# দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাকাল জীবন
# বেতন না বাড়ায় ভোগান্তি চরমে
পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী শিল্পখাত। বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা অনেক। দিনকে দিন এই চাহিদা বেড়েই চলেছে। আর তাই তৈরি পোশাক খাতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু এই পোশাক রপ্তানিতে যাদের অবদান সব থেকে বেশি তারাই আজ সবথেকে বেশি খারাপ সময় পার করছেন। বিভিন্ন কারনে আর সংকটে জীবন পার করছেন গার্মেন্টস-এর পোশাক কর্মীরা।
মহামারি করোনার কারনে ক্রয়াদেশ বাতিল হবার পর শিল্পাঞ্চল বিসিকের কিছু পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়া বা সাময়িক বন্ধ হওয়াতে পোশাক খাতে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছিল তা কিছুটা কেটে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু এখনও পোশাক শ্রমিকরা আছেন ছাঁটাই আতঙ্কে। শিল্পাঞ্চল ফতুল্লার বিসিকের কয়েকজন পোশাক শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান ভোগ্যপণ্যের দামের ঊর্ধগতির কারনে তাদের স্বাভাবিক জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিসিকের ফকির এ্যাপারেলের পোশাক শ্রমিক কবীর হোসেন। তিনি বলেন, সবকিছুর দাম বাড়ছে। চাল-ডাল থেকে শুরু করে মাছ-মাংস কোনোটাই বাকি নেই। যেকোন কিছু কিনতে যাই না কেন সবকিছুরই বাড়তি দাম।
কবীর হোসেন বলেন, তরকারি ছাড়া শুধু যে পান্তা ভাত খাবো তারোও উপায় নাই। কারন লবন আর কাঁচা মরিচও এই বাড়তি দামের বাড়াবাড়ির বাইরে নেই। কিছুদিন আগেও এক পোয়া কাঁচা মরিচের দাম ছিল ১০ টাকা। আর এখন এক পোয়া কাঁচা মরিচ কিনতে লাগে ২৫ টাকা। এক কেজি মরিচ এখন ১০০ টাকা। তাহলে কিভাবে লবন মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খাই বলেন? অবন্তি কালার টেক্স লিমিটেডের সুইং অপারেটর তানজিলা খাতুন বলেন, গার্মেন্টস-এর মালিক আমাদের দিয়ে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আয় করে কিন্তু আমাদের ন্যায্য মজুরি দিতে তাদের হাত কাঁপে। শেষে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশের কানা সরকার মানুষের দূর্ভোগ দেখেও যেন না দেখার ভান করে থাকে।
এনআর গার্মেন্টস-এর পোষাক কর্মী মোঃ আলি বলেন, সারা মাস কাজ করে যে টাকা পাই তা দিয়ে এখন আর সংসার চলেনা। সব কিছুর দাম বেড়েছে কিন্তু আমাদের বেতন বাড়ানো হয় না। তৈরি পোশাক খাত এবং পোশাক কর্মী সম্পর্কে নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতির শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রাণ। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে আশির দশকে যে শিল্প যাত্রা শুরু করে সেই পোশাক শিল্পই আজ আমাদের অর্থনীতির প্রধান নিয়ামক। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমরা পেছনে ফেলেছি পোশাক রপ্তানির বড় বড় দেশকে।
সাইফুল ইসলাম বলেন, আজ বাংলাদেশ তৈরি পোশাকের এক অন্যতম দেশ। যাত্রা শুরুর পর থেকে অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়েকটি থেকে কয়েক হাজার পোশাক কারখানা হয়েছে। পোশাক শিল্প আমাদের অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করে দেশকে একটি গতিশীল অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে সাহায্য করেছে। আমাদের অর্থনীতিতে সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু দেশের সরকার এই পোশাক কর্মীদের ব্যাপারে সচেতন নয়। গার্মেন্টস-এর কর্মীদের প্রতি যথাযথ কর্তৃপক্ষের যত্নবান হওয়া উচিৎ। কারন তারা ভালো থাকলে পুরো পোশাক খাত ভালো থাকবে। তিনি আরোও বলেন, এই খাতে সৃষ্টি হয়েছে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান। আর কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশই নারী। যা দেশের নারীদের সাবলম্বী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত এই ৫ মাসে তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৮৩৪ কোটি ডলার। যা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয়ে আরোও একটি নতুন রেকর্ড। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে একটি শিল্পকে এগিয়ে নিতে সঠিক পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। পোশাক শিল্পের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান পোশাক শ্রমিক। যাদের ছাড়া এই খাত কখনই কল্পনা করা যায় না। তাই বাংলাদেশের নতুন স্বপ্নের কারিগর এই পোশাক শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জোর দিতে হবে। তাদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। এমনটাই মনে করেন নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল বিসিকের পোশাক শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট মহল।
এস.এ/জেসি


