মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ফি বছর ফিরে আসে। আত্মত্যাগ, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও আত্মচেতনা আবিষ্কারের গৌরব ও সংকল্প নিয়ে, আবার চলেও যায়। কিন্তু রয়ে যায় আলোচনা ও এর অবশেষ, বিভিন্ন প্রকাশনা, নানা উদ্যোগ, প্রতিশ্রুতি এবং তার স্বল্প ও স্থায়ী প্রভাব। সময়ের ধুলোতে তাও একদিন স্মৃতি ধুসর হয়ে পড়ে। সব কিছু দেখে মনে হয়, অঙ্গীকার করা ও ভুলে যাওয়া আজকাল আমাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক সংস্কৃতির অংশ।
১৯৫২ সনে ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালির বীর সন্তান রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতরা তাদের নিজেদের অমিত সম্ভাবনাময় জীবন, সমকালীন প্রেক্ষিতে ভবিষ্যত প্রজন্মের ভাষা ও আত্মপরিচয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কম মূল্যবান মনে করেছে। তাই অকাতরে প্রাণ বিসর্জনে অকুতোভয় ছিল। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, মাতৃভাষার গৌরব প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম ও আত্মাহুতি দেয়া বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে এটাই প্রথম ও একমাত্র।
ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে আগামির জন্য, মাতৃভূমি বা মাতৃভাষার জন্য উদ্বুদ্ধ হতে। বর্তমান ও নিজের প্রয়োজন ও লাভের সম্ভাবনা একমাত্র লক্ষ্যরূপে নির্ধারণ না করতে। ব্যক্তিগত সংকীর্ণ সুবিধার কথা বিবেচনা না করে বৃহত্তর জাতিগোষ্ঠীর কল্যাণের কথা ভাবতে। এই যুক্তিতেই তাঁরা নিজের জীবন, ব্যক্তিগত লাভের কথা তুচ্ছ মনে করেছেন। সমর্থ হয়েছিলেন নির্ভয়ে ঘাতকের বুলেটের সামনে নিজের বুক পেতে দিতে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ফেব্রুয়ারি মাস সামনে রেখে আমাদের যতবেশি আয়োজন উদযোগের মহড়া চলে, ততো বেশিই আমাদের চেতনা নীরব-নির্জীব হয়ে যায়, ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি বা পুরো মাস গত হলে। এই বিষয় নিয়ে প্রতিবার, প্রতিবছরই অনেক লেখালেখি হয়, আলোচনা হয়, শপথের বাক্য উচ্চারিত হয়, তারপরও অগ্রগতির রথের চাকা আশানুরূপ গতি পায় না।
এখানেই আমরা সামগ্রিক অর্থে ব্যর্থ, অসৃষ্টিশীল, প্রতিশ্রুতিহীন এবং পরাজিত। আমরা জ্ঞানভারী বক্তৃতায় যত পারঙ্গমতা দেখাই বাস্তবে কোনও উদ্যোগ নিতে ততটাই অনাগ্রহী। বিগত কোন এক সরকার বাহাদুরের আমলে অফিস আদালতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু ও ব্যবহারের দরকারি নির্দেশ জারী করা হয়েছিল ইংরেজিতে। উচ্চমানের রসিকতাই বটে।
পরিপত্রের মুসাবিদা ও অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত আমলাগণের সক্রিয় বাংলা বিরোধিতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সর্ষের মধ্যে ভূতের উপস্থিতি ও উপদ্রব বুঝি একেই বলে। কিন্তু এর প্রতিকারে কোনও আমলা জবাবদিহিতার সম্মুখীন হয়েছেন কিনা জানা যায়নি।
দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক জলহাওয়ায় বেড়ে ওঠা আমাদের আমলাতন্ত্র। তারা ইংরেজি ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণের সঙ্গে দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি করে তা জিইয়ে রাখতে চান। তাদের উচ্চকোটির অবস্থান অবয়ব অক্ষুন্ন রাখতে চান। তার মানে তারা সামন্ত প্রথা প্রয়োগের নতুন উপায়ে জনগণের উপর কর্তৃত্ব পরায়ণ হতে চান।
