প্রতিবাদী শক্তি না থাকলে মানুষের বেঁচে থেকে কী লাভ: মামুনুর রশীদ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৩, ০৪:০৯ পিএম
আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১০ বছর উপলক্ষে ‘আলোর ভাসান’ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বুধবার (৮ মার্চ) সন্ধ্যায় শহরের ৫নং ঘাট এলাকায় (যেখানে ত্বকীর লাশ পাওয়া যায়) ওই কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ।
এ সময় ত্বকী স্মরণে ‘আলোর ভাসান’ অনুষ্ঠানে নাটক, আবৃতি আলেখ্য, গান ও কবিতা পরিবেশন করেন শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমিসহ বিভিন্ন সংস্কৃতি কর্মীরা। পরিবেশনা শেষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। পরে শীতলক্ষ্যা নদীতে আলোকশিখা ভাসানো হয় এবং ত্বকীর উপর নির্মিত প্রমান্য চিত্র প্রদশর্ননী করা হয়।
আলোচনা সভায় বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, আগামী ৫০ বছরের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। কারণ আগামীতে ত্বকীরা খুন হলে যাতে কেউ প্রতিবাদ করতে না পারে সেই ব্যবস্থা করেছে সরকার। নারায়ণগঞ্জের কিশোর ত্বকী ছিল মেধার একটি উদাহরণ। ত্বকীর মতো মেধা খুন হচ্ছে কিন্তু বিচার হচ্ছে না। দেশে বিচারহীনতার একের পর এক দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে।
পরবর্তী প্রজন্মের ত্বকীদের অবস্থা কী? এ সরকার সাংঘাতিকভাবে উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। মূল্যবোধ কীভাবে শিখবে মানুষ? প্রাইমেরি স্কুলে চাকরি পেতে গেলে ১৬ থেকে ২০ লাখ টাকা লাগে। যে শিক্ষক টাকা দিয়ে চাকরি নিলেন সেই শিক্ষক তো ছাত্রকে মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে পারবে না। কারণ তাকে উপার্জন করে ঋণ শোধ করতে হবে।
তিনি বলেন, টাকা দিয়ে পেশীশক্তি কেনা যাচ্ছে। চারদিকে এত এত টাকা। অথচ অধিকাংশ মানুষ সে টাকার হদিস পায় না। একদিকে এক শ্রেণী আঙুল ফুলে কলাগাছ। অপরদিকে অনেকে মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। মানুষের সামনে নদী নেই, নির্মল বাতাস নেই, সুপেয় পানি নেই। মানুষের ভেতর মায়া, মমতা, প্রতিবাদী শক্তি নেই।
একটা দেশে প্রতিবাদী শক্তি না থাকলে মানুষের বেঁচে থেকে কী লাভ? তারপরও আমরা বিশ্বাস করি, এই ইতিহাস বদলাবে। দুর্নীতি দুঃশাসনের দ্রুত পরিবর্তন হবে বলেই বিশ্বাস করি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, শাসকরা ইতিহাস থেকে কখনও শিক্ষা নেয় না।
তিনি আরও বলেন, ত্বকী এখন বাংলাদেশের মানুষের ঘরে ঘরে। ত্বকী তাঁর অসমাপ্ত জীবনের কথা বলছে। অসমাপ্ত যত বঞ্চিত মানুষ বিচারহীনতার শিকার ত্বকী তাদের কথা বলছে। এটাই আমাদের সব চেয়ে বড় পাওয়া।
অনেক বেদনার মধ্যে, অনেক বঞ্চনার মধ্যেই ত্বকী শিল্প, সংস্কৃতি ও জীবনের না পাওয়া বেদনার কাহিনীর অংশ হয়ে গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যার জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্র সহ বিচারের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তির দাবি জানান এই নাট্য ব্যক্তিত্ব।
ত্বকীর পিতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, ঘাতকরা যতই চেষ্টা করুক না কেন সত্য চাপা থাকে না। লাশ যখন নিজে কথা বলা শুরু করে সেটি হয় ভয়ঙ্কর সত্য। লাখো মানুষ ত্বকী হত্যার বিচার চায়। শুধু ত্বকী নয় এমন নৃশংস সকল হত্যার বিচার চায়। আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ সমাজ চাই।
এ বাংলাদেশ মুষ্টিমেয় কিছু ঘাতকের হতে পারে না। সরকারের হাত ঘাতকের মাথার উপর যেভাবে রয়েছে তার ধিক্কার জানাই। ঘাতকের পক্ষে সরকার, রাষ্ট্রযন্ত্র থাকলেও ঘাতকরা চিরস্থায়ী হয় না। জনশক্তির উত্থানের মধ্য দিয়ে এরা পরাজিত হয়।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভবানী শংকর রায়ের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শাহীন মাহমুদের সঞ্চালনায় এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন, খেলাঘর আসরের সভাপতি রথীন চক্রবর্তী, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব এবং কবি ও সাংবাদিক হালিম আজাদসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে শহরের শায়েস্তা খাঁ সড়কের বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দুইদিন নিখোঁজ থাকার পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর শাখা খাল কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এন.হুসেইন/জেসি


