বেড়েই চলেছে রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের জরিপ
আবু সুফিয়ান
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:৩৯ পিএম
# বিশেষ সুবিধার প্রভাব রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে
# ব্যবস্থাপত্রের ছবিতে ভোগান্তির শিকার রোগীরা
হাসপাতালে ডাক্তারের চেম্বার থেকে রোগীদের প্রেসক্রিপশন হাতে বের হয়ে ওষুধ প্রতিনিধিদের হাতে পড়ে বিরম্বনার ঘটনা এখন আর নতুন কিছু নয়। প্রতিনিয়তই ঔষুধ কোম্পানীগুলোর মধ্যে মার্কেটিং এর নামে চলছে এমন অসুস্থ বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা। যার মধ্যে রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলা একটি।
সব ঔষধ কোম্পানীগুলো নিজ প্রতিষ্ঠানের ঔষুধ বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে ডাক্তারদের পিছনে স্থানীয় প্রতিনিধি লাগিয়ে রেখেছেন। রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ডাক্তাররা তাদের নিজের কোম্পানি ওষুধ লিখেছেন কিনা সেটা যাচাই করার জন্যই মূলত আয়োজন। ডাক্তারের চেম্বার থেকে রোগীরা বের হওয়া মাত্রই রোগীদের ঘিরে ধরেন রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলার জন্য।
বিভিন্ন কোম্পানির ঔষধ প্রতিনিধিদের এমন আচরণে রোগী এবং রোগীর সাথে আসা রোগীদের স্বজনেরা চরম বিরক্তিবোধ করে থাকেন। দিনে দিনে ওষুধ প্রতিনিধিদের এই আচরণটি রোগীদের কাছে চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। এমনই একজন ভুক্তভোগী রোগী আমিরুল ইসলাম।
তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরে অবস্থিত পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এসেছেন একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কে দেখানোর জন্য। আমিরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সময়ে একজন ভালো ডাক্তার কে দেখাতে হলে আগে সিরিয়াল দিয়ে এসে তারপরেও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তারপরেও সিরিয়াল পাওয়া সোনার হরিণ পাওয়ার মত অবস্থা এখন।
তারপর আবার এখন চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়, ওষুধ প্রতিনিধিদের দৌরত্বের কারণে। তিনি বলেন এসব প্রতিনিধি রোগীদের লাইনে রেখে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে রোগীদের ভীষণ কষ্ট দেয়। তারপর আবার রোগীরা ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়া মাত্র হুমরি খেয়ে রোগীদের প্রেসক্রিপশন এর ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে যায়।
আমিরুল ইসলাম চরম বিরক্তির সুরে বলেন, রোগীদের জন্য ডাক্তারের দেয়া প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্র ব্যক্তিগত গোপনীয় কাগজপত্র অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর ছবি তুললে রোগীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট হয়। আর এখন রোগীদের প্রেসক্রিপশন এর ছবি তোলা যেন ওষুধ প্রতিনিধিদের অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আসা আরেকজন ভুক্তভোগী রোগী আক্ষেপ করে বলেন, ডাক্তারের কক্ষ থেকে ব্যবস্থাপত্র হাতে বের হওয়া মাত্রই ওষুধ প্রতিনিধিদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি কেন তুলতে হবে। এই ছবি তোলার কি জরুরি এমন দরকার আছে। বরং এই ছবি তোলার কারণে রোগের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট হয়।
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অসুস্থ মনোয়ারা বেগমকে নিয়ে এসেছেন তার স্বামী মফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন আমি যখন আমার স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তার কক্ষ থেকে বের হলাম তখন দুইজন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি হুমরি খেয়ে আসলেন ছবি তোলার জন্য। এখন এই পরিস্থিতিতে আমি অসুস্থ রোগীকে সামলাবো নাকি প্রেসক্রিপশন নিয়ে তাদেরকে ছবি তুলতে সাহায্য করবো।