প্রাচীন বা মধ্যযুগের পুরোহিত বা যাজক সমাজের অচলায়তন গড়ে তুলতে সচেষ্ট। অফিস আদালতের ব্যবহার্য ইংরেজি ভাষার আড়ালে জনতার অবস্থান নিম্নকোটিতে রেখে রাষ্ট্রীয় সুবিধার সবটুকু নিজেদের পাতে রাখবেন। আবার তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার বিষয়ে তারা সবসময়েই বিদেশমুখী।
অথবা দেশের মধ্যেই বিদেশি কারিকুলামের অনুসারী বিদ্যালয়ে শিক্ষা প্রাপ্তি নিশ্চিত করেন। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নানান রকম পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে সাধারণের শিক্ষা জীবনের বারোটা বাজিয়ে দেন। ঘুরেফিরে বর্তমান আমলাদের উত্তরসুরীরাই আবার নতুন আমলা হিসেবে একই মানসিকতা নিয়ে নবীন আমলার আসনটি হস্তগত করে অনায়াসে।
অন্যদিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষের সন্তানরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। আমলার সন্তানই আমলা হয়ে চালু ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখছে। পরিসংখ্যান নিলে এর সপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ সহজ হবে।
সমাজের সকল পর্যায়ে এই বৈপরীত্য জেঁকে বসেছে। মুখে যা বলা হয় কাজে তা করা হয় না। করতে চাইলে বিবিধ বাঁধাবিঘ্ন তৈরি করা হয়। আমরা নিত্যদিন নানারকম খবর দেখি পত্রিকা কিংবা টেলিভিশনে। পত্রিকায় অনেক বিজ্ঞাপন ছাপা হয় ইংরেজিতে। পত্রিকার ভাষা কিন্তু বাংলা। বাংলা কাগজের পাঠক বিজ্ঞাপন খুঁজবেন, পড়বেন ইংরেজিতে।
অন্তত ভাষা আন্দোলনের মাসে তার মুদ্রন ও প্রচার কম হবে বলে মনে মনে অনেক লেখক পাঠকের দুরাশা হয়তো ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয় নাই। আবার এই মিডিয়াগুলোই কিন্তু আমাদের এসব খবর সরবরাহ করে থাকে। দোষ কাকে দেব বা দায় কার? কোটি টাকার জিজ্ঞাসা। এর উত্তর পেতে চাইলে আবার অবশ্যই উদো আর বুধোকে টেনে আনা হবে।
পত্রিকা টিভিতে ইংরেজির কথা যদি বাদ দেই, রাস্তাঘাটে আমরা কি দেখি? দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড বা নামফলকে বাংলার ব্যবহার দৃষ্টিগ্রাহ্যরূপে অনেক কম। তুলনায় ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে অত্যন্ত উদার। আমিও এই লেখায় বেশ কিছু ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করলাম। কেন বাংলা করলাম না? আশরাফুল মখলুকাত হিসাবে অবশ্যই আমার একটি যুক্তি আছে। তা খোঁড়া হলেও যুক্তিতো।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ের বদৌলতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এখন প্রচুর বাহারি বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন। গ্রামেও ছড়িয়ে আছে তাদের প্রকল্প। ভবন ও প্রকল্পের নামে যেমনি আছে চমক তেমনি আছে বাহার। সেই নামগুলোর অধিকাংশই বিদেশি নাম। সেই নাম দেখে কেউ যদি মনে করে এটি বাংলাভাষী কোনও দেশের বাড়িঘর বা দোকানের নাম নয়, তাহলে তাকে আকাট মুর্খ বলে গাল দিলে কারো দোষ দেয়া যাবে না।
