার করে। সে সময় র্যাব তার আস্তানা থেকে পিস্তল, ২ রাউন্ড গুলিসহ বিদেশী বিয়ারের ক্যান, ২ বোতল বিদেশী মদ ও ৬ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে বলে জানা যায়। এরপর তার বাহিনীর বিরুদ্ধে পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে অস্ত্র ছিনতাইয়ের অভিযোগও আসে।
গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কলাগাছিয়ার চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থী কাজিম উদ্দিন প্রধানের বিরুদ্ধে গিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী দেলোয়ার প্রধানের লাঙ্গলের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণায় অংশ নেয় খান মাসুদ। এর কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র জানায় লাঙ্গলের সমর্থন ছিল স্বয়ং ওসমান পরিবারের পক্ষ হতে। তাই তাদের ভক্তদের নির্দেশনা দেয়া ছিল তারা যেন নৌকার পক্ষ নিয়ে কাজ না করে এবং লাঙ্গলের পক্ষে মাঠে নামে। তাই দলীয় সমর্থনের বাইরে গিয়ে শুধু মাত্র ওসমান পরিবারের ভক্ত হওয়ার কারণেই লাঙ্গলের পক্ষে কাজ করেছিলেন মাসুদ বাহিনী। এখন অবশ্য সেই ওসমান পরিবারের জাতীয় পার্টির কর্ণধার কি কারণে তার প্রতি এতটা নির্দয় হলেন সেটা নিয়েই বিস্মিত নারায়ণগঞ্জ এর রাজনৈতিক বোদ্ধামহল।
অন্যদিকে সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টির সমর্থিত এমপি হলেও তার ছোট ভাই শামীম ওসমান আওয়ামী লীগের এমপি। যদিও আওয়ামী লীগের একটি পক্ষকে বলতে শোনা যায় এই আসন শামীম ওসমানের না, তাই তিনি এখানকার নির্বাচনে কোন ভূমিকার রাখেননি। কিন্তু তৃণমূল আওয়ামী লীগের দাবি, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সময় এখানকার আওয়ামী লীগের সমর্থন প্রয়োজন পড়ে। তাছাড়া তিনি বন্দরের এমপি না হলেও নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে বন্দরে তার বিশাল একটি সমর্থক আছে। তাই বড় ভাই সেলিম ওসমানের নিজ দলীয় কাজে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে ব্যবহারে শামীম ওসমানের নীরব থাকা মানেই তার সমর্থন আছে। কারণ বন্দর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন বিষয়েই তিনি ভূমিকা রেখে থাকেন। তাই নারায়ণগঞ্জ জুড়ে তাদের সমর্থনে এমন বহু খান মাসুদ তৈরি হয়েছে বলেও মনে করেন তারা।
এইসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে যুগের চিন্তাকে খান মাসুদ বলেন, আমি রাজনীনিতি করি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে নিয়ে। রাজনীতি করতে গেলে দীর্ঘদিন মাঠে থাকলে মানুষ হিসেবে আমারও কিছু ভুল-ভ্রান্তি থাকতে পারে। তবে আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বিশেষ করে আমরা মানুষের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কাজ করি বলে, যেকোন সালিশে ন্যায় বিচার করি বলে আমার কাছে আমার এলাকার বাইরে থেকে ভূক্তভোগীরা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আসে। সেখানে আমি চেষ্টা করি তাদের পক্ষে ন্যায় বিচার করতে। এরই মধ্যে বন্দর ও কলাগাছিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গা থেকেও জায়গা-জমি সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ এসেছে আমার কাছে। আমি কাউকে ভয় করিনা বিধায় আমি প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের, স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল কাগজ পত্রের পক্ষে বিচার করে দিয়েছি। তাই স্বাভাবিকভাবেই সেসব জনপ্রতিনিধিরা আমার উপর ক্ষুদ্ধ। তাই আমার নামে মিথ্যে অভিযোগ করা হচ্ছে। আমার নামে পরিবহন চাঁদাবাজির অভিযোগ এসেছে তা আপনারা সাংবাদিকরা একটু খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন কতটুকু সত্যি।
তিনি বলেন, ওয়ান ইলিভেনের পরবর্তী সময় স্থানীয় বেবী চালকরা বিভিন্ন সমস্যায় বিশেষ করে গাড়ি চুরি হলে উদ্ধার করতে, কেউ মারা গেলে তার পরিবারকে সহযোগিতা করতে, কিংবা কারও ছেলে-মেয়ে বিয়ের সময় টাকার সমস্যায় পড়তো। তাই আমার সহযোগিতা চাইতো। আমি তাদের সাধ্যমতো সহযোগিতার চেষ্টা করতাম। তাই তারা অনেকটা জোর করে আমাকে জোর করে বেবী চালকরা সমবায় সমিতি গঠন করার সময় সভাপতি বানায়। সে সময় তাদের দুঃসময়ে কাজ করার জন্য প্রত্যেক চালক থেকেই একটি চাঁদার সিস্টেম চালু করে তাদের বিভিন্ন বিপদে কাজে লাগাই। কিন্তু পরে এই বিষয়টাতে আমার প্রতিপক্ষরা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে সুযোগ পেয়ে যায়।
তাই প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেছে সেই সমিতি থাকলেও এই বিষয়ে আর কারও কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয় না। তাছাড়া বন্দর স্ট্যান্ড কমপক্ষে পাঁচ বছর হয়ে গেছে আমি কোন ইজারাই নেই না। এখানে আমার চাঁদা তোলার কোন প্রশ্নই আসে না। এখন যারা স্ট্যান্ডটি ইজারা নিয়েছে তাদের ঐখানে আমার কোন কর্মী যদি কর্মচারী হিসেবে কাজ করে তাদের টাকা তুলে দেয় সেটাতো আমার অপরাধ না। তবে এটাকেও যদি অপরাধ হিসেবে দেখা হয় তাহলে আমি এই কাজ করতেও তাদের নিষেধ করে দিব। আমার কাজের মধ্যেও কিছু ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। তবে আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, যারা করছে তাদেরকে অনুরোধ জানাবো, তারা যেন বিষয়টি যাচাই করে দেখেন।
এস.এ/জেসি