তিনি বলেন, আমি ছবি তুলতে নিষেধ করার পরেও তারা একরকম জোরপূর্ব হাত থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ছবি তুললেন। শেষে তিনি প্রশ্ন রাখলেন একজন মহিলা মানুষের ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলা কি যৌক্তিক? পরে মফিজুল ইসলাম ছবি তোলা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিকে দেখিয়ে দিলে ওই প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে যুগের চিন্তা।
যুগের চিন্তার প্রশ্ন ছিল একজন মহিলা রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলা কতটুকু সমীচীন বা যৌক্তিক? এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই ওষুধ প্রতিনিধির কোন যুক্তিসঙ্গত উত্তর পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ ওষুধ প্রতিনিধি বলেন, আমরা রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেখে ছবি তুলি এবং দেখি ডাক্তাররা কি ওষুধ লিখেছেন।
তুমি আরো বলেন একজন ওষুধ প্রতিনিধি হিসেবে এটা আমাদের কাজ। রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয় তিনি বলেন, আমাদেরকে ছবি তুলতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আমরা ছবি তুলে অফিসে পাঠিয়ে দিই। একপর্যায়ে তিনি বলেন আমরা যাচাই করি ডাক্তাররা রোগীদেরকে আমাদের কোম্পানির ঔষধ দিচ্ছেন কিনা।
"আপনাদের কোম্পানির ওষুধ ডাক্তাররা কেন লিখবেন" ওষুধ প্রতিনিধিকে এমন পাল্টা প্রশ্ন করে যুগের চিন্তা। এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন ঔষধ লেখার বিনিময়ে ওই ডাক্তার বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে থাকেন।
আরেকজন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি সারওয়ার জাহান। তিনি বলেন, রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলতে আমরা কখনোই জোর করি না। আমরা সব সময় অনুরোধ করে থাকি। যদি রোগীরা অনুমতি দেয় তাহলে আমরা সেই রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলি। আর যদি কোন রোগেই অনুমতি না দেয় তাহলে আমরা তার ব্যবস্থাপত্র ছবি তোলার জন্য দ্বিতীয়বার অনুরোধ করি না।
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের রোগীদের প্রেসক্রিপশন এর ছবি তোলা দেখে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছেন আরিফ হোসেন। তিনি বলেন, কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাদের নিজেদের অবস্থান কোম্পানীর কাছে তুলে ধরতে রোগীর ব্যবস্থাপত্র নিয়ে মোবাইলে ছবি তোলেন। কিন্তু এতে করে রোগী ও তার সাথে আসা স্বজনরা খুবই অস্বস্তি বোধ করেন।
তিনি বলেন, প্রতিনিধিরা মূলত রোগীদের প্রেসক্রিপশন নিয়ে তাদের কোম্পানির ঔষুধ লেখা আছে কি না তা দেখতে রোগীদের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েন। শেষে আফসোস করে তিনি বলেন, "ছবি তোলার এমন দৃশ্য দেখলে আমার মনে হয়, প্রেসক্রিপশনের ছবি না তুলতে পারলে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মনে হয় আজি চাকরি চলে যাবে।”
নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন হাসপাতালের সামনে থেকে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলা একটা মার্কেটিং পলিসি। কিন্তু এই মার্কেটিং পলিসি যে দিনে দিনে ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে এবং রোগীদের চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা আর বোঝার বাকি রাখে না।
নারায়ণগঞ্জ শহরের হেলথ রিসোর্ট হাসপাতাল আসা একজন রোগী শিমুল আহমেদ বলেন, রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের এভাবে ছবি তোলা এক ধরনের দুর্বৃত্তায়ণ। তিনি বলেন, দুর্বৃত্তরা যেভাবে বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম করে মানুষদের কষ্ট দেয়, মানুষদের বিব্রত করে এবং সর্বশেষ ভোগান্তিতে পরিণত হয়।
ঠিক তেমনি ওষুধ প্রতিনিধিরা এখন রোগীদের ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপত্র ছবি তুলে রোগীদের ভোগান্তিতে ফেলছেন। তিনি বলেন, অতি শীঘ্রই যথাযথ কর্তৃপক্ষ ওষুধ কোম্পানি এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এই ছবি তোলা মার্কেটিং পলিসি বন্ধ করে রোগীদেরকে স্বস্তি দিক। এন.এইচ/জেসি