কারণ বিশ্ববাসী নয় আমরা আমাদের স্বদেশবাসীকেই জানাতে চাই বাংলা নয় ইংরেজি নামেই জৌলুস এবং বাহারের খোলতাই উত্তম হয়। ক্রেতা বিক্রেতার আকর্ষণ বাড়ে। সেবা পরিষেবার মান বৃদ্ধি হয়। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণের বেলাও আমরা তাই দেখছি। ঢাকা এখন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল কলেজ ও হাসপাতালের শহর। এক সময়ের মসজিদের শহর ঢাকা কি কোথায় কেন, বিখ্যাত নামের তালিকায় ছিল। এখন নিশ্চয়ই তা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এশিয়ার চীন, জাপান আমাদের তুলনায় জ্ঞান বিজ্ঞান বা তেজারতিতে খুব পিছনে এমন কথা কেউ মানবেন না। তারা ইংরেজি বাছচিারহীনভাবে ব্যবহার করে এমন উন্নতি করেছেন অথবা মাতৃভাষা বাদ দিয়ে তারা সবকাজে সফল হয়েছেন, ইতিহাস কিন্তু তা বলে না।
ব্যবসায় বিজ্ঞানে এমন কথা লেখা নেই যে বিদেশের সঙ্গে ব্যবসা করতে গেলে প্রতিষ্ঠানের নাম বিদেশি ভাষায় রাখলে ব্যবসায়ে সার্থকতা নিশ্চিত। যদি এ কথা সত্য হয় ,তাহলে চীন, জাপান, কোরিয়া,ভারত এসব দেশের বেলায় যুক্তি কি? আর আমাদের সপক্ষেই বা কি যুক্তি ? ধুমপায়ীরা একটি গ্যাস লাইটার ব্যবহার করে, যা কিছুকাল আগেও জাপান থেকে আমদানি হতো, তার প্রস্তুতকারকের নাম বা ব্রান্ড নাম হিসেবে লেখা থাকত টোকাই TOKAI; অবশ্যই আমদের টোকাই নয়।
টয়োটা, হিটাচি, তোশিবা এগুলো কোনোটাইতো ইংরেজি নয়। তার ফলে কি আমাদের দেশে এসব রপ্তানি কম হয় ? চীন বা অন্য দেশের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। পাশের দেশ ভারতের কথাই যদি ধরি, উদাহরণরূপে- ‘বিদেশ সঞ্চার নিগম’ ‘মারুতি উদ্যোগ’ এগুলো রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম। আমাদের দেশ ঠিক তার উল্টো কাজটিই করে। ভারতের রাষ্ট্রীয় টেলিফোন সংস্থার নাম বিদেশ সঞ্চার নিগম লিঃ আর আমাদেরটার নাম বিটিসিএল অর্থাৎ বাংলাদেশ টেলিকমুনিকেশন কোম্পানি লিঃ ইত্যাদি। মাতৃভাষা আমরাই অবহেলা করছি, অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে বিষয়টি সবসময়েই এড়িয়ে যাই।
তবে ব্যতিক্রমও আছে যা খুবই সামান্য। তাদেরকে অবশ্যই সাধুবাদ দিতে হয়- যেমন আড়ং, নকশা, রঙ প্রভৃতি। দেশীয় নামের কারণে তাদের ব্যবসাবাণিজ্য মন্দা এমন কথা আজও পর্যন্ত কেউ বলেনি। বরং বিদেশি বিখ্যাত সব ব্রান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অত্যন্ত দাপটের সাথেই টিকে আছে। এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে এগিয়ে। আমাদের সম্মান আমরা নিজেরাই রাখি না, অপরের কাছ থেকে আশা করা তো দূরাশা।
ভাষা আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিল আত্মদর্শন যা গভীর আত্মচেতনা, স্বাজাত্য অহংবোধের গভীর থেকে উৎসারিত। সেই মর্যাদা আমাদের এই বিপরীত, বিসদৃশ , আত্ম-অবমাননাকর অর্বাচীনতা দিয়ে কলুষিত করছি। দুষ্ট রাজনীতির চক্রে আজ প্রভাতফেরি বিস্মৃত। ভোরের স্নিগ্ধতায় কন্ঠে কন্ঠে হাতে হাতে ফুল নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারির’ সুরে যে ঐক্য ও শক্তির নব জাগরণ তার চর্চা ও প্রচলন আজ অনুপস্থিত।
সচেতনভাবে ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে জাতীয় ঐতিহ্যের এসব পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী কন্ঠের সাক্ষাৎ মিলে না। আমাদের কথায় কাজে মিল রেখে মহান ভাষা শহিদের মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে আত্ম-আবিষ্কারে সক্রিয় থাকতে হবে। উন্নতির ধারা বেগবান করতে হবে। আত্ম-বিস্মরণ বা আত্ম-প্রবঞ্চনা সাময়িক জৌলুস আনতে পারে মাত্র। অনুকারী কখনই স্থায়ী সত্তারূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে না। এন.হুসেইন/জেসি


